দীর্ঘ এক দশক দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পর এবার নির্দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে স্থানীয় নির্বাচন। তাই ২০১৬ সালের আচরণবিধি বাদ দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও জেলা পরিষদসহ সব স্তরের জন্য নতুন আচরণবিধি জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সোমবার ইসি সচিব আখতার আহমদের স্বাক্ষর করা আলাদা আলাদা আচরণবিধির গেজেট প্রকাশ করা হয়।
নতুন আচরণবিধিতে যা রয়েছে-
প্রচারে পোস্টার নয়, বিলবোর্ডে সীমা : নতুন আচরণবিধিতে নির্বাচনি প্রচারে পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ব্যানার, লিফলেট, ফেস্টুন ও বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও এগুলোর আকার ও ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। ব্যানারের সর্বোচ্চ আকার ১০ ফুট বাই ৪ ফুট। লিফলেট ও হ্যান্ডবিল হতে হবে এ-ফোর আকারের— ৮ দশমিক ২৭ ইঞ্চি বাই ১১ দশমিক ৬৯ ইঞ্চি। ফেস্টুনের সর্বোচ্চ আকার ১৮ ইঞ্চি বাই ২৪ ইঞ্চি। বিলবোর্ডের প্রচার অংশের সর্বোচ্চ আকার ১৬ ফুট বাই ৯ ফুট।
পাঁচ ধরনের নির্বাচনে আলাদা বিধান—
ইউনিয়ন পরিষদ : প্রতি ওয়ার্ডে একটি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। নির্বাচনি প্রচারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যয় নির্বাচনি ব্যয়ের মধ্যে দেখাতে হবে। মাইক ব্যবহার করা যাবে দুপুর ১২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। আগে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ ছিল না, এবার তা সীমিত পরিসরে যুক্ত হয়েছে।
উপজেলা পরিষদ : প্রতি ইউনিয়ন বা পৌর ওয়ার্ডে একটি করে এবং পুরো নির্বাচনি এলাকায় সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। নির্বাচনি ক্যাম্পের সংখ্যাও সীমিত করা হয়েছে। নির্বাচনি ক্যাম্প স্থাপনেও সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয়ভাবে একটি, প্রতি ইউনিয়নে একটি এবং পৌরসভা এলাকায় প্রতি তিন ওয়ার্ডের একটির বেশি ক্যাম্প করা যাবে না।
পৌরসভা : প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। দুপুর ১২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মাইক, ক্যারাভান বা ভ্রাম্যমাণ বাহনে প্রচার চালানো যাবে।
জেলা পরিষদ : প্রতি থানা বা উপজেলায় একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। এ নির্বাচনে মাইক ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়নি।
প্রচারসামগ্রী হতে হবে সাদা-কালো : নির্বাচনি প্রচারের সামগ্রী হতে হবে সাদা-কালো। ফেস্টুন ও হ্যান্ডবিলে পলিথিনের আবরণ বা পিভিসি ব্যবহার করা যাবে না। প্রচারসামগ্রীতে মুদ্রণের তারিখ থাকতে হবে। প্রতীকের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা ছয় ফুটের বেশি হতে পারবে না। প্রচারে জীবন্ত প্রাণীও ব্যবহার করা যাবে না।
মাইক, ক্যারাভান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম : নির্বাচনি প্রচারে মাইক বা শব্দবর্ধক যন্ত্র ব্যবহারের সময় দুপুর ১২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে একটির বেশি মাইক ব্যবহার করা যাবে না। একই সময়সীমায় ক্যারাভান বা ভ্রাম্যমাণ বাহনেও প্রচারের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে জেলা পরিষদ নির্বাচনে মাইক ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের সুযোগ থাকলেও এর ব্যয় নির্বাচনি ব্যয়ের হিসাবে দেখাতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য, বিকৃত ছবি বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট প্রচারের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে।
এনআইডি-মোবাইল নম্বর সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা : আচরণবিধিতে বলা হয়েছে, প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে ভোটারদের প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে ভোটারের নিজের বা পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নম্বর সংগ্রহ করা যাবে না। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে (এমএফএস) লেনদেনের উদ্দেশ্যেও ভোটারের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারদের এনআইডি ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের নম্বর সংগ্রহের অভিযোগ ওঠার পর ইসি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছিল। এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আচরণবিধিতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরাসরি নিষিদ্ধ করা হলো।
প্রচারে থাকবেন না ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ ব্যক্তিরা : স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ ব্যক্তিদের অংশ নেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা রাখা হয়েছে। তালিকায় প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, চিফ হুইপ, বিরোধীদলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা, বিরোধীদলীয় উপনেতা, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ, উপমন্ত্রী বা সমমর্যাদার ব্যক্তি, সংসদ সদস্য এবং সিটি মেয়রের পাশাপাশি মেয়রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রশাসকদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রার্থী ছাড়া চেয়ারম্যান, মেয়র, প্রশাসক বা স্থানীয় সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি নির্বাচনি প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না।
এ ছাড়া সরকারি বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা নির্বাচনি এলাকায় প্রচার বা নির্বাচনি কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না। আচরণবিধিতে তাদের নির্বাচনি প্রচারে অংশগ্রহণের ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
আচরণবিধি ভাঙলে জরিমানা : নতুন আচরণবিধিতে নিয়ম লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ইউপি আচরণবিধি লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ডের পাশাপাশি জরিমানা ১০ হাজার টাকা বহাল রাখা রয়েছে।
ধর্মীয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রচার নয় : মসজিদ, মন্দির, ক্যায়াং, প্যাগোডা, গির্জা বা অন্য কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ে নির্বাচনি প্রচার চালানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একইভাবে কোনো সরকারি অফিস বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের নির্বাচনি প্রচার চালানো যাবে না। তবে শিক্ষা কার্যক্রমে কোনো ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ ব্যবহার করা যাবে।
নাগরিকের সম্পত্তির ক্ষতি করা যাবে না : নির্বাচন উপলক্ষে কোনো নাগরিকের জমি, ভবন বা অন্য কোনো স্থাবর কিংবা অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষতিসাধন করা যাবে না। অনভিপ্রেত গোলযোগ বা উচ্ছৃঙ্খল আচরণের মাধ্যমে কারও শান্তি বিনষ্ট করার ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
ভোটারকে প্রভাবিত করতে বলপ্রয়োগ ও অর্থ ব্যয় নিষিদ্ধ : কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে ভোটারদের প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে বলপ্রয়োগ কিংবা অর্থ ব্যয় করা যাবে না। অর্থাৎ ভোট আদায়ের জন্য সরাসরি অর্থের ব্যবহার যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি ভয়ভীতি বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেও ভোটারকে প্রভাবিত করা যাবে না।
ভোটকেন্দ্রে অস্ত্র ও বিস্ফোরক নিষিদ্ধ : কমিশনের অনুমোদিত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ ভোটকেন্দ্রের নির্ধারিত সীমানার মধ্যে বিস্ফোরক, বিস্ফোরক দ্রব্য, অস্ত্র ও গোলাবারুদ বহন করতে পারবেন না। এ ক্ষেত্রে প্রচলিত বিস্ফোরক ও অস্ত্র-সংক্রান্ত আইনে সংজ্ঞায়িত সামগ্রী নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকবে।
মাইক ব্যবহারে শব্দসীমা : নির্বাচনি এলাকায় দুপুর ১২টার আগে এবং সূর্যাস্তের পর মাইক বা শব্দের মাত্রা বর্ধনকারী যন্ত্র ব্যবহার করে প্রচার চালানো যাবে না। প্রচারে ব্যবহৃত মাইক বা শব্দ বর্ধনকারী যন্ত্রের শব্দের মাত্রাও ৬০ ডেসিবেলের বেশি হতে পারবে না।
উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আইন ও বিধির সঙ্গে সমন্বয় রেখেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আচরণবিধি করা হয়েছে। চলতি বছরের শেষ দিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করতে চায় কমিশন। প্রথম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদের ভোট আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। দেশের ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৬১টি জেলা পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা ও ১৩টি সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন পদে ধাপে ধাপে ভোট আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে