কানাডার একটি ভাড়া বাড়িতে বারবিকিউ করা নিয়ে ভাড়াটিয়ার সঙ্গে বিরোধের জেরে তাকে হয়রানি ও হেনস্থার অভিযোগ উঠেছে ভারতীয় বংশোদ্ভূত এক নারীর বিরুদ্ধে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে ওই নারীকে ভাড়াটিয়ার সঙ্গে তর্ক করতে, অনুমতি ছাড়াই তার বাসায় প্রবেশ করতে এবং একপর্যায়ে পাথর ছুড়তে দেখা যায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে পুলিশ ওই নারীকে গ্রেফতার করে।
সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কানাডার একটি ভাড়া বাড়িতে বারবিকিউ করা নিয়েই প্রথমে বাড়িওয়ালি ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত।
পরে গ্রিল থেকে খাবার ফেলে দেওয়া, ভাড়াটিয়ার বাসায় অনুমতি ছাড়া প্রবেশ, তালা পরিবর্তন এবং দরজা খুলে ফেলার মতো অভিযোগও সামনে আসে। শেষ পর্যন্ত পুলিশ বাড়িওয়ালিকে গ্রেপ্তার করে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ওই নারীর নাম রাজ তিওয়ানা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার সারেতে পুলিশের হাতে তাকে হাতকড়া পরা অবস্থায় দেখা গেছে। ভাড়াটিয়ার সঙ্গে তার বিরোধের বিভিন্ন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনায় আসে।
তথ্য যাচাইকারী ওয়েবসাইট বুম জানিয়েছে, তারা সারেতে পুলিশ সার্ভিসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। পুলিশ তাদের জানিয়েছে, একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে এখনো কোনো অভিযোগ অনুমোদন করা হয়নি এবং তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
‘তিওয়ানা ফার্ম সারভাইভার’ নামে একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে ঘটনাটির বেশ কিছু ভিডিও প্রকাশ করা হয়। ভিডিওগুলোতে মূলত ভাড়াটিয়ার বক্তব্য এবং তার বর্ণনায় ঘটনাগুলো তুলে ধরা হয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া ও হিন্দুস্তান টাইমসও বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
তবে হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোর সত্যতা তারা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
ভাড়াটিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, রাজ তিওয়ানা যে বাদামি দাগ দেখাচ্ছিলেন, সেগুলো আসলে মরিচা। ভাড়াটিয়া আরও দাবি করেন, ভাড়া পরিশোধকারী বাসিন্দা হিসেবে তার বন্ধুকে বাসায় ডেকে রাতের খাবার খাওয়ানোর অধিকার রয়েছে। এ বিষয় নিয়েই তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি আরও তীব্র হয়। সে সময় তার সঙ্গে থাকা এক বন্ধু পুরো ঘটনাটি ভিডিও করছিলেন।
অন্য একটি ভিডিওতে তিওয়ানাকে কাঠের একটি টুকরা ব্যবহার করে বারবিকিউয়ের গ্রিল থেকে খাবার ফেলে দিতে দেখা যায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ওই সময় তিনি বলেন, তার সম্পত্তিতে এভাবে রান্না করার অনুমতি তিনি দিতে পারেন না। একই সঙ্গে তিনি পুলিশ ডাকবেন বলেও হুমকি দেন।
পরে ভাড়াটিয়া ও তার বন্ধু খাবার সংগ্রহ করে সেখান থেকে চলে যান। তবে ভাড়াটিয়ার দাবি, বিরোধটি শুধু বারবিকিউ নিয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং এটি ছিল বাড়িওয়ালির সঙ্গে তার আরও বড় ধরনের বিরোধের একটি অংশ। এরপর তিনি তার ভাড়া বাসায় বারবার হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে আরও কয়েকটি ভিডিও প্রকাশ করেন।
একটি ভিডিওতে ভাড়া বাসার তালা পরিবর্তন করার দৃশ্য দেখা যায় বলে দাবি করা হয়েছে। আরেকটি ভিডিওতে চারজনকে বাসার ভেতরে প্রবেশ করতে দেখা যায়। ভাড়াটিয়া তাদের মুখোমুখি হলে তাদের একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘সে এখানে আছে।’ পরে তারা বাসা থেকে বের হয়ে যান।
অন্য একটি ভিডিওতে তিওয়ানাকে ভাড়াটিয়ার বাসায় ঢুকে তার দিকে একটি পাথর ছুড়ে মারতে দেখা যায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ভিডিওতে তাকে ভাড়াটিয়ার হাত ধাক্কা দিতেও দেখা যায়। সে সময় ভাড়াটিয়া ঘটনার ভিডিও ধারণ করছিলেন।
এছাড়া তিওয়ানাকে তার বন্ধুকে একটি বস্তু দিয়ে আঘাত করার চেষ্টা করতে দেখা যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভাড়াটিয়া আরও অভিযোগ করেছেন যে তিনি বাড়িতে না থাকার সময় তিওয়ানা তার বাসায় প্রবেশ করে তালা পরিবর্তন করেন। একপর্যায়ে ভাড়া বাসার প্রবেশের দরজাটিও পুরোপুরি খুলে ফেলা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ঘটনা ছড়িয়ে পড়ার আগেও বাড়িওয়ালি ও ভাড়াটিয়ার বিরোধের কারণে কয়েকবার পুলিশকে ওই বাড়িতে যেতে হয়েছিল।
সারেতে পুলিশ সার্ভিস বুমকে জানিয়েছে, চলমান বাড়িওয়ালি-ভাড়াটিয়া বিরোধের কারণে ওই বাড়িতে পুলিশকে বেশ কয়েকবার যেতে হয়েছে।
তবে পুলিশ জানিয়েছে, বিভিন্ন সময়ে বাড়িওয়ালি ও ভাড়াটিয়া—দুই পক্ষই সহায়তার জন্য পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। অর্থাৎ অভিযোগ শুধু এক পক্ষের কাছ থেকেই আসেনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন দাবিও পুলিশ প্রত্যাখ্যান করেছে যে, গরুর মাংস রান্নাকে কেন্দ্র করেই বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল কিংবা এর পেছনে কোনো ধর্মীয় বা আদর্শিক কারণ ছিল।
পুলিশ স্পষ্ট জানিয়েছে, ওই নারীকে গ্রেফতারের সঙ্গে গরুর মাংস, অন্য কোনো ধরনের মাংস, ধর্ম কিংবা কোনো আদর্শিক বিষয় জড়িত নয়।
গালফ নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভাড়াটিয়ার প্রকাশ করা পরের দিকের একটি ভিডিওতে তিওয়ানার বাড়িতে পুলিশকে যেতে দেখা যায়। পুলিশ তাকে ফোন ও চাবি সঙ্গে নিয়ে বাইরে আসতে বলে। একপর্যায়ে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে বলতে শোনা যায়, রাজ, এই মুহূর্তে আপনি গ্রেফতার।
এ সময় তিওয়ানাকে বিস্মিত হতে দেখা যায়। তিনি পুলিশকে তার মেয়ে ও আইনজীবীকে ফোন করার সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ করেন। এরপর পুলিশ তার হাতে হাতকড়া পরিয়ে তাকে পুলিশের গাড়িতে তুলে নেয়।
পুলিশ তখন তিওয়ানাকে জানায়, ভাড়াটিয়ার কিছু জিনিসপত্র এখনো ভাড়া বাসার ভেতরে রয়েছে। জবাবে তিওয়ানা বলেন, ভাড়াটিয়ারা চলে গেছে এবং সেখানে তাদের কোনো জিনিসপত্র নেই।
এরপর ভাড়াটিয়া পুলিশকে জানান, শার্ট ও জুতার বাক্সসহ তার কিছু জিনিস এখনো বাসার ভেতরে রয়েছে। পরে সারেতে পুলিশ সার্ভিস ওই নারীকে গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করে।
তবে পুলিশ জানায়, তার বিরুদ্ধে এখনো কোনো অভিযোগ অনুমোদন করা হয়নি।
গ্রেফতার হওয়া নারীর পরিচয়ও পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। তদন্ত এখনো চলছে বলে জানিয়েছে তারা। পুলিশ আরও জানায়, ভাড়াটিয়ারা ওই বাড়িতে এখন আর থাকেন না এবং দুই পক্ষের বিরোধ নিয়ে বর্তমানে পুলিশের কাছে আর কোনো ফোনও আসছে না।
পরে ভাড়াটিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের এ ঘটনায় জড়িত কোনো ব্যক্তিকে হুমকি দেওয়া বা ক্ষতি না করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, তার পেজটি মূলত মানুষকে ঘটনাটি সম্পর্কে সচেতন করার উদ্দেশ্যেই তৈরি করা হয়েছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ