ইয়েমেনে সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে লড়াই আরও তীব্র হয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরবের দাবি, ইরান সমর্থিত হুথিরা দেশটির অবকাঠামো ও বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার ভোরে সৌদি আরবের কয়েকটি প্রদেশে সম্ভাব্য হামলার সতর্কতা জারি করা হয়। এর আগে হুথিরা অভিযোগ করে, সৌদি বাহিনী ১২ ঘণ্টায় ৫৪টি বিমান হামলা চালিয়েছে। এর জবাব দেওয়ার হুমকি দিয়েছে তারা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানবিরোধী যুদ্ধকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যেই ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, ২৪ আগস্ট থেকে ইয়েমেনে সংঘর্ষে ১ হাজারের বেশি মানুষ হতাহত হয়েছেন এবং কয়েক হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
বুধবার স্থানীয় বার্তা সংস্থা সাবা জানায়, মধ্যাঞ্চলীয় মারিব প্রদেশে হুথিদের গোলাবর্ষণে একটি শিশুসহ অন্তত তিন শিশু নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরও ছয়জন। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে একই ধরনের এটি দ্বিতীয় হামলা বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এর আগে আরেকটি হামলায় দুই শিশু নিহত ও ১৫ জন আহত হয়।
হুথিরা জানিয়েছে, উত্তরাঞ্চলীয় আল-জাওফ প্রদেশের একটি কারাগারে হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৩২ জনে দাঁড়িয়েছে। মঙ্গলবারের ওই হামলায় আরও সাতজন আহত হয়েছে।
২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা দখল করার পর থেকে ইয়েমেনে সংঘাত চলছে। এর পরের বছর সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট হস্তক্ষেপ করলে ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হলে বড় ধরনের লড়াই বন্ধ হয়। তবে জুলাইয়ে সানা বিমানবন্দরে হামলার পর আবার সংঘর্ষ শুরু হয়।
গত সপ্তাহে হুথিরা হোদেইদা ও তাইজ প্রদেশে বড় ধরনের অভিযান চালিয়ে বাব আল-মান্দেব প্রণালির দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে। এর জবাবে সরকারি বাহিনী পাল্টা হামলা চালায় এবং আল-জাওফসহ অন্যান্য এলাকায় অভিযান বাড়ায়। সংঘাতের প্রভাব সৌদি আরবেও পড়েছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি বুধবার বলেন, হুথিরা সৌদির বিভিন্ন স্থাপনা ও অবকাঠামোতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা খামিস মুশাইত, আবহা ও জাজান এলাকায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করেছে। তিনি বলেন, হুথিদের জঘন্য হামলার জবাব দেবে জোট।
বৃহস্পতিবার সৌদির বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ খামিস মুশাইত ও আবহায় একাধিক সতর্কতা জারি করে। তবে এসব সতর্কতার ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, সৌদি বাহিনী ১২ ঘণ্টায় ছয়টি প্রদেশে ৫৪টি বিমান হামলা চালিয়েছে। হামলাগুলো চালানো হয়েছে আল-জাওফ, মারিব, তাইজ, হোদেইদা, সাদা ও আল-বায়দায়।
তিনি বলেন, এসব বিমান হামলা এবং আমাদের দেশের বিরুদ্ধে চলমান আগ্রাসনের জবাব অবশ্যই দেওয়া হবে এবং শাস্তি দেওয়া হবে— আল্লাহর ইচ্ছা ও শক্তিতে। মঙ্গলবারও সারি দাবি করেন, আগের কয়েক দিনে হুথিদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সৌদি বাহিনী ১২১টি বিমান হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে হুথিরা আবহা, নাজরান ও জাজানে সৌদি আরবের তেল কোম্পানি আরামকোর বিভিন্ন স্থাপনা এবং খামিস মুশাইত বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করে। সৌদি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হুথিদের হামলায় অন্তত ৭৩ জন আহত হয়েছেন।
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী জানিয়েছে, তারা টানা তৃতীয় দিনের মতো আল-জাওফে অগ্রসর হয়েছে এবং ওই এলাকায় হুথিদের সরবরাহ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করেছে। তাইজে হুথিদের অবস্থানেও হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে তারা। এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। এদিকে পাকিস্তান জানিয়েছে, সৌদি আরবের ওপর হামলা হলে গত মাসে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সই হওয়া ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ কার্যকর হতে পারে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ মঙ্গলবার রাতে পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম জিও নিউজকে বলেন, যদি বিনা উসকানিতে আগ্রাসন হয়, অথবা ইয়েমেনে যা ঘটছে তার প্রভাব সৌদি আরবে ছড়িয়ে পড়ে, তা হলে অবশ্যই মক্কা চুক্তি কার্যকর হবে। তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়। এই চুক্তির শর্ত মেনে চলতে আমরা বাধ্য। প্রয়োজন হলে আমরা অবশ্যই তা মেনে চলব।
গত মাসে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নেতারা মক্কা চুক্তিতে সই করেন। এর আওতায় যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তিন দেশ যৌথ প্রতিরোধব্যবস্থা জোরদারে সম্মত হয়েছে। চুক্তিটি ন্যাটোর একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অর্থাৎ কোনো একটি সদস্য দেশের ওপর হামলাকে পুরো জোটের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তবে এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া এখনও স্পষ্ট করা হয়নি।
ইসরাইলের সামরিক সক্ষমতা বাড়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বৃদ্ধিসহ আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়তে থাকায় তিন দেশ এই চুক্তিতে সই করে। ২০২৬ সালের গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার সূচক অনুযায়ী, সামরিক শক্তির দিক থেকে ১৪৫টি দেশকে মূল্যায়ন করা এই সূচকে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সম্মিলিত সক্রিয় সেনাসদস্যের সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। তাদের রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ সামরিক বিমান, ৬ হাজার ট্যাঙ্ক ও ৩৪০টির বেশি নৌযান।
অন্যদিকে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। আরব লিগের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইরানের ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নিন্দা জানানোর পর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ইয়েমেনের বিষয়ে ইরানের হস্তক্ষেপের অভিযোগ আমরা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করছি। ইরানি মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, ইয়েমেনের ঐক্য ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার প্রয়োজনীয়তার ওপর ইরান সবসময় জোর দিয়ে এসেছে এবং জাতিসংঘ সমর্থিত রোডম্যাপের ভিত্তিতে ইয়েমেনিদের নেতৃত্বে সংলাপকে সমর্থন করেছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা