‘এত চাপ নেওয়া আর সহ্য হচ্ছে না আমার পক্ষে। কেউ চাইলে আমাকে শ্যুট করে দিক, তাহলে শান্তি পাব। আমি স্যারকে বলব, আমাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন, আমি আর পারছি না।’— জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) প্রকল্প পরিচালক ও পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অফিসের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক প্রকৌশলী মো. নাসির উদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ একটি প্রকল্পের তথ্য জানতে চাইলে মোবাইলফোনে এমন ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তার মুখ থেকে এমন বক্তব্য আসার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে— কী ধরনের চাপের মধ্যে আছেন তিনি? সেই চাপ কি তার নিয়মিত দায়িত্ব পালনে প্রভাব ফেলছে? নাকি একসঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে?
গত এক সপ্তাহ ধরে এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু কখনো মিটিংয়ে থাকার কথা, কখনো ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি সাক্ষাৎ এড়িয়ে গেছেন। পরে ফোনকল গ্রহণ না করা এবং মোবাইলফোনে পাঠানো বার্তারও জবাব না দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিকদের কয়েকজন জানান, প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট তথ্যের জন্য গত এক সপ্তাহ ধরে প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরা বন্ধ করে দেন। তার কার্যালয়ে গিয়ে সরাসরি কথা বলার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। এমনকি রাত ১০টার পর মোবাইলফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি মিটিংয়ে আছেন জানিয়ে ফোন কেটে দেন। তবে প্রকল্প কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা তার ব্যস্ততার কারণ হিসেবে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিভিন্ন যোগাযোগ ও কাজের কথা উল্লেখ করেছেন।
গত বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) আবারও মোবাইলফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন বলে জানান। সেদিন বা পরদিন দেখা করা সম্ভব নয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আজকে হবে না, কালকেও হবে না। পরের সপ্তাহে, ৯ তারিখের পরে।’ কী ধরনের প্রশাসনিক কাজে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন কিংবা সাক্ষাতের জন্য এতটা সময় লাগছে কেন, তার কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা তিনি দেননি।
একপর্যায়ে নিজের ওপর থাকা চাপের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘আমার যা হয় হবে, আমি কোনো কিছু এখন ভয় করি না। আমি কী করব? আমি কি জান দেবো?’ এর আগে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চাওয়ার কথা জানিয়ে তার বক্তব্য ছিল, ‘আমি স্যারকে বলব, আমাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন, আমি আর পারছি না।’
প্রকল্প পরিচালকের বক্তব্যে বারবার অতিরিক্ত চাপের বিষয়টি উঠে এলেও সেই চাপের সুনির্দিষ্ট কারণ স্পষ্ট হয়নি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বড় আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, বিভিন্ন দফতরের সঙ্গে সমন্বয় এবং মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের মতো নানা প্রশাসনিক কাজ প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এর পাশাপাশি তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অফিসের ভারপ্রাপ্ত পরিচালকের দায়িত্বও পালন করছেন। ফলে একই ব্যক্তির হাতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকায় তার ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ তৈরি হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
অন্যদিকে, দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তার নিয়মিত দাফতরিক কার্যক্রম, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং তথ্য প্রদানে সহযোগিতা করাও প্রশাসনিক দায়িত্বের অংশ। ফলে তার অনুপস্থিতি ও অসহযোগিতার অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে কথা হলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান জানান, কাজে ফাঁকি দেওয়া কারও কাছ থেকেই কাম্য নয় এবং তিনি সবাইকে এটি সবসময় বলে থাকেন। প্রকল্প পরিচালক নাসির উদ্দিনের ওপর অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপ বা কোনো ব্যক্তিগত সমস্যার বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানান এবং নাসির উদ্দিনের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে তার কার্যালয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেন।
প্রকৌশলী মো. নাসির উদ্দিন বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালকের পাশাপাশি পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অফিসের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দুটি পদ একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে তার ওপর বাস্তবে কতটা চাপ তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে তার বক্তব্যে যে হতাশা ও চাপের প্রকাশ ঘটেছে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে ‘দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি’ চাওয়ার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসা প্রয়োজন।
এখন প্রশ্ন হলো, প্রকল্প পরিচালকের অভিযোগ করা অতিরিক্ত চাপের কারণ কী এবং সেই চাপ কমাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো উদ্যোগ নেবে কি না। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা দাপ্তরিক কাজে অনিয়ম ও সাংবাদিকদের সঙ্গে অসহযোগিতার অভিযোগেরও ব্যাখ্যা প্রয়োজন। কারণ, একজন কর্মকর্তার ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া যেমন প্রশাসনিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে, তেমনি দায়িত্বে থেকে নিয়মিত দাফতরিক কাজ ও তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে অসহযোগিতাও গ্রহণযোগ্য নয়। দুই দিকের বিষয়ই খতিয়ে দেখে প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করা এখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব।
সময়ের আলো/জোই