লালনকন্যা ফরিদা পারভীন : অচিন পাখি উড়ে গেছে, রেখে গেছে সুর

কাউছার হুসাইন

আনন্দ সময়

‘সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন’— কণ্ঠে এই গান তুলে একদিন কুষ্টিয়ার দোলপূর্ণিমার আসরে দাঁড়িয়েছিলেন এক তরুণী। তিনি তখনও

2026-09-13T14:34:23+00:00
2026-09-13T14:39:56+00:00
 
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আনন্দ সময়
প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী
লালনকন্যা ফরিদা পারভীন : অচিন পাখি উড়ে গেছে, রেখে গেছে সুর
কাউছার হুসাইন
প্রকাশ: রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:৩৪ পিএম  আপডেট: ১৩.০৯.২০২৬ ২:৩৯ পিএম
প্রয়াত শিল্পী ফরিদা পারভীন। ছবি : সংগৃহীত
‘সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন’— কণ্ঠে এই গান তুলে একদিন কুষ্টিয়ার দোলপূর্ণিমার আসরে দাঁড়িয়েছিলেন এক তরুণী। তিনি তখনও জানতেন না, সেই একটি গানই বদলে দেবে তার পুরো জীবন। লালন ফকিরের গানের সঙ্গে তার যে পথচলা শুরু হয়েছিল, তা আর থামেনি। ধীরে ধীরে লালনের বাণী, দর্শন ও সুরের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন তিনি নিজেই। হয়ে উঠেছিলেন ‘লালনকন্যা’, ‘লালন সম্রাজ্ঞী’। আর তিনিই হলেন প্রয়াত শিল্পী ফরিদা পারভীন।

‘এই পদ্মা, এই মেঘনা’, ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’, ‘সময় গেলে সাধন হবে না’, ‘বাড়ির কাছে আরশীনগর’, ‘তোমরা ভুলেই গেছ মল্লিকাদির নাম’, ‘নিন্দার কাঁটা যদি না বিঁধিল গায়’— বাংলার মানুষের স্মৃতিতে মিশে থাকা অসংখ্য গানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার কণ্ঠ। লালনের গানকে তিনি শুধু গেয়ে যাননি, বয়ে নিয়ে গেছেন এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে, দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে।

আজ ১৩ সেপ্টেম্বর তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। এক বছর আগে এই দিনে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় থেমে যায় তার কণ্ঠ। দীর্ঘদিন কিডনি জটিলতায় ভোগার পর ২০২৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর রাত ১০টা ১৫ মিনিটে মারা যান ফরিদা পারভীন। বয়স হয়েছিল ৭১ বছর।

যে গান বদলে দিয়েছিল জীবন
১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোরের সিংড়া উপজেলার শাঔঁল গ্রামে জন্ম ফরিদা পারভীনের। বাবা দেলোয়ার হোসেন ছিলেন চিকিৎসক, মা রৌফা বেগম। বাবার চাকরির কারণে শৈশব ও শিক্ষাজীবনের বড় একটা সময় কেটেছে দেশের বিভিন্ন শহরে। মাগুরায় তার গানের হাতেখড়ি ওস্তাদ কমল চক্রবর্তীর কাছে। পরে কুষ্টিয়ার বিভিন্ন গুণী শিল্পীর কাছে শাস্ত্রীয় সংগীত শেখেন। নজরুলসংগীতেও নেন তালিম।

মাত্র ১৪ বছর বয়সে, ১৯৬৮ সালে, রাজশাহী বেতারের তালিকাভুক্ত নজরুলসংগীতশিল্পী হন ফরিদা পারভীন। তখন তার পরিচয় ছিল নজরুল ও আধুনিক গানের শিল্পী হিসেবে। কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে বড় বাঁকটি আসে স্বাধীনতার পর।

কুষ্টিয়ায় থাকার সময় পারিবারিক বন্ধু ও লালনসংগীতের সাধক মোকছেদ আলী সাঁইয়ের কাছে লালনের গান শেখার সুযোগ পান তিনি। শুরুতে অনীহা ছিল। বাবার অনুরোধে শর্ত দিয়ে গান শেখায় রাজি হন— ভালো না লাগলে গাইবেন না।

লালনের ‘সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন’— ১৯৭৩ সালে দোলপূর্ণিমার এক অনুষ্ঠানে গানটি গাইলেন। গান শেষ হওয়ার পর শ্রোতারা আরেকটি গান শোনার আবদার করলেন। ফরিদা পারভীন তখন জানালেন, তিনি একটি গানই শিখেছেন, সেটিই ভালোভাবে গেয়েছেন। আর সেই একটি গানই হয়ে উঠল তার নতুন পথের দিশা। পরে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, লালনের গানের ভেতরে শুধু সুর নেই; আছে গভীর আধ্যাত্মিকতা, মানবতাবোধ ও জীবনদর্শন। লালনের গান তাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করেছিল, যে একসময় অন্য কিছু ভাবতেই পারতেন না।

পরে মোকছেদ আলী সাঁইয়ের পর খোদা বক্স সাঁই, ব্রজেন দাস, বেহাল সাঁই, ইয়াছিন সাঁই ও করিম সাঁইয়ের কাছেও তালিম নেন তিনি। গুরুপরম্পরার সেই সাধনাই তাকে তৈরি করে দেয় অনন্য এক লালনশিল্পী হিসেবে।

‘মুখ থেকে নয়, ভেতর থেকে গাইতেন’
অগ্রজ সংগীতশিল্পী ফেরদৌসী রহমান একবার ফরিদা পারভীনকে স্মরণ করে বলেছিলেন, অন্যরা অনেক সময় গান গাইলে মনে হয় মুখ থেকে গান বের হচ্ছে; কিন্তু ফরিদার লালনের গান শুনলে মনে হতো, তিনি একেবারে ভেতর থেকে গাইছেন। প্রতিটি লাইনের অর্থ উপলব্ধি করে, হৃদয় দিয়ে গাইতেন তিনি। এই উপলব্ধিই সম্ভবত ফরিদার গানের সবচেয়ে বড় শক্তি।

তিনি লালনের গানকে কখনো শুধু পরিবেশনার বিষয় হিসেবে দেখেননি। তার কাছে এটি ছিল সাধনা। তাই লালনের গান পরিবেশনের ক্ষেত্রে অযথা চাকচিক্য কিংবা বাহুল্য পছন্দ করতেন না। তার বিশ্বাস ছিল, লালনের বাণীকে শালীনতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

বেসরকারি এক গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফরিদা পারভীন বলেছিলেন, প্রায় ছয় দশক ধরে লালনের গান চর্চা করেছেন তিনি। শুধু সিডি শুনে বা ইউটিউব দেখে লালনের গান শেখা তার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। গুরু ধরে, দীর্ঘদিন সাধনা করে, আত্মনিবেদনের মধ্য দিয়ে তিনি এই গানকে ধারণ করার চেষ্টা করেছেন।

লালনকে নিয়ে গেছেন বিশ্বমঞ্চে
ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে লালনের গান শুধু বাংলাদেশের মানুষের কাছেই জনপ্রিয় হয়নি। জাপান, সুইডেন, ডেনমার্ক, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তার কণ্ঠে বেজেছে লালনের দর্শন। ২০০১ সালে জাপানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে লালনের গান পরিচিত করে তুলেছিলেন তিনি। তার গানের প্রতি বিদেশি শ্রোতাদের আগ্রহও ছিল গভীর। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাকে সুফি শিল্পী হিসেবে পরিচিত করা হয়েছে।

লালনের গানকে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল বা গণ্ডির মধ্যে আটকে না রেখে নাগরিক সমাজ, উচ্চবিত্তের বসার ঘর এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছে দেওয়ার কৃতিত্বও ফরিদা পারভীনের। তার জীবনসঙ্গী ও প্রখ্যাত বাঁশিশিল্পী গাজী আবদুল হাকিম এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ফরিদার ত্যাগ ও সাধনার কারণেই লালনের গান বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে নতুনভাবে পৌঁছেছে।

পুরস্কার এসেছে, বদলায়নি জীবন
সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৮৭ সালে একুশে পদক পান ফরিদা পারভীন। ১৯৯৩ সালে ‘অন্ধ প্রেম’ চলচ্চিত্রে ‘নিন্দার কাঁটা’ গানটির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পীর স্বীকৃতি পান। ২০০৮ সালে লাভ করেন জাপানের ফুকুওয়াকা এশীয় সাংস্কৃতিক পুরস্কার। পেয়েছেন আরও বহু দেশি-বিদেশি সম্মাননা।

সহজ-সরল জীবনযাপন
ফেরদৌসী রহমানের ভাষায়, ফরিদার গান যেমন সহজ-সরল ও মিষ্টি ছিল, তার জীবনও ছিল তেমনই। গান আর ব্যক্তিজীবনের মধ্যে কোনো দূরত্ব ছিল না।
এই সরলতার আরেকটি দিক ছিল তার মানবিকতা। করোনার কঠিন সময়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। নিজের উপার্জনের বড় অংশ ব্যয় করতেন মানুষের জন্য। এতিমখানার শিশুদের দেখাশোনা করতেন। লালনের আখড়া থেকে কেউ এলে খালি হাতে ফিরতেন না। তার স্বামী গাজী আবদুল হাকিমের স্মৃতিতে, এই জায়গাতেও ফরিদা ছিলেন ‘সম্রাজ্ঞীর মতো’।

অচিন পাখি রেখে গেছে
ফরিদা পারভীনের আরেকটি বড় স্বপ্ন ছিল নতুন প্রজন্মকে সংগীতের সঙ্গে যুক্ত করা। প্রায় ১৭ বছর আগে গাজী আবদুল হাকিমকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকার তেজগাঁওয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘অচিন পাখি সংগীত একাডেমি’।

লোকগান, লালনসংগীত, নজরুলসংগীত, আধুনিক ও শাস্ত্রীয় সংগীতের পাশাপাশি সেখানে শেখানো হয় গিটার, তবলা ও ছবি আঁকা। তিন বছর বয়সী শিশু থেকে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা— বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থী এখানে তালিম নেন। প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী তার দেখানো পথে সংগীতচর্চা করছেন। তার মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব সামলাচ্ছেন গাজী আবদুল হাকিম। তিনি জানেন, ফরিদা পারভীনের শূন্যতা কোনো দিন পূরণ হওয়ার নয়। তবু তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে যাওয়াকেই দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছেন।

‘সত্য বল সুপথে চল’
জীবনের শেষ দিকেও ফরিদা পারভীনের কথায় বারবার ফিরে এসেছে আত্মশুদ্ধির প্রসঙ্গ। তার কাছে লালনের গান ছিল মানুষ হওয়ার শিক্ষা। দেশে নানা অস্থিরতা, বিভাজন কিংবা সংস্কৃতির ওপর আঘাতের প্রসঙ্গে তিনি বলতেন, পরিবর্তন শুরু করতে হবে নিজেকে দিয়ে। মানুষ যদি নিজেকে শুদ্ধ করতে না পারে, তাহলে সমাজের বিশৃঙ্খলাও থামবে না। লালনের সেই বাণী— ‘সত্য বল সুপথে চল’— তার কাছে শুধু একটি গান ছিল না। সেটিই যেন ছিল তার জীবনদর্শন।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে নিয়মিত ডায়ালাইসিসের জন্য হাসপাতালে যাওয়ার পর তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। একসময় তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়, পরে দেওয়া হয় লাইফ সাপোর্ট। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে ১৩ সেপ্টেম্বর রাতে চলে যান তিনি। কুষ্টিয়ার পৌর কবরস্থানে মা-বাবার কবরের পাশে তাঁকে শায়িত করা হয়— যে কুষ্টিয়া তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী ছিল, যে শহর তাকে লালনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল।

এক বছর হয়ে গেল ফরিদা পারভীন নেই। কিন্তু তাকে হারানোর অর্থ তার গানকে হারানো নয়। রেডিওতে বাজলে ‘তোমরা ভুলেই গেছ মল্লিকাদির নাম’, কোনো ভোরে ভেসে এলে ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’, কিংবা কোনো আসরে ‘সত্য বল সুপথে চল’ শুরু হলে মনে হয়— ফরিদা পারভীন বুঝি এখনো গাইছেন। হয়তো এটাই একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় বেঁচে থাকা।

মানুষ চলে যায়। কণ্ঠ থেমে যায়। কিন্তু কিছু গান মানুষের ভেতরে থেকে যায়। কিছু সুর প্রজন্ম পেরিয়ে নতুন কণ্ঠে জন্ম নেয়। কিছু শিল্পী তাদের গানের চেয়েও বড় হয়ে ওঠেন— একটি দর্শন, একটি সাধনা, একটি সময়ের প্রতিনিধি হয়ে। 

আজ তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে বলা যায়, ফরিদা পারভীনও তার গানের মধ্যেই বেঁচে আছেন। অচিন পাখি হয়ে তিনি উড়ে গেছেন ঠিকই, কিন্তু রেখে গেছেন এমন কিছু সুর, যা বাংলার মানুষের হৃদয়ে আরও বহুদিন ডানা মেলবে। আর যখনই কেউ গেয়ে উঠবে— ‘সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন’— তখনই হয়তো ফিরে আসবেন লালনকন্যা ফরিদা পারভীন। 


সময়ের আলো/কেএইচ
  বিষয়:   সময়ের আলো  ফরিদা পারভীন 


Advertisement
Loading...
Loading...
আনন্দ সময়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: