একটি খালি আসন। পাশে কোনো যাত্রী নেই। অথচ সেখানে রাখা আছে একটি পানির বোতল, খাতা, মোবাইলের কাভার কিংবা কখনো ইট বা গাছের ডাল। যাত্রীবিহীন সেই আসনটিই যেন কারও নিজস্ব সম্পত্তি। বাসে উঠে বসতে চাইলে শুনতে হচ্ছে, সিট রাখা আছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পরিবহনের বাসে এমন দৃশ্য এখন অনেক শিক্ষার্থীর কাছেই পরিচিত।
অভিযোগ উঠেছে, নিজের উপস্থিতি না থাকলেও নানা ধরনের ব্যক্তিগত সামগ্রী রেখে আগে থেকেই আসন দখল করে রাখা হচ্ছে। ফলে নিয়ম মেনে আগে বাসে উঠেও অনেক শিক্ষার্থী খালি আসনে বসার সুযোগ পাচ্ছেন না। তৈরি হচ্ছে ভোগান্তি, ক্ষোভ এবং কার আগে আসা, কার সিট আগে— এমন এক অঘোষিত প্রতিযোগিতা। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন পোস্টের মাধ্যমে জাবির বাসে ইট, ওষুধের পাতা, খালি পানির বোতল, গাছের ডালপালা, মোবাইল কাভার, হাতের চুড়ি, ইয়ারফোন ও চশমার বাক্সসহ বিভিন্ন সামগ্রী রেখে আসন দখলের অভিযোগ উঠে এসেছে।
২২ বাসের পরিবহন ব্যবস্থায় সিট দখলের নতুন সংকট
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য বর্তমানে মোট ২২টি বাস রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) ১৫টি দ্বিতল বাস রয়েছে। প্রতি দিন এসব বাসে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ক্যাম্পাস থেকে ঢাকায় এবং ঢাকা থেকে ক্যাম্পাসে যাতায়াত করেন। কিন্তু শিক্ষার্থীর তুলনায় আসনসংখ্যা সীমিত হওয়ায় প্রতি দিনই অনেককে দাঁড়িয়ে যাতায়াত করতে হয়। এই বাস্তবতায় একটি আসন যখন একজন শিক্ষার্থী নিজের উপস্থিতি ছাড়াই ব্যক্তিগত সামগ্রী দিয়ে আটকে রাখেন, তখন সংকটটি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। সমস্যাটি কেবল একটি আসন হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন শিক্ষার্থী একাধিক আসন অন্যদের জন্য ধরে রাখলে একটি বাসের কার্যকর আসন সংখ্যাই যেন কাগজ-কলমে কমে যায়। ফলে একই সময়ে কেউ বসে থেকেও যাত্রা করছেন, আবার কেউ খালি আসনের সামনে দাঁড়িয়ে পুরো পথ পাড়ি দিচ্ছেন।
সিট রাখা এখন অঘোষিত নিয়ম?
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অনেক সময় সকালে ঢাকা থেকে ক্যাম্পাসে আসার সময় কেউ কেউ নিজের বসা আসনে স্টিকি নোট বা অন্য কোনো চিহ্ন রেখে দেন। পরে বিকালে ক্লাস শেষে এসে সেই জায়গায় বসেন। ফলে দিনের পরের যাত্রায় আগে বাসে ওঠা শিক্ষার্থীরাও ওই আসন ব্যবহার করতে পারেন না। অন্যদিকে বই-খাতা বা ব্যাগের পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত অপ্রাসঙ্গিক জিনিস দিয়েও আসন আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ যাত্রীর উপস্থিতির বদলে একটি বস্তুই যেন আসনের মালিকানা দাবি করছে। এতে প্রশ্ন উঠছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন কি ব্যক্তিগত রিজার্ভেশন ব্যবস্থার জায়গা, নাকি সবার জন্য সমান সুযোগের একটি গণপরিবহন ব্যবস্থা?
আগে এলে আগে বসবেন, কিন্তু বাস্তবে?
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে আসন পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো শিক্ষার্থী যদি শারীরিকভাবে উপস্থিত না থাকেন, তাহলে তার হয়ে একটি পানির বোতল, খাতা কিংবা অন্য কোনো বস্তু কি আসন ধরে রাখতে পারে? প্রশ্ন শুনে জবাবে জাবি পরিবহন অফিসের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে কোনো কিছু রেখে সিট দখল বা রিজার্ভ করার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম নেই। প্রশাসন কখনো এমন নিয়ম চালু করেনি। বিষয়টি পরিবহন অফিসের নজরে এসেছে এবং গুরুত্ব বিবেচনায় এ নিয়ে আলোচনা করার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
অর্থাৎ সিট রাখা যদি কোথাও হয়ে থাকে, সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত কোনো ব্যবস্থা নয়; বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যেই গড়ে ওঠা একটি অঘোষিত চর্চা।
কার ভোগান্তি বেশি?
এই অনানুষ্ঠানিক আসন দখলের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী নিয়ম মেনে চলা শিক্ষার্থীরাই। নির্দিষ্ট সময়ে বাসে এসে খালি আসন না পেয়ে তাদের অনেককে দাঁড়িয়ে যেতে হচ্ছে। দূরবর্তী রুটের শিক্ষার্থীদের জন্য বিষয়টি আরও কষ্টকর। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে যাতায়াত শুধু শারীরিক ক্লান্তিই বাড়ায় না বরং নারী শিক্ষার্থী, অসুস্থ শিক্ষার্থী কিংবা দিনের দীর্ঘ সময় ক্লাস-পরীক্ষায় ব্যস্ত থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি ভোগান্তি তৈরি করে।
একজন শিক্ষার্থীর ভাষায়, নিজের উপস্থিতি না থাকলেও কেউ যদি একটি সিট ধরে রাখেন, তাহলে আগে বাসে ওঠা শিক্ষার্থীও সেই আসনে বসতে পারেন না। এভাবে একজনের ব্যক্তিগত সুবিধা অন্যের অধিকারকে সংকুচিত করছে।
সমস্যাটি কি শুধু শিক্ষার্থীদের আচরণে?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু শিক্ষার্থীদের অসচেতনতা দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করলে সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। পরিবহন ব্যবস্থাপনায় স্পষ্ট নিয়ম, দৃশ্যমান নির্দেশনা এবং নিয়ম প্রয়োগের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলেও এ ধরনের অঘোষিত চর্চা টিকে থাকতে পারে। যদি নিয়মটি হয় যিনি উপস্থিত, তিনিই আসনে বসবেন, তাহলে সেটি প্রতিটি বাসে দৃশ্যমানভাবে জানিয়ে দেওয়া যেতে পারে। চালক ও সহকারীদের দায়িত্বও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। কোনো আসনে যাত্রী না থাকলে সেখানে রাখা সামগ্রীকে আসন সংরক্ষণের বৈধ প্রমাণ হিসেবে গণ্য না করার নীতিও কার্যকর করা যেতে পারে। অন্যথায় আজ একটি পানির বোতল, কাল একটি ব্যাগ— এভাবেই ধীরে ধীরে আগে থেকে সিট রেখে যাওয়ার সংস্কৃতি স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
জাকসুর নজরেও বিষয়টি
বিষয়টি শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন জাকসুর নজরেও এসেছে। জাকসুর পরিবহন ও যোগাযোগ সম্পাদক তানভীর রহমান জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে তারা দীর্ঘদিন ধরে সমাধানের চেষ্টা করছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে বসে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এতে বোঝা যায়, এটি কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত অভিযোগ নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বৃহত্তর সমস্যা হিসেবে বিষয়টি সামনে এসেছে।
সমাধান কোথায়?
সমস্যার সমাধানের বেশ কিছু পথ বাতলে দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের পরামর্শ— প্রথমে প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট ও লিখিত নীতিমালা। বাসে আসন পাওয়ার ক্ষেত্রে সশরীরে উপস্থিতিকে একমাত্র অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। কোনো শিক্ষার্থী উপস্থিত না থাকলে তার ব্যক্তিগত সামগ্রী দিয়ে আসন ধরে রাখার সুযোগ না রাখাই হতে পারে কার্যকর সমাধান। একই সঙ্গে প্রতিটি বাসে ব্যক্তিগত সামগ্রী রেখে আসন সংরক্ষণ নিষিদ্ধ— এমন নির্দেশনা টানানো; চালক ও সহকারীদের মাধ্যমে নিয়মিত নজরদারি; অভিযোগ জানানোর জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা চালু করা; বারবার নিয়ম ভাঙলে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়া; শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো; দীর্ঘ রুটে দাঁড়িয়ে যাতায়াতের বাস্তবতা বিবেচনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত যান নয়। এটি শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত অর্থ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত একটি সেবা। সেখানে একটি আসনও ব্যক্তিগত মালিকানার বিষয় হতে পারে না।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে সিট নিয়ে যে সংকট দেখা দিয়েছে, সেটি হয়তো খুব বড় কোনো অবকাঠামোগত সমস্যা নয়। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— সবার জন্য নির্ধারিত একটি জায়গা কি একজন ব্যক্তি নিজের সুবিধার জন্য আগেভাগে দখল করে রাখতে পারেন? একটি খাতা হয়তো কথা বলে না।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি