প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে নিয়মিত কর্মকর্তাদের ওপর সরকারের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে— এমন আলোচনা জোরালো হচ্ছে সচিবালয়ে। এরই মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের একের পর এক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, গুরুত্বপূর্ণ পদে তাদের বহাল রাখা এবং চুক্তির মেয়াদ নবায়নের ঘটনায় সেই আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
প্রশাসনের শীর্ষ দুই পদ মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব দুই পদেই চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তাকে আরও এক বছর রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য, রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সাধারণত নিজেদের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও দক্ষ নিয়মিত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের মাধ্যমে প্রশাসনিক কাঠামো সাজানো হয়। কিন্তু বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রে অবসরপ্রাপ্তদের চুক্তিতে ফিরিয়ে এনে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর প্রবণতা অব্যাহত থাকায় বিএনপিপন্থি নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্যেও ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। সরকার যদি নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে যোগ্য ও অভিজ্ঞ কাউকে খুঁজে না পায়, তা হলে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ক্যাডার কাঠামো ও পদোন্নতির ব্যবস্থার কার্যকারিতা কোথায় সেই প্রশ্ন উঠেছে।
গত ১৬ আগস্ট নাসিমুল গনি ও এহছানুল হকের আগের দুই বছরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ১৭ আগস্ট জারি করা পৃথক প্রজ্ঞাপনে তাদের চুক্তির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব পদটি সরকারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতি-সিদ্ধান্তের প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দু।
অন্যদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের হাতে কর্মকর্তা নিয়োগ, বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বিষয় থাকে। ফলে এ দুই পদে চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তাকে দীর্ঘ সময় বহাল রাখার সিদ্ধান্ত প্রশাসনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া সিনিয়র সচিব, সচিব ও সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তার সংখ্যা ২২ জন। এই তালিকায় আরও রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসান, সচিব রফিকুল আই মোহাম্মদ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল আওয়াল ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব এস এম এবাদুর রহমান। এর বাইরে গ্রেড-২ পদমর্যাদার আরও ১২টি গুরুত্বপূর্ণ পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে নিয়মিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে এমন অভিযোগ রয়েছে প্রশাসনে। একটি সচিব পদে অবসরপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তাকে এক বছরের জন্য চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হলে ওই পদটি অন্তত ওই সময়ের জন্য নিয়মিত কর্মকর্তাদের জন্য কার্যত বন্ধ থাকে। এর প্রভাব শুধু একজন কর্মকর্তার ওপর নয়; নিচের সারির একাধিক ব্যাচের কর্মকর্তার পদোন্নতি ও পদায়নের ওপর পড়ে।
প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিন ধরে সচিব হওয়ার অপেক্ষায় থাকা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে এখন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তির মেয়াদ একের পর এক বাড়তে থাকলে নিয়মিত কর্মকর্তাদের স্বাভাবিক ক্যারিয়ার প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। এতে যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতির বদলে ‘কাকে সরকার বিশ্বাস করে’ এ প্রশ্নটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের আইনগত ভিত্তি রয়েছে। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৯ ধারায় জনস্বার্থে অবসরপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন বিশেষ প্রয়োজনের বদলে নিয়মিত প্রশাসনিক পদেও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ব্যাপকভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রশাসনের কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, কোন পরিস্থিতিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া যাবে, কী ধরনের পদে দেওয়া যাবে এবং যোগ্যতা নির্ধারণের মানদণ্ড কী হবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত আস্থার ভিত্তিতে নিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়। এ ধরনের অভিযোগ অতীতের বিভিন্ন সরকারের সময়ও উঠেছে।
বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে কারণ দায়িত্ব নেওয়ার পরও নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে ব্যাপকভাবে পদোন্নতি দিয়ে শূন্যপদ পূরণের বদলে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। মার্চে এক মন্ত্রণালয় ও কয়েকটি বিভাগে সাবেক কর্মকর্তাদের চুক্তিতে সচিব নিয়োগের ঘটনাও তারই উদাহরণ।
প্রশাসনের ভেতরের অসন্তোষের আরেকটি কারণ হলো একদিকে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিতে ফিরিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক কর্মরত কর্মকর্তাকে ওএসডি বা সংযুক্ত রেখে বেতন-ভাতা দেওয়া হচ্ছে। একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ওএসডি ও সংযুক্ত কর্মকর্তার সংখ্যা ৭১৪ এবং তাদের বেতন-ভাতা বাবদ মাসে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
একই প্রতিবেদনে চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধার কারণে সরকারি ব্যয়ের চাপের কথাও বলা হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনে যদি এত বিপুলসংখ্যক অভিজ্ঞ নিয়মিত কর্মকর্তা কর্মরত থাকেন, তা হলে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের কতটা মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পাশাপাশি প্রশাসনে কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে পদোন্নতি ও পদায়নে রাজনৈতিক আনুগত্যকে গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ ছিল।
বিএনপিপন্থি কর্মকর্তারা এখনও পুরোপুরি স্বস্তিতে ফিরতে পারেননি এমন অভিযোগও রয়েছে প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে। তাদের একটি অংশের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে যারা পদোন্নতি ও পদায়নে বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের একটি অংশকে প্রত্যাশা অনুযায়ী পুনর্বাসন করা হয়নি। বরং নতুন করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে অবসরপ্রাপ্ত কিছু কর্মকর্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, প্রত্যেক সরকারের নিজস্ব নীতি ও নির্বাচনি ইশতেহার থাকে। সেগুলো বাস্তবায়নে কিছু অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। সরকারের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এটি সাময়িক এবং সরকার ঢালাওভাবে এমন নিয়োগ দিচ্ছে না। একেবারে প্রয়োজন ছাড়া কাউকে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না এবং এক বছরের বেশি সময়ের জন্যও নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না বলে জানান তিনি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে