মক্কা চুক্তি : ভূরাজনৈতিক মরীচিকা?

সময়ের আলো ডেস্ক

জাতীয়

তিন দেশ। ভিন্ন ভাষা। ভিন্ন সংস্কৃতি। এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের ভৌগোলিক সীমানা নেই। এমনকি স্বার্থও আলাদা। তবু সেই দেশগুলো

2026-09-08T02:02:27+00:00
2026-09-08T02:02:27+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৪ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয়
মক্কা চুক্তি : ভূরাজনৈতিক মরীচিকা?
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:০২ এএম 
সময়ের আলো গ্রাফিক
তিন দেশ। ভিন্ন ভাষা। ভিন্ন সংস্কৃতি। এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের ভৌগোলিক সীমানা নেই। এমনকি স্বার্থও আলাদা। তবু সেই দেশগুলো ‘নিজেদের রক্ষায়’ এক মঞ্চে দাঁড়িয়েছে। স্বাক্ষর করেছে এক নতুন চুক্তিতে। এর আনুষ্ঠানিক নাম ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’। সংক্ষেপে এটি ‘মক্কা চুক্তি’ নামে পরিচিত।এই চুক্তির নানা দিক নিয়ে সরগরম আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল।

গত ৭ আগস্ট পবিত্র মক্কা নগরীতে জ্বালানিসমৃদ্ধ সৌদি আরব, সামরিক শক্তিধর তুরস্ক ও পরমাণু ক্ষমতাসম্পন্ন পাকিস্তান নিজেদের মধ্যে সেই বহুল আলোচিত প্রতিরক্ষা চুক্তিটি স্বাক্ষর করে। এটি যে তিন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না সে কথাও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে চুক্তিবদ্ধ দেশগুলোর পক্ষ থেকে। বিশ্ববাসী ইতিমধ্যে জেনে গেছেন মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের পটভূমিতে জন্ম নিয়েছে ‘মুসলিম ন্যাটো’।

Advertisement
মুসলিম ন্যাটো পরিভাষাটি ব্যবহার করা হচ্ছে, কারণ নবগঠিত ত্রিদেশীয় প্রতিরক্ষা চুক্তিতেও ন্যাটোর ‘পঞ্চম অনুচ্ছেদ’ অনুসরণ করা হয়েছে। অর্থাৎ নিয়ম অনুসারে ন্যাটো জোটের এক সদস্য দেশের ওপর আঘাতকে যেমন সব দেশের ওপর আঘাত হিসেবে গণ্য হয়, তেমনি মক্কা জোটেও এক সদস্যের ওপর হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে। কিন্তু বর্তমানে মক্কা জোটবদ্ধ কোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে সেই দেশকে সহায়তার জন্য জোটবদ্ধ অন্য দেশগুলোকে জোটবদ্ধ নয় এমন দেশগুলোর ওপর দিয়ে আসতে হবে। অর্থাৎ ভৌগোলিক সীমা আলাদা থাকায় মক্কা জোটের সদস্য দেশগুলোর একে অন্যকে সরাসরি সহায়তার সুযোগ কম।

সবাই জানেন যে, ১৯৪৯ সালের তথা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই যুদ্ধকালীন মিত্র তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্ভাব্য আগ্রাসন ঠেকাতে সামরিক দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ শক্তিধর দেশ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইউরোপের মিত্র দেশগুলো নিয়ে ‘উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা’ বা ন্যাটো সামরিক জোট গড়ে তোলা হয়েছিল। তবে নবগঠিত মক্কা জোটের উদ্দেশ্য এখনও অনেকের কাছে ‘পরিষ্কার’ নয়। উল্টো প্রশ্ন উঠেছে, এই চুক্তি দিন শেষে কোনো ভূরাজনৈতিক মরীচিকার জন্ম দিতে যাচ্ছে না তো?

এ কথা হয়তো অনেকের মনে আছে যে, আজ থেকে প্রায় এক দশক আগে, ২০১৫ সালের মার্চে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের দমন করতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে মুসলিম দেশগুলোকে নিয়ে একটি সামরিক জোট গঠন করা হয়েছিল। তখনও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছিল ‘গড়ে উঠছে মুসলিম ন্যাটো’।

কেউ কেউ সেই জোটকে ‘সুন্নি মুসলিম জোট’ বলেও আখ্যা দিয়েছিলেন। বাস্তবতা হচ্ছে সেই বহুল আলোচিত জোট দিন শেষে ‘কার্যকর’ হয়ে উঠতে পারেনি। এই নতুন জোট কতটা কার্যকর হয় তাই এখন দেখার বিষয়। ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানকে নিয়ে গড়ে ওঠা নতুন সামরিক চুক্তিকে ‘স্বাগত’ জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মক্কায় চুক্তি স্বাক্ষরের দিন দশেক পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। ট্রাম্প এই ত্রিদেশীয় চুক্তিকে ‘বড়’, ‘সাহসী’ ও ‘গুরুত্বপূর্ণ’ প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন আবেগ-উচ্ছ্বাস ভরা বাণীর পর অনেকে মনে করছেন— দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা পাওয়া সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নয়া জোট ওয়াশিংটন ডিসির একটি ‘সহায়ক’ শক্তি হয়ে উঠতে পারে। গত ১৭ আগস্ট তুরস্কের সরকারি সংবাদ সংস্থা আনাদোলু আজানসি এক সংবাদের শিরোনাম করে— ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের ঘটনায় ট্রাম্প খুবই আনন্দিত’।

ট্রাম্পের ভাষ্য— এই চুক্তির মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে কীভাবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো একত্রিত হচ্ছে। কীভাবে তারা অবশেষে আরও অর্থবহ উপায়ে নিজেদের প্রতিরক্ষায় সক্ষম হয়ে উঠছে। সমাজমাধ্যমের সেই বার্তায় ট্রাম্প সেই নবগঠিত জোটের তিন দেশের মহান নেতাদের অভিনন্দন জানিয়েছেন।

একই দিনে পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ডন জানায়, ট্রাম্পের এমন বক্তব্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ‘যারপরনাই খুশি’। তিনিও ট্রাম্পের ‘সাহসী ও বলিষ্ঠ’ নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন। গত বছর প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সংঘাতের প্রসঙ্গ তুলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন যে, ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে দক্ষিণ এশিয়ায় দুই পরমাণু শক্তিধর দেশের সংঘাত থেমেছে। এর ফলে কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছে। একটি জাতির উন্নয়নের জন্য টেকসই শান্তির প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন শাহবাজ শরিফ।

রিয়াদভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যারাব নিউজের এক প্রতিবেদনে মক্কা চুক্তির সংবাদ পরিবেশন করতে গিয়ে ‘মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের হামলার’ প্রসঙ্গটি উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে গত ২২ আগস্ট লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনের শিরোনামে অতীত স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রশ্ন রাখা হয়— ‘মক্কা চুক্তি কি মুসলিম ন্যাটো নাকি আরেকটি বাগদাদ চুক্তি?’ এতে জানানো হয়, মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা স্বার্থ দেখার জন্য যুক্তরাষ্ট্র বহুদিন ধরে ‘আরব’ বা ‘মুসলিম ন্যাটো’ গড়ার চেষ্টা করে আসছে। এ প্রসঙ্গে ১৯৫৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সার্বিক সহায়তায় ‘বাগদাদ চুক্তি’র কথা প্রতিবেদনটিতে জানানো হয়।
প্রতিবেদন অনুসারে সে বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডুয়াইট আইজেনহাওয়ারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন ফস্টার ডালেস মধ্যপ্রাচ্যে কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব কমাতে বাগদাদ চুক্তির আয়োজন করেছিলেন। সেই জোটে যোগ দিয়েছিল ব্রিটেন, তুরস্ক, শাহ-শাসিত ইরান ও হাশেমি রাজবংশের শাসনে থাকা ইরাক।

এতে আরও বলা হয়, মার্কিন কর্মকর্তারা জর্ডান ও মিসরকে সেই জোটে যুক্ত করতে ব্যাপক পরিশ্রম করেও ব্যর্থ হয়েছিল। কেননা, জর্ডানের রাজা হুসেন সেই জোটে যোগ দেওয়ার আগ্রহ দেখালেও দেশটির জাতীয়তাবাদী ও উপনিবেশবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এর বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ায় তা আর সম্ভব হয়নি। ইরাকের হাশেমিবিরোধী সৌদি আরব ও বিপ্লবী গামাল আবদেল নাসেরের মিসরও সেই বাগদাদ চুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করে।

প্রতিবেদনটি থেকে আরও জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার বাগদাদ চুক্তির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন। তিনি এক বার্তায় মধ্যপ্রাচ্যকে তিনটি বড় ধর্মের— ইহুদি ধর্ম, খ্রিস্ট ধর্ম ও ইসলামের জন্মভূমি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন যে, বিশ্ব মানচিত্রে জেরুজালেম ও মক্কা শুধু দুটি শহর নয়। এই শহরগুলো অনেক গুরুত্ব বহন করে। বার্তায় তিনি কমিউনিস্টদের বস্তুবাদের ওপরে ধর্মীয় আধ্যাত্মবাদের স্থান দিয়েছিলেন। প্রত্যাশা রেখে বলেছিলেন— মধ্যপ্রাচ্যের পবিত্রভূমি যেন ধর্মহীন কমিউনিস্টদের আখড়ায় পরিণত না হয়।

তবে ১৯৫৮ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর ইরাক ও ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান সেই মার্কিনপন্থি বাগদাদ চুক্তি থেকে সরে আসে। মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনটির লেখক ও নিউইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোসেফ মাসাদ মনে করেন, বর্তমানের মক্কা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিনপন্থি শাসকদের রক্ষার এক নতুন প্রচেষ্টামাত্র।

তিনি মনে করেন, ১৯৫০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য যে প্রক্রিয়া শুরু করেছিল এখনকার মক্কা চুক্তি সেই প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। তার মতে, বরাবরের মতো মক্কা চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের স্বার্থ দেখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। চুক্তিবদ্ধ দেশগুলো মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলবিরোধী দেশগুলোকে নিজেদের ‘শত্রু’ বলে গণ্য করবে। এখন অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, এ কারণেই কি পূর্বসূরি আইজেনহাওয়ারের মতো ডোনাল্ড ট্রাম্পও মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর নতুন চুক্তিতে বেশ ‘আনন্দিত’?
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের জোটবদ্ধ হওয়ার আগে থেকেই আরও একটি জোটের কথা আলোচনায় চলে আসে। 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো থেকে জানা যায়— পাকিস্তানের ‘প্রধান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী’ ভারত, তুরস্কের ‘প্রধান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী’ গ্রিস ও সৌদি আরবের ‘প্রধান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী’ সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নিয়ে ইসরাইল নতুন এক বলয় গড়ে তোলার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

গত ৩১ আগস্ট ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরাইলের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভূমধ্যসাগরে প্রতিবেশী তুরস্কের প্রভাব কমাতে গ্রিস অন্য প্রতিবেশী ইসরাইল থেকে সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার চুক্তি করেছে। সেই চুক্তিটির নাম দেওয়া হয়েছে, ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’। এই নামের মধ্যে চুক্তিটির গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য লুকিয়ে থাকতে পারে বলেও মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।

ভূমধ্যসাগর অঞ্চলের রাজনীতির খোঁজ রাখেন যারা তারা জানেন যে, ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে সবসময় সোচ্চার গ্রিসকে ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরে ‘শত্রু’ ভেবে এসেছিল। পরবর্তীতে তুরস্কে ইসলামি ভাবধারার রাজনৈতিক দল একেপি ক্ষমতায় এলে এথেন্সকে ধীরে ধীরে ঝুঁকতে হয় তেল আবিবের দিকে। গত ৩০ আগস্ট ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম দ্য জেরুজালেম পোস্টের এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়, ‘ইসরাইল-সাইপ্রাস-গ্রিস বিদ্যুৎ সংযোগ যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পেয়েছে।’

প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সেই বিদ্যুৎ লাইনটি সাগরের নিচ দিয়ে যাবে উল্লেখ করে এতে জানানো হয়— তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে এমন সহযোগিতার বিরোধিতা করে এলেও ট্রাম্প প্রশাসন মিত্রদের জ্বালানি নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে চায়। এদিকে গত ১ জুলাই, অর্থাৎ মক্কা চুক্তির এক মাসের বেশি সময় আগে দ্য জেরুজালেম পোস্ট ‘পাঁচ জাতি’ সহযোগিতা বলয় গড়ে ওঠার সংবাদ জানিয়েছিল।

প্রতিবেদনটিতে জানানো হয়, এই বলয় গড়ে উঠছে ইসরাইল, ভারত, আরব আমিরাত, গ্রিস ও সাইপ্রাসকে নিয়ে। দেশগুলোর মধ্যে শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করাই নয়, সামরিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গত ১১ আগস্ট মিডল ইস্ট আইয়ের প্রধান সম্পাদক ডেভিড হার্স্ট এক পডকাস্টে বলেন, ইসরাইল যখন গাজা, পশ্চিম তীর ও দক্ষিণ লেবাননে গণহত্যা চালালো এবং ইরানে হামলা করল তখন তুরস্ক ও আরব বিশ্ব হাত গুটিয়ে ছিল।
তিনি আরও বলেন, ইসরাইল বাধাহীনভাবে সিরিয়ায় বোমা ফেলে যাচ্ছে। অথচ আরব লিগ চুপ। ডেভিড হার্স্টের মতে, ইরানে মার্কিন হামলা ব্যর্থ হওয়ায় আরব দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র তাদেরকে রক্ষা করবে এমন ভাবনায় চিড় ধরেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়েও আরব দেশগুলোর মনে প্রশ্ন জেগেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এ ছাড়া ‘মক্কা জোট’ যে শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে সে কথা বলতেও ভুলেননি তিনি। মিডল ইস্ট আইয়ের প্রধান সম্পাদক তার পডকাস্টে আরও বলেন, তুরস্ক চেয়েছিল মক্কা জোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে মিসর থাকুক। কিন্তু সৌদি আরব তাতে বাধ সাধে। কেননা সৌদি আরবের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী আরব আমিরাতের সঙ্গে মিসরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। ডেভিড হার্স্টের কথায় বোঝা যাচ্ছে যে নবগঠিত মক্কা জোটের শুরুটা হয়েছে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ‘অন্তর্দ্বন্দ্বের’ মধ্য দিয়ে।


অন্যদিকে গত ৩১ আগস্ট মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ পাকিস্তানের বরাত দিয়ে জানায় যে আরও ছয়-সাতটি মুসলিমপ্রধান দেশ মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদন অনুসারে, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জানিয়েছেন, অন্য দেশগুলোর মক্কা জোটে আসার পথ পরিষ্কার করতে কর্মকর্তারা কাজ করে যাচ্ছেন। তবে তিনি সেসব দেশের নাম নির্দিষ্ট করে বলেননি।

অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা নেওয়া তিন দেশ যখন যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতিক্রমে নিজেদের মধ্যে জোট গড়ে তোলে তখন সেই জোট যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ দেখে চলার চেষ্টা করবে তা বলাই বাহুল্য। তাদের মতে, মুসলিম দেশগুলোর অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে জিসিসি, আরব লিগ, ইসিও বা ওআইসির মতো সংস্থাগুলো কোনোটিই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এমন বাস্তবতায় মক্কা জোট নিয়ে যতটা আলোচনা চলছে, তা ততটা সুফল আনতে পারবে কি? এমন প্রশ্ন অনেকের।

গত ১২ আগস্ট কাতারভিত্তিক অলাভজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের এক প্রতিবেদনে মক্কা চুক্তির ‘আদ্যোপান্ত’ তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, চুক্তিটির মূল লক্ষ্য হচ্ছে ‘প্রতিরক্ষামূলক’। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সামরিক নির্ভরতা কমানো অথবা দেশগুলোর বিদ্যমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে না। প্রতিবেদন অনুসারে, মক্কা চুক্তি মূলত জোটবদ্ধ দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেবে। আঞ্চলিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি এটি শান্তি, স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক সমৃদ্ধিতে অবদান রাখারও চেষ্টা করবে।

পরের দিন অন্য এক প্রতিবেদনে মক্কা চুক্তিকে আমদানি করা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় চলে আসার উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র এখন চীনকে মোকাবিলা ও এশিয়ায় অন্যান্য স্বার্থরক্ষায় বেশি ব্যস্ত। এ ছাড়াও সব আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলা মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা বদলে দিয়েছে। তবে জোটবদ্ধ দেশগুলো যদি এখনও আমদানিনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আটকে থাকে তা হলে এই নবগঠিত জোটের সাফল্য ও ব্যর্থতা সেসব দেশের ওপর নির্ভর করবে যেসব দেশ থেকে তারা প্রতিরক্ষা পণ্য আমদানি করে।

মক্কা জোটের দেশগুলো যদি নিজেদের ভাগ্য নিজেরা লিখতে ব্যর্থ হয় তা হলে জোটের ভাগ্যও সেদিকে যাওয়ার আশঙ্কা আছে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। নয়াদিল্লির ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্সের এক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয় ‘মক্কা চুক্তি : নিরাপত্তার অন্বেষণ নাকি ভূরাজনৈতিক মরীচিকা?’

এতে বলা হয়, মক্কা চুক্তি এমন একসময় স্বাক্ষর হলো যখন সৌদি আরব ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের নিয়ে চরম সংকটে। কেননা সশস্ত্র সংগঠনটি সৌদি আরবের তেল স্থাপনার পাশাপাশি লোহিত সাগরে সৌদি ট্যাঙ্কারেও হামলা চালিয়েছে। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে সৌদি আরব প্রতিবেশী ইয়েমেনের বিমানবন্দরগুলোয় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে ইয়েমেনের রাজধানী সানায় তেহরানের সহায়তা সামগ্রী পৌঁছাতে না পারে।

গত ১৬ আগস্ট মক্কা চুক্তির গুরুত্ব নিয়ে তুরস্কের সরকারনিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম ডেইলি সাবাহর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মক্কা চুক্তি হচ্ছে তাদের জন্য সতর্কবার্তা, যারা প্রথম হামলা করার পরিকল্পনা করছে। গত ১০ আগস্ট জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদনে প্রশ্ন রাখা হয়, নতুন মক্কা চুক্তি কোন দেশকে লক্ষ্য করে হচ্ছে? এতে বলা হয়, বিশ্লেষকরা মনে করছেন সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে মক্কা চুক্তি করেনি। চুক্তিবদ্ধ দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরাইলের আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। প্রতিবেদনটিতে সৌদি স্বার্থে হুথিদের হামলার প্রসঙ্গটিও তুলে ধরা হয়েছে।

গত ৯ আগস্ট আলজাজিরার এক মতামত প্রতিবেদনে বলা হয়, মক্কা চুক্তি শুধু একটি আঞ্চলিক জোট নয়। এটি এর চেয়েও বেশি কিছু। এটি মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গত ১০ আগস্ট জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলের প্রতিবেদনটিতে আরও জানানো হয়, সৌদি আরব ও পাকিস্তান এখন পর্যন্ত ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়নি। যদিও তেল আবিবের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ রক্ষা করে রিয়াদ।

অন্যদিকে তুরস্ক প্রথম মুসলিম দেশ হিসেবে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিলেও গাজায় ইসরাইলি গণহত্যার কারণে একসময়ের ঘনিষ্ঠ দুই মিত্রের সম্পর্কে টান লেগেছে। এ ছাড়াও লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরাইলি হামলার ক্রমাগত প্রতিবাদ করে আসছে আঙ্কারা। জেরুজালেম ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র‍্যাটেজি অ্যান্ড সিকিউরিটির রিসার্চ ফেলো অশরিত বিরভাদকার ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ইসরাইল হাউমে লিখেছেন, মক্কা চুক্তি ইসরাইলের জন্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। তেল আবিবের সঙ্গে রিয়াদের সম্পর্ক স্বাভাবিক ও ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ গড়ে তোলার ভাবনাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

তার মতে, মক্কা চুক্তি তুরস্ক ও ইসরাইলের মধ্যে বিরোধ বাড়িয়ে দেবে। এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক এক্স বার্তায় বলেন, মুসলিম দেশগুলো এক হলে বাইরের দেশগুলোর খবরদারি মোকাবিলা করা সহজ হবে। বিশ্লেষকদের অনেকে ইরানের শীর্ষ কূটনীতিকের এমন বক্তব্যকে মক্কা চুক্তির পক্ষে ইরানের অবস্থান বলে গণ্য করছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র-ঘনিষ্ঠ মক্কা চুক্তিতে স্বাক্ষর করা সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান থেকে সতর্ক থাকার আহ্বানও জানিয়েছেন ইরানের রাজনীতিকদের অনেকে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে, যে মক্কা চুক্তি নিয়ে আশা-নিরাশার দোলাচল বেশ প্রকট। কেননা চুক্তিটির অনেক কিছুই এখনও অনেকের কাছে অজানা। এখন তাই দেখার বিষয় বহুল আলোচিত এই মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি দিন শেষে বিশ্ববাসীকে কী বার্তা দেয়।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে
  বিষয়:   মক্কা চুক্তি : ভূরাজনৈতিক মরীচিকা? 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: