চলমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট সংকট মোকাবিলায় সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে একটি ‘টাস্কফোর্স’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। একই সঙ্গে সরকারের কাছে কোনো ‘ক্রেডিট’ না চেয়ে টেকনিক্যাল এক্সপার্ট টিম দিয়ে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বিগত ১৭ বছরের ‘জঞ্জাল’ ছয় মাসে পরিষ্কার করা সম্ভব নয়। তবে সংকট সমাধানে সরকার ইতিমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। নতুন করে অনুমোদন দেওয়া তিনটি রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ থাকবে না বলেও জানান তিনি। সোমবার রাতে জাতীয় সংসদে সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন তারা।
ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অধিবেশনে ‘তীব্র জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে বেকারত্ব সৃষ্টি এবং জাতীয় অর্থনীতিতে মারাত্মক বিপর্যয় রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ’ শীর্ষক ওই আলোচনার প্রস্তাব উত্থাপন করেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট এখন মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। কোথাও কোথাও ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তাই সংকট মোকাবিলায় মুখের আশ্বাস নয়, সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ দিতে হবে। তিনি বলেন, সংসদে মিটার চার্জ, ডিমান্ড চার্জ ও ভূতুড়ে বিল বন্ধের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে এসব সমস্যা রয়ে গেছে। জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে যত ভালো পরিকল্পনাই করা হোক, তা ব্যর্থ হবে।
বিদ্যুৎ খাতের ক্যাপাসিটি চার্জের সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের অর্থ দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রাখার ব্যবস্থা বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে। এ বিষয়ে সরকারকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছে বিরোধী দল। প্রয়োজন হলে বিরোধী দলের টেকনিক্যাল এক্সপার্টদের সরকার কাজে লাগাতে পারে। এখানে ক্রেডিট বা ডিসক্রেডিটের বিষয় নেই। প্রয়োজন হলে সব কৃতিত্ব সরকার নিক, তারা শুধু সংকটের সমাধান চান।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দুর্বলতা এক দিনে দূর করা সম্ভব নয়। বিগত দিনে গ্যাসের উৎস নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের পরিবর্তে আমদানিনির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ক্যাপাসিটি চার্জের ব্যবস্থা আগের সরকারের রেখে যাওয়া। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলে কোনো অর্থ দেওয়া হবে না। ইতিমধ্যে নতুন করে যে তিনটি রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, সেখানে ‘নো পাওয়ার, নো মানি’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির পুরোনো চুক্তি রাতারাতি বাতিল করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, চুক্তি বাতিল করলে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ হারানোর আশঙ্কা তৈরি হবে। তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় ধৈর্য নিয়ে এগোতে হবে। তিনি বলেন, মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করা হচ্ছে। এতে প্রায় এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাবে। চীনের সঙ্গে জি-টু-জি ভিত্তিতে ১৮ মাসের মধ্যে তৃতীয় এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বড়পুকুরিয়ায় দেশীয় কয়লা দিয়ে ৬২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু, পায়রায় দ্বিতীয় পর্যায়ে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র নির্মাণ, মাতারবাড়ীতে এলপিজি টার্মিনাল ও স্টোরেজ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বায়ুবিদ্যুৎ নিয়ে পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
চলমান ভোগান্তির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, বর্তমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের বাস্তবতা আড়াল করার সুযোগ নেই। ভুল নীতি ও দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ঘাটতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাবেও বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। কারিগরি ত্রুটি ও সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হবে। তিনি বলেন, সংকট থেকে উত্তরণে সরকারের সুস্পষ্ট স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে।
মেয়াদ শেষে অবসরে যাওয়া পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ ছাড়াই ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে এইচএফওভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ ৪ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহে রামপালের বন্ধ থাকা ৬৬০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট চালুর সম্ভাবনা রয়েছে।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, গ্যাস সংকট মোকাবিলায় ১০৬টি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩০টির কাজ চলছে। গত ২৪ মে অফশোর বিডিং রাউন্ড উন্মুক্ত করা হয়েছে। এ বছরের মধ্যেই দুটি নতুন এফএসআরইউর চুক্তি এবং মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর বর্তমান সরকারের মেয়াদেই ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ শেষ হবে। এতে পরিশোধন সক্ষমতা ১৫ লাখ থেকে বেড়ে ৪৫ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত হবে।
মিটার ভাড়া পুরোপুরি মওকুফে ২৯ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন উল্লেখ করে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে অধিকাংশ গ্রাহককে স্মার্ট প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রুফটপ সোলারে বিশেষ শুল্ক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এতে আগামী বছর পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি মিলবে। ২০৩০ সালের মধ্যে জ্বালানি খাতে সংকট থাকবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস জনগণের দয়া নয়, তাদের অধিকার। জনগণ বিল ও কর দেয়; তাই ঘরে আলো জ্বলা ও চুলায় আগুন থাকা তাদের অধিকার। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি হলেও বকেয়া, জ্বালানি সংকট ও অব্যবস্থাপনার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদকদের কাছে সরকারের বিপুল বকেয়া থাকায় অনেক কেন্দ্র প্রয়োজনীয় জ্বালানি কিনতে পারছে না।
একই সময়ে ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জের নামে ‘ডিজিটাল চাঁদাবাজি’ চলছে। এসব চার্জ বন্ধের পাশাপাশি জরুরি জ্বালানি সেল গঠন, বকেয়া বিল অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিশোধ, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং শিল্প-কারখানাকে সরাসরি উৎপাদকদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ দিতে হবে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকিও বর্তমান সংকটের জন্য আগের সরকারের আমদানিনির্ভর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতিকে দায়ী করেছেন। তবে শুধু আমদানি করে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় উল্লেখ করে স্থানীয়ভাবে গ্যাস উৎপাদন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে সতর্ক করলেন ডেপুটি স্পিকার : সংসদে ফ্লোর ছাড়া কথা বলায় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে সতর্ক করতে দেখা যায় ডেপুটি স্পিকারকে। একজন সংসদ সদস্য বক্তব্য দেওয়ার সময় কথা বলছিলেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। এ সময় তাদের দুজনের উদ্দেশে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, ‘আস্তে আস্তে কথা বলুন, প্লিজ।’
সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য সেলিনা সুলতানা বক্তব্যের সময় সংসদ কক্ষে ধর্মমন্ত্রী ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীকে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখা যায়। বিষয়টি ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের নজরে এলে তিনি বলেন, ‘মাননীয় ধর্মমন্ত্রী এবং মাননীয় এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী, দয়া করে বসে কথা বলুন। আপনাদের পেছনে একজন বক্তব্য দিচ্ছেন। আস্তে আস্তে কথা বলুন, প্লিজ।’ তখনও সেলিনা সুলতানা বক্তব্য অব্যাহত রাখলে ডেপুটি স্পিকার তাকে থামার জন্য বলেন। ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘মাননীয় ধর্মমন্ত্রী এবং এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী, বসে আস্তে ধীরে কথা বলুন। যাতে ওনার কথা শুনতে পারি।’
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে