আজ ৫ সেপ্টেম্বর, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম, বীরশ্রেষ্ঠ শহিদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী। যথাযোগ্য শ্রদ্ধা, ভাবগাম্ভীর্য ও মর্যাদার মধ্য দিয়ে দিনটি পালনের লক্ষ্যে নড়াইল জেলা প্রশাসন ও বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ ট্রাস্টের যৌথ উদ্যোগে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
শনিবার সকালে নড়াইল সদর উপজেলার ‘নূর মোহাম্মদ নগর’ (সাবেক মহিষখোলা)-এ বীরশ্রেষ্ঠের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দিনব্যাপী কর্মসূচির সূচনা হয়। আয়োজিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ, সশস্ত্র সালাম ও গার্ড অব অনার প্রদান, কোরআনখানি, বিশেষ দোয়া ও মিলাদ মাহফিল, আলোচনা সভা এবং স্থানীয় বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা।
বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ ১৯৩৬ সালের ৮ অক্টোবর নড়াইল সদর উপজেলার চণ্ডিবরপুর ইউনিয়নের মহিষখোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আমানত শেখ ও মাতা জেন্নাতুন্নেসার সন্তান নূর মোহাম্মদ শৈশবেই বাবা-মাকে হারান। ১৯৫৯ সালের ১৪ মার্চ তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসে (ইপিআর, যা বর্তমানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি) সৈনিক হিসেবে যোগ দেন। দীর্ঘ চাকরিজীবনে তিনি অত্যন্ত দক্ষতা ও নিষ্ঠার পরিচয় দেন এবং পরবর্তীতে ল্যান্স নায়েক পদে উন্নীত হন। ১৯৭০ সালে তিনি দিনাজপুর সেক্টরে কর্মরত ছিলেন এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ৮ নম্বর সেক্টরে যোগদান করে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন।
১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার গোয়ালহাটি ও ছুটিপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী সম্মুখসমরে অংশ নেন নূর মোহাম্মদ শেখ। সহযোদ্ধাদের নিয়ে বিওপির পজিশন রক্ষা করার সময় হঠাৎ পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা তাদের তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে। যুদ্ধ চলাকালীন শত্রুর মর্টারের গোলা এসে লাগে তার ওপর, ফলে তার ডান পা মারাত্মকভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়।
নিজের জীবন সংকটাপন্ন জেনেও নূর মোহাম্মদ পিছু হটেননি। সহযোদ্ধা সিপাহী নান্নু মিয়াকে বাঁচাতে এবং অন্য সহযোদ্ধাদের নিরাপদ পশ্চাদপসরণের সুযোগ করে দিতে তিনি নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে একাই হালকা মেশিনগান (এলএমজি) দিয়ে শত্রুর ওপর অবিরাম গুলি বর্ষণ করে যান। তার এই অসীম সাহসিকতা ও রণকৌশলের কারণে বাকি সহযোদ্ধারা নিরাপদে সরে যেতে সক্ষম হন, তবে শত্রুর গুলিতে এই বীর সন্তান শাহাদাত বরণ করেন।
পরবর্তীতে সহযোদ্ধারা তার মরদেহ উদ্ধার করে সীমান্তসংলগ্ন যশোর জেলার শার্শা উপজেলার কাশিপুর গ্রামে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় সমাহিত করেন।
মুক্তিযুদ্ধে অভূতপূর্ব বীরত্ব, অসামান্য সাহসিকতা ও সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে মরণোত্তর দেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধিতে ভূষিত করে।
তার জন্মস্থান নড়াইলের মহিষখোলা গ্রামের নাম পরিবর্তন করে বীরের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাখা হয়েছে ‘নূর মোহাম্মদ নগর’। সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ শহিদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ লাইব্রেরি ও স্মৃতি জাদুঘর, একটি কলেজ এবং স্মৃতিস্তম্ভ। প্রতি বছর নড়াইল জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনগণ গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় এই মহান বীরকে স্মরণ করে থাকেন।
সময়ের আলো/জোই