চব্বিশের গণহত্যা নিয়ে অনুশোচনাহীন আ.লীগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজনীতি

চব্বিশ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের মধ্যে এখন পর্যন্ত অনুশোচনা দেখা যায়নি। দলটির গণহত্যা ও দমন-পীড়ন

2026-09-09T00:37:54+00:00
2026-09-09T00:37:54+00:00
 
  বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৫ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাজনীতি
চব্বিশের গণহত্যা নিয়ে অনুশোচনাহীন আ.লীগ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৩৭ এএম 
কার্যক্রম নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের লোগো। ছবি : সংগৃহীত
চব্বিশ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের মধ্যে এখন পর্যন্ত অনুশোচনা দেখা যায়নি। দলটির গণহত্যা ও দমন-পীড়ন নিয়ে দৃশ্যমান কোনো আত্মসমালোচনা বা অনুশোচনার বার্তা না আসায় রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। অতীতের সহিংসতা ও রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহারের প্রশ্নে দলটি এখনও দায় স্বীকারের পথে হাঁটেনি। বরং দলটি আগের অবস্থানেই রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের আগে কয়েক মাস ধরে চলা আন্দোলন, দমন-পীড়ন, গুম, গ্রেফতার ও প্রাণহানির ঘটনায় দেশের বিভিন্ন মহলে আওয়ামী লীগের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা এখনও চলমান।

এদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ফ্যাসিস্ট হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। এরপর দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়, নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে এবং দলটির শীর্ষ নেতাদের বড় একটি অংশ আত্মগোপনে কিংবা দেশের বাইরে চলে যান। পরে ২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে দলটির পাশাপাশি এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়। 

Advertisement
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দল ও নেতাদের বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার কথা বলা হয়। কিন্তু ক্ষমতা হারানোর দুই বছর পরও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের বড় অংশের বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থানে জুলাই-আগস্টের রক্তাক্ত ঘটনাবলির জন্য স্পষ্ট অনুশোচনা, দায় স্বীকার কিংবা নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার কোনো আলামত দেখা যাচ্ছে না। গত সোমবার ৮৩তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমার প্রদর্শনীতে অংশ নিতে ইতালিতে থাকা অবস্থায় অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন হেনস্থার শিকার হয়েছেন। 

এরই প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারের কর্মকাণ্ড জানাতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান আওয়ামী লীগকে কোনো রাজনৈতিক দল হিসেবে মনে করেন না বলে জানিয়েছেন। দলটিকে একটি ‘মাফিয়া গ্যাং’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলা ও হেনস্থার ঘটনা আবার বোঝাল, তাদের রাজনৈতিক দল হিসেবে বিবেচনা করে কোনোভাবে বাংলাদেশে রাজনীতি করতে দেওয়া উচিত হবে কি না।

এদিকে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন একপর্যায়ে সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে সংঘাত তীব্র হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও আন্দোলন দমনের নামে গণহত্যায় মেতে ওঠে। 

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দফতরের (ওএইচসিএইচআর) প্রাথমিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে আন্দোলনকারী, পথচারী, সাংবাদিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যওরা আছেন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে ২০২৬ সালের ৫ আগস্ট ভারতে পলায়নরত অবস্থায় শেখ হাসিনা অনলাইনের মাধ্যমে মিডিয়ায় বক্তব্য রাখেন। তিনি আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি করেন এবং দেশে ফেরার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের আন্দোলন ও তার সরকারের পতন নিয়ে নিজের ব্যাখ্যাও তুলে ধরেন। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, চব্বিশের অভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবার, আহত আন্দোলনকারী এবং সাধারণ মানুষের কাছে এখনও কিছু হিসাব মেলেনি। তারা জানতে চান— কেন গুলি চলেছিল, কেন এত প্রাণ গেল, কার নির্দেশে রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল, রাজনৈতিক কর্মীরা কেন সহিংসতায় জড়িয়েছিল এবং সেই দায় কে নেবে? দুই বছর পরও আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সেই প্রশ্নগুলোর সুস্পষ্ট উত্তর নেই। অর্থ্যাৎ চব্বিশের গণহত্যা নিয়ে কোনো ধরনের অনুশোচনা নেই আওয়ামী লীগের। রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নটি— জুলাই-আগস্টে নিহত মানুষের জন্য আওয়ামী লীগ কি নিঃশর্তভাবে দুঃখ প্রকাশ ও দায় স্বীকার করবে? তার পরিষ্কার উত্তর এখনও দলটির পক্ষ থেকে পাওয়া যায়নি।


ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণবিপ্লবের মুখে গণহত্যার দায় আওয়ামী লীগ এড়াতে পারে না। এখন দলটির নেতাকর্মীরা হতবাক ও দিশেহারা হয়ে পড়েছে। জুলাই গণহত্যার দায়ে আওয়ামী লীগ সামাজিক, রাজনৈতিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে। সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের পরাজয় ঘটেছে। ফলে দলটির গণঅভ্যুত্থানের হতাহতের ঘটনায় দায় স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করা উচিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. সাবের আহমেদ চৌধুরী বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগকে ফিরে আসাটা নির্ভর করছে সরকারি দল বিএনপি ও সরকারের ওপর। দলটির বড় ধরনের কোনো শোডাউন করলে তার খেসারত দলটিকে দিতে হবে। কারণ, দলটি জুলাই আন্দোলনে যে গণহত্যা হয়েছে, তার জন্য অনুশোচনা নেই। যেহেতু দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ, সে কারণে ধীরস্থিরভাবে এগোনো উচিত। জুলাই আন্দোলনে যারা ছিলেন, তারাও সক্রিয় রয়েছেন। শুধু শুধু আওয়ামী লীগের এগ্রেসিভ হওয়া ঠিক হবে না। বরং তাদের দুঃখ প্রকাশ করা উচিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারি বলেন, আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে দেশকে স্থিতিশীল করা কঠিন। আবার তাদের রাজনীতি করার সুযোগ দিলে জামায়াত-এনসিপি মেনে নেবে না। জুলাইয় আন্দোলনে যে গণহত্যা চালানো হয়েছে, সে জন্য দলটি এখনও অনুতপ্ত নয়। ফলে সাধারণ মানুষ তাদের মেনে নেবে না। দলটির উচিত অনুতপ্ত হয়ে দুঃখ প্রকাশ করা উচিত। 

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 
  বিষয়:   চব্বিশ  গণহত্যা  অনুশোচনাহীন  আ.লীগ 


Loading...
Loading...
রাজনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: