ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার কুয়াশায় ঢাকা উপকূলীয় অরণ্য। চারদিকে শত শত বছরের পুরোনো গাছ, শ্যাওলায় ঢাকা পাথর, পাহাড়ি ঝরনা আর বৃষ্টির অবিরাম শব্দ। সেই সবুজ-ধূসর বনের বুক চিরে বয়ে যাওয়া কোনো স্বচ্ছ স্রোতের ধারে হঠাৎ দেখা মিলতে পারে এক আশ্চর্য প্রাণীর— সাদা লোমে ঢাকা একটি ভল্লুক।
দূর থেকে তাকে দেখে মনে হতে পারে, এ বুঝি বরফের দেশের কোনো শ্বেতভল্লুক পথ ভুল করে বৃষ্টিঅরণ্যে চলে এসেছে। কিন্তু আসলে তা নয়। এই ভল্লুকের নাম কেরমোড ভল্লুক বা স্পিরিট বিয়ার। বৈজ্ঞানিকভাবে এটি আমেরিকান ব্ল্যাক বিয়ারের একটি উপপ্রজাতি। একই উপপ্রজাতির কোনো সদস্য কালো, আবার কোনোটি এমন দুধসাদা বা ক্রিম রঙের হতে পারে।
সাদা, কিন্তু শ্বেতভল্লুক নয় : স্পিরিট বিয়ারের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য তার রং। কিন্তু এই সাদা লোম তাকে আলাদা কোনো প্রজাতির প্রাণী বানায়নি। মা-বাবার কাছ থেকে একটি বিশেষ জিনের দুটি কপি পেলে ব্ল্যাক বিয়ারের শরীরে সাদা লোমের এই বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। তাই একই পরিবারে কালো ও সাদা— দুই রঙের শাবকও জন্মাতে পারে। এই সাদা রূপ সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার প্রিন্সেস রয়েল ও গ্রিবেল ইসল্যান্ডে। মূল ভূখণ্ডে এগুলো তুলনামূলকভাবে বিরল।
তার রাজ্য বৃষ্টিঅরণ্য ; স্পিরিট বিয়ারের প্রকৃত ঘর হলো কানাডার গ্রেট বিয়ার রেইনফরেস্ট— বিশ্বের বৃহত্তম অক্ষত উপকূলীয় নাতিশীতোষ্ণ বৃষ্টিঅরণ্যগুলোর একটি। সমুদ্র, দ্বীপ, নদী, জলাভূমি ও পুরোনো বন মিলিয়ে তৈরি এই বিশাল বাস্তুতন্ত্রই তার জীবনকে গড়ে দিয়েছে।
এই বনে ভল্লুকের জীবন ঋতুর সঙ্গে বদলে যায়। বসন্তে শীতঘুম থেকে বেরিয়ে তারা খুঁজতে থাকে কোমল ঘাস, বিভিন্ন উদ্ভিদের কচি অংশ, শিকড় ও সহজলভ্য খাবার। গ্রীষ্মে খাদ্যতালিকায় যোগ হয় নানা ধরনের ফল ও বেরি। পোকামাকড়ও তাদের গুরুত্বপূর্ণ খাবার। আর শরৎ এলে বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট— নদীতে শুরু হয় স্যামন মাছের আগমন।
নদী যখন হয়ে ওঠে খাবারের ভান্ডার : স্পিরিট বিয়ারের জীবনে স্যামন মাছের গুরুত্ব অসাধারণ। শরৎকালে নদীতে ডিম পাড়তে আসা স্যামন তখন তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাণিজ খাদ্য। ভল্লুক নদীর অগভীর পানিতে দাঁড়িয়ে মাছ ধরে, কখনো পাথরের আড়ালে অপেক্ষা করে, আবার কখনো স্রোতের মধ্যে নেমে পড়ে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়।
একটি স্যামন মাছ খেয়ে ফেলার পর তার অবশিষ্ট অংশ নদীর তীরে, বনের মাটিতে কিংবা গাছের গোড়ায় পড়ে থাকে। সেই মৃত মাছের দেহ থেকে আসা পুষ্টি মাটিতে মিশে যায়। অন্য প্রাণী ও পাখিরাও সেই অবশিষ্টাংশ খায়। অর্থাৎ ভল্লুক যে মাছ খাচ্ছে, সেটি শুধু তার পেট ভরাচ্ছে না— বনের খাদ্যচক্রেও ফিরিয়ে দিচ্ছে নদীর পুষ্টি। এই কারণে স্পিরিট বিয়ারকে তার পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি প্রাণী হিসেবে দেখা হয়। নদীর স্যামন থেকে বনের গাছ— এই দীর্ঘ খাদ্যশৃঙ্খলের মাঝখানে সে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ।
শুধু মাংস নয়, উদ্ভিদও তার খাবার : ভল্লুক মানেই শুধু মাংসখেকো— এ ধারণা ভুল। স্পিরিট বিয়ারও সর্বভুক। তার খাদ্যের বড় অংশ আসে উদ্ভিদ থেকে। ঘাস, কচি উদ্ভিদ, বেরি, ফল, বিভিন্ন উদ্ভিদজাত খাবারের পাশাপাশি সে পোকামাকড়, মাছ এবং সুযোগ পেলে ছোট প্রাণীও খায়।
শীতের আগে তাকে প্রচুর খাবার খেতে হয়। শরীরে চর্বি জমিয়ে নিতে হয়, কারণ দীর্ঘ সময়ের জন্য তাকে আশ্রয়ে থাকতে হবে। বড় পুরোনো গাছের কাণ্ড, গুঁড়ি কিংবা গাছের তৈরি প্রাকৃতিক গর্তও তার শীতকালীন আশ্রয়ের অংশ হতে পারে। ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার বন ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত নথিতে পুরোনো গাছ ও মৃত কাঠের গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বনের সঙ্গে তার সম্পর্ক একতরফা নয় : প্রকৃতি স্পিরিট বিয়ারকে খাবার ও আশ্রয় দেয়, কিন্তু ভল্লুকও বনকে কিছু ফিরিয়ে দেয়। বিশেষ করে স্যামন শিকার করে বনের ভেতরে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে নদীর পুষ্টি স্থলভাগে পৌঁছে যায়। মাছের অবশিষ্টাংশ পচে মাটিতে মিশে উদ্ভিদ ও অণুজীবের জন্য পুষ্টির উৎস হয়। অন্য প্রাণীরাও সেই খাবারের অংশীদার হয়।
অর্থাৎ স্পিরিট বিয়ারকে শুধু একটি বিরল সাদা ভল্লুক হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যায় না। সে আসলে বন, নদী, মাছ, গাছপালা ও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে চলমান এক বিশাল প্রাকৃতিক চক্রের অংশ।
মানুষের সংস্কৃতিতেও বিশেষ মর্যাদা : স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে এই প্রাণীর গুরুত্ব আরও গভীর। কিতাসু/শাই’শাইস জনগোষ্ঠীর মৌখিক ঐতিহ্যে স্পিরিট বিয়ারকে প্রাচুর্যে ভরা প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞ থাকার একটি স্মারক হিসেবে দেখা হয়। সেই সাংস্কৃতিক সম্পর্কও এই প্রাণী সংরক্ষণের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
টিকে থাকার পথে ঝুঁকি : স্পিরিট বিয়ারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো তার বাসস্থান ও খাদ্যব্যবস্থার পরিবর্তন। পুরোনো উপকূলীয় বন কেটে ফেলা বা বনভূমির কাঠামো বদলে যাওয়া তার আশ্রয় ও খাদ্য সংগ্রহের জায়গা সংকুচিত করতে পারে। রাস্তা ও মানুষের অবকাঠামোও ভল্লুকের চলাচল ও বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে জিনের আদান-প্রদানকে প্রভাবিত করতে পারে। মানুষের ফেলে রাখা খাবার ও আবর্জনা ভল্লুককে মানুষের বসতির কাছে টেনে এনে সংঘাত ও মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি উদ্বেগ স্যামন মাছের প্রাপ্যতা— জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত মাছ ধরা ও নদীর পরিবেশের পরিবর্তন স্যামনের ওপর চাপ সৃষ্টি করলে তার প্রভাব পড়ে ভল্লুকের খাদ্যভান্ডারেও। বিরল সাদা বৈশিষ্ট্যটি ধরে রাখার জন্যও আলাদা সংরক্ষণ-চিন্তা প্রয়োজন, কারণ কেরমোড ভল্লুকের ছোট ও বিচ্ছিন্ন দ্বীপভিত্তিক জনগোষ্ঠীতে জিনগত বৈচিত্র্যের পরিবর্তন এই বৈশিষ্ট্যের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত স্পিরিট বিয়ারের গল্প কেবল একটি সাদা ভল্লুকের গল্প নয়। এটি এমন এক অরণ্যের গল্প, যেখানে নদীর মাছ বনের গাছকে পুষ্টি দেয়, বন ভল্লুককে আশ্রয় দেয়, আর ভল্লুক সেই পুষ্টিকে আবার বনের ভেতরে ছড়িয়ে দেয়। তার সাদা শরীর তাই প্রকৃতির কোনো বিচ্ছিন্ন বিস্ময় নয়— এটি একটি জীবন্ত, পরস্পরনির্ভর বাস্তুতন্ত্রের প্রতীক।
আর সে কারণেই কুয়াশায় ঢাকা কানাডার বৃষ্টিঅরণ্যে নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সাদা ভল্লুকটিকে দেখলে শুধু তার সৌন্দর্য নয়, তার চারপাশের পুরো বনটিকেও দেখতে হয়। কারণ স্পিরিট বিয়ার একা বাঁচে না— তার সঙ্গে বেঁচে থাকে পুরো অরণ্য।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে