হংকংয়ে একা থাকা র্যাচেল শিয়া এখন একাই খেতে যান, একাই সিনেমা দেখেন, এমনকি একাই ভ্রমণ করেন। ৩০ বছর বয়সী এই তরুণীর কাছে একা থাকার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো স্বাধীনতা। তাঁর প্রয়োজনের প্রায় সবকিছুই এখন একজন মানুষের কথা মাথায় রেখেই পাওয়া যায়—একজনের খাবার, একজনের বাজার, এমনকি একা ঘোরার জন্য সঙ্গীও ভাড়া করা যায়।
চীনের মতো এশিয়ার অনেক দেশে একা থাকার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। বিয়ে, সন্তান ও বাড়ির মালিকানাকে জীবনের সাফল্যের প্রচলিত মানদণ্ড হিসেবে দেখার প্রবণতা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে কমছে। বাড়ি ও সন্তানের শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা—সব মিলিয়ে একক জীবনযাপন বাড়ছে।
এর প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতেও। একা থাকা মানুষের বাড়তি ব্যয়কে ঘিরে গড়ে উঠছে নতুন এক বাজার, যাকে বলা হচ্ছে ‘একাকিত্বের অর্থনীতি’ বা ‘একক অর্থনীতি’। চীনে এই বাজারের আকার ইতিমধ্যে এক লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।
চীনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিসকভারি রিপোর্টসের হিসাবে, ২০২৫ সালে দেশটির একক মানুষের বাজারের আকার ১ লাখ কোটি ডলারের বেশি হয়েছে। ২০২৩ সালের তুলনায় যা প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি।
একজনের জন্য গোটা আয়োজন
একাই খাওয়া, একাই ভ্রমণ বা একাই বিনোদনের প্রবণতা এখন চীনে আর ব্যতিক্রম নয়। দেশটির বিভিন্ন শহরে ছোট ছোট কারাওকে কক্ষ তৈরি হয়েছে, যেখানে একজন মানুষ একাই গান গাইতে পারেন। পর্যটন এলাকায় একা ভ্রমণকারীদের জন্য পাওয়া যাচ্ছে হাঁটার সঙ্গী, ঘোরার সঙ্গী কিংবা ছবি তুলে দেওয়ার লোক।
চীনের ভোক্তা বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, একা থাকা মানুষজন নিজেদের জন্য তুলনামূলক বেশি খরচ করছেন। তাঁরা পোষা প্রাণী, সংগ্রহযোগ্য খেলনা, ভ্রমণ, বাইরে খাওয়া, শিক্ষা ও বিনোদনে অর্থ ব্যয় করছেন।
তাইওয়ানের ন্যাশনাল সান ইয়াত-সেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মিং-হুয়ান লি এশিয়ার একক ভোক্তাদের ব্যয়ের ধরন নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর মতে, একা থাকা মানুষের কিছু নির্দিষ্ট খরচ বেশি হলেও তাঁরা নিজেদের ওপর বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী।
তাঁর ভাষায়, সঙ্গী বা পরিবারের অন্য সদস্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ না থাকায় একক মানুষের নির্দিষ্ট খরচ বেশি। তবে তাঁরা ভ্রমণ, বাইরে খাওয়া, শিক্ষা ও অবসরের মতো ব্যক্তিগত আনন্দ ও উন্নয়নের খাতে বেশি ব্যয় করেন।
র্যাচেল শিয়ার জীবনেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। একা থাকার স্বাধীনতা তিনি উপভোগ করেন। নিজের সময়সূচি ও পছন্দ অনুযায়ী জীবন সাজাতে পারেন। তবে গত বছর তাঁর পোষা বিড়াল মারা যাওয়ার পর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন তিনি।
‘আমি কি সারা জীবন এভাবেই একা থাকতে চাই?’— এই প্রশ্ন তাকে ভাবিয়েছে।
নিঃসঙ্গতা নয়, স্বাধীনতার বাজার
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো একা থাকা মানুষকে ‘নিঃসঙ্গ’ হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে না। বরং স্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে সামনে রেখে তৈরি হচ্ছে নতুন পণ্য ও সেবা।
চীনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ড্যাক্সু কনসাল্টিংয়ের বিপণন পরিচালক অ্যালিসন মালমস্টেন বলেন, মানুষ নিজেকে নিঃসঙ্গ হিসেবে দেখতে চায় না। তারা নিজেদের সামাজিক ও পরিপূর্ণ জীবনযাপনকারী হিসেবেই দেখতে চায়। তাই ‘স্বাধীনতা’ ও ‘নিজস্বতা’র বার্তা তাদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য।
একই পরিবর্তন এখন চীনের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে একা খাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। একা মানুষের জন্য ছোট আকারের খাবারও বাজারে আসছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সঙ্গী এবং অতি স্বল্পদৈর্ঘ্যের নাটকও জনপ্রিয় হচ্ছে।
চীনের বাজার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান চোজানের প্রতিষ্ঠাতা অ্যাশলি দুদারেনকের মতে, কর্মস্থল থেকে রাতে বাড়ি ফেরার পর একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন হয়। আগে সেই জায়গায় স্বামী বা স্ত্রী থাকতেন। এখন সেখানে অনেক ক্ষেত্রে জায়গা করে নিচ্ছে খেলাধুলা, ভিডিও দেখা কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সঙ্গী।
তাঁর মতে, একা থাকা এখন আর বিয়ের আগের সাময়িক একটি ধাপ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি স্থায়ী জীবনধারায় পরিণত হচ্ছে এবং সেই অনুযায়ী অর্থনীতিও বদলে যাচ্ছে।
সন্তান কমছে, পোষা প্রাণী বাড়ছে
একক জীবনযাপনের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে পোষা প্রাণীর বাজারে। চীনের অনেক একা থাকা মানুষ এখন পোষা বিড়াল-কুকুরকে পরিবারের সদস্যের মতো দেখছেন। তাদের নিয়ে ভ্রমণ করছেন, এমনকি বিলাসী উপহারও কিনছেন।
বিপণন বিশ্লেষকদের হিসাবে, ২০১৭ সালে চীনে প্রতি দুটি শিশুর বিপরীতে একটি পোষা প্রাণী ছিল। ২০৩০ সালের মধ্যে চিত্রটি উল্টে যেতে পারে—শিশুর তুলনায় পোষা প্রাণীর সংখ্যা বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সাংহাইয়ের ৩৫ বছর বয়সী এলেন শিয়ের জীবনও এর উদাহরণ। তিনি নিজেকে ‘বিড়ালপ্রেমী একা নারী’ হিসেবে দেখেন। তাঁর প্রায় সব একা থাকা বন্ধুরই পোষা বিড়াল রয়েছে; একজনের কুকুরও আছে।
বন্ধুরা একসঙ্গে দেখা করলে রান্না না করে প্রত্যেকে নিজের খাবার অর্ডার করেন। এরপর আলোচনা করেন ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে। তাঁদের কেউ বিয়ে করতে চান, কেউ চান না। আপাতত নিজের দুই বিড়াল নিয়েই স্বচ্ছন্দ এলেন।
একাকী থাকার স্বাধীনতা তাঁকে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে ভ্রমণ করার সুযোগও দেয়। গত মে মাসে কোনো দীর্ঘ পরিকল্পনা ছাড়াই তিনি জাপান চলে গিয়েছিলেন।
তাঁর মতে, অবিবাহিত থাকার কারণে এমন কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করা সম্ভব হয়, যা বিয়ের পর হয়তো সহজে করা সম্ভব নয়।
একা থাকার পর শেষ বয়সে কী হবে?
তবে স্বাধীনতার এই জীবনের সঙ্গে ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু উদ্বেগও রয়েছে। বিশেষ করে বার্ধক্যে একা থাকার প্রশ্নটি ভাবাচ্ছে অনেককে।
চীনে আগামী কয়েক দশকে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়বে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের হিসাবে, ২০৩৫ সালের মধ্যে বয়স্কদের জন্য পণ্য ও সেবার বাজার—যাকে ‘বয়স্ক অর্থনীতি’ বলা হচ্ছে—৪ লাখ কোটি ডলারের বেশি হতে পারে।
প্রযুক্তিও এর সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে। একা থাকা মানুষের খোঁজ নেওয়ার জন্য তৈরি একটি মোবাইল অ্যাপ চলতি বছর ব্যাপক আলোচনায় আসে। অ্যাপটির নামই ছিল—‘তুমি কি মারা গেছ?’
চীনে একসময় একাধিক প্রজন্মের একসঙ্গে বসবাস ছিল খুবই সাধারণ। সন্তান নেওয়ার অন্যতম কারণ ছিল বৃদ্ধ বয়সে মা-বাবার দেখাশোনার নিশ্চয়তা। কিন্তু একক জীবনযাপনের বিস্তার সেই পুরোনো পারিবারিক কাঠামোকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
এলেন শিয়ে মনে করেন, ভবিষ্যতে তাঁর মতো বয়স্ক একা নারীদের জন্য একসঙ্গে থাকার নতুন ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে। একই পরিস্থিতিতে থাকা মানুষজন মিলে ‘সাময়িক পরিবার’ গড়ে তুলতে পারেন।
তার যুক্তি, চাহিদা তৈরি হলে ব্যবসাও সেখানে সুযোগ খুঁজবে।
শেনঝেনের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী ২৬ বছর বয়সী শিয়াও হানইউও ভবিষ্যতে একা বৃদ্ধ হওয়ার বিষয়ে কিছুটা উদ্বিগ্ন। তবে আধুনিক প্রযুক্তি ও একক মানুষের জন্য তৈরি নানা সেবা তাঁকে দীর্ঘ সময় অবিবাহিত থাকার সুযোগ করে দিয়েছে।
কম খরচে একা ভ্রমণের জন্য যুব হোস্টেল, একা সময় কাটানোর জন্য একক খেলাধুলা এবং গভীর রাতে মনের কথা বলার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহকারী— সব মিলিয়ে তার জীবনেও একক অর্থনীতির প্রভাব স্পষ্ট।
সূত্র : সিএনএন
সময়ের আলো/কেএইচ