ইরান-হুতিদের হামলার চাপ, মিত্রদের সহায়তা অনিশ্চিত সৌদির

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইরান ও দেশটির মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে সৌদি আরব। ইয়েমেনের হুথিদের দ্রুত অগ্রগতি, ইরাক থেকে

2026-09-12T15:25:59+00:00
2026-09-12T15:26:28+00:00
 
  শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৮ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ইরান-হুতিদের হামলার চাপ, মিত্রদের সহায়তা অনিশ্চিত সৌদির
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:২৫ পিএম  আপডেট: ১২.০৯.২০২৬ ৩:২৬ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
ইরান ও দেশটির মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে সৌদি আরব। ইয়েমেনের হুথিদের দ্রুত অগ্রগতি, ইরাক থেকে ড্রোন হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের তৎপরতা— সব মিলিয়ে সৌদির জ্বালানি অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ একসঙ্গে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

বিশেষ করে বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছে হুথিদের সাম্প্রতিক সাফল্য সৌদি আরবের জন্য বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত দুই দিনে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর কাছ থেকে বন্দরনগরী মোখা ও লোহিত সাগরের একটি দ্বীপ দখল করেছে হুথিরা। এতে সৌদি আরবের জাহাজ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথ বাধাগ্রস্ত করার সক্ষমতা আরও বাড়ল।

একই সময়ে ইরাক থেকে পরিচালিত ড্রোন হামলার কারণে পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগরের পশ্চিমাঞ্চলে তেল পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইন বন্ধ করে দিয়েছে সৌদি আরব। আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের দাবি, ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের হামলার সঙ্গে হুথিদেরও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

জ্বালানি রপ্তানিতে বড় ধাক্কা
হুথিদের হামলার কারণে সৌদি আরবের এশিয়ায় তেল রপ্তানিতেও বড় প্রভাব পড়েছে। বাণিজ্য পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, জুনে সৌদি আরব থেকে এশিয়ায় প্রতিদিন প্রায় ৩৪ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি হলেও আগস্টে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ১ লাখ ২৮ হাজার ব্যারেলে। চলতি মাসে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে রপ্তানি প্রায় ৭ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে।

সৌদি আরবের জন্য পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে কারণ দেশটির গুরুত্বপূর্ণ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এখন মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক সামরিক সংকটে জড়িয়ে আছে। ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন সামরিক তৎপরতার কারণে ওয়াশিংটন ইয়েমেনে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালাতে আগ্রহী কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

সৌদি আরবের সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‍্যাটনি পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত হতাশাজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, ইরানের প্রতি তীব্র বিরোধিতা থাকলেও ইয়েমেনের এই যুদ্ধ সৌদি আরব কখনোই চায়নি। সংঘাত শুরু হওয়ার পর দেশটির আশঙ্কা করা প্রায় সব ধরনের পরিস্থিতিই এখন বাস্তবে পরিণত হচ্ছে।

সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া না গেলেও এক সৌদি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দেশটি আত্মরক্ষা করবে এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রসহ অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করবে।

বদলে যাচ্ছে সৌদির আঞ্চলিক পরিকল্পনা
সৌদি যুবরাজ ও কার্যত দেশটির শাসক মোহাম্মদ বিন সালমান গত কয়েক বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এক বাস্তবতা তৈরির চেষ্টা করছেন। সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে সৌদি আরবকে একটি বৈশ্বিক ব্যবসাকেন্দ্রে পরিণত করার পাশাপাশি স্থিতিশীল ও সমন্বিত মধ্যপ্রাচ্য গড়ে তোলাই ছিল তাঁর বড় লক্ষ্য।

কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক সংঘাত শুরু হলে সেই পরিকল্পনা বড় ধাক্কা খায়। পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালালে ইরান সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। একই সময়ে হরমুজ প্রণালির কার্যক্রমও কার্যত বাধাগ্রস্ত হয়, ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস রপ্তানি হুমকির মুখে পড়ে।

সৌদি আরব কয়েক বছর ধরে ইয়েমেন সংঘাত থেকে বেরিয়ে অর্থনৈতিক রূপান্তর ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু হুথিদের সাম্প্রতিক সাফল্য রিয়াদের ওপর আবারও সামরিক বা কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার চাপ বাড়িয়েছে।

সামরিক অভিযান নাকি কূটনীতি?
২০১৫ সাল থেকে সৌদি আরব হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। দীর্ঘ সংঘাতে প্রায় দেড় লাখ মানুষ নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন হিসাব রয়েছে। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও এখন আবার উত্তেজনা বাড়ছে।

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক নিল কুইলিয়ামের মতে, হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি সৌদি আরবকে জবাব দেওয়ার জন্য চাপের মধ্যে ফেলেছে। তবে রিয়াদের সামনে থাকা প্রতিটি বিকল্পের সঙ্গেই বড় ঝুঁকি রয়েছে।

সৌদি আরব চাইলে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান জোরদার করতে পারে। কিন্তু এতে যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হতে পারে এবং সৌদির তেল ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হুথিদের হামলা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ছাড়া হুথিদের অস্ত্র ও সক্ষমতাও আগের তুলনায় বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডির গবেষক শেরওয়ান হিন্দরিন আলি বলেন, আগের তুলনায় হুথিদের অস্ত্র অনেক বেশি উন্নত। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে সৌদি আরবের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার মজুতও কমে থাকতে পারে।

অন্য বিকল্প হলো হুথি কিংবা তাদের প্রধান মিত্র ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা। তবে হুথিরা সৌদি নেতৃত্বাধীন অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি করছে। আর ইরানের পক্ষ থেকেও বড় ধরনের মার্কিন ছাড় ছাড়া আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় আগ্রহ দেখানোর সম্ভাবনা কম।

যুক্তরাষ্ট্র কতটা পাশে থাকবে?
দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই নিরাপত্তা নিশ্চয়তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

২০১৯ সালে হুথিদের দাবি করা একটি হামলায় সৌদি আরবের তেল উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলেও যুক্তরাষ্ট্র তখন সরাসরি সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনও ইরানের সঙ্গে সংঘাতে ব্যাপকভাবে জড়িয়ে পড়েছে। হরমুজ প্রণালির আশপাশে মার্কিন বাহিনীর বড় উপস্থিতি রয়েছে। ফলে ইয়েমেনে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর মতো অতিরিক্ত সক্ষমতা ও রাজনৈতিক আগ্রহ যুক্তরাষ্ট্রের আছে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

এরই মধ্যে সংঘাতের কারণে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপর চাপ বেড়েছে এবং উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার মজুতও কমেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইয়েমেনে নতুন করে সামরিক চাপ বাড়ানোর বিষয়ে অনাগ্রহের ইঙ্গিত দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, নির্বাচন সামনে থাকায় হয়তো তিনি এমন পদক্ষেপ নেবেন না।

সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত র‍্যাটনির মতে, ধারাবাহিক মার্কিন সমর্থন ছাড়া সৌদি আরবের পক্ষে হুথিদের মোকাবিলায় নিজের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। তাঁর ভাষায়, হোয়াইট হাউস এখন ইয়েমেনের যুদ্ধে জড়াতে খুব একটা আগ্রহী নয়।

সময়ের আলো/কেএইচ
  বিষয়:   ইরান  সৌদি আরব  যুক্তরাষ্ট্র  হুতি 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: