প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টাঙ্গাইলে আগমন উপলক্ষ্যে টাঙ্গাইল পৌরসভার রাজস্ব খাত থেকে নেয়া ৬৩ লাখ টাকা একাধিক উন্নয়নমূলক কাজ হাতে নেয় পৌর কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ রয়েছে, এই উন্নয়নমূলক কাজগুলোর মধ্যে নিয়মবহির্ভূত ভাবে ঠিকাদার নির্বাচন করা এবং অধিকাংশ কাজ না করেই কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে পৌরসভার কর্মকর্তার ও ঠিকাদারদের যোগসাজশে অধিকাংশ টাকাই আত্মসাৎ করা হয়েছে।
পৌরসভা সূত্র জানায়, চলতি বছরের পহেলা বৈশাখ টাঙ্গাইলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে শহরের বিভিন্ন সড়কে রোড মার্কিং, রাস্তা মেরামত, পৌর উদ্যানের ইটের সলিংসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ হাতে নেয় পৌর কর্তৃপক্ষ।
এর মধ্যে জেলা সদর রোডের অ্যাডভোকেট বার সমিতি থেকে হেলিপ্যাড ও দেউলা কালিবাড়ী রোড কার্পেটিং করার জন্য ব্যয় ধরা হয় ১৫ লাখ ৬৫ হাজার ৪৪১ টাকা। এ কাজের কোনো প্রকার দরপত্র ছাড়াই কাগজে কলমে কাজ করেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনবি এন্টারপ্রাইজ। তবে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় দেউলা কালিবাড়ী রোডে কোনো কাজই করা হয়নি। এরপরও ঠিকাদার তুলে নিয়েছেন বিলের টাকা।
শহরের ক্লাব রোড থেকে স্টেডিয়াম রোডে নামে মাত্র কাজ করা হয়েছে। তবে, পৌর উদ্যানে ইটের সলিং করলেও, তারেক রহমান টাঙ্গাইল ত্যাগ করার পরপরই সেই ইটগুলো তুলে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই প্যাকেজে র্যাব অফিসের সামনে ও পার্ক বাজারে গেটে সিসি ঢালাই করার কথা থাকলেও, সেখানে পুরাতন রাস্তার উপর সামান্য বিটুমিন দিয়ে কার্পেটিং এবং রোড মার্কিং করা হয়েছে। আর এ চারটি কাজের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ২০ লাখ ৩২ হাজার ৯৯১ টাকা। এই কাজগুলো পায় মেসার্স রুপা এন্টারপ্রাইজ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
জেলা সদর রোড থেকে নিরা মোড় থেকে অ্যাডভোকেট বার সমিতির সামনে এবং ডেফোডিল মোড় থেকে জেলা সদর রোড, জেলা সদর রোড হতে শাহীন স্কুল পর্যন্ত রোড মার্কিং করার জন্য ৭ লাখ ৮ হাজার ১১৮ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয় মমিন অ্যান্ড জসিম এন্টারপ্রাইজ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে।
এর মধ্যে ডেফোডিল মোড় থেকে জেলা সদর রোড পর্যন্ত কোনো রোড মার্কিং করা হয়নি। তবে, সে সময় জেলা সদর রোড হতে শাহীন স্কুল পর্যন্ত রোড মার্কিং করা না হলেও গত আগস্ট মাসে ৫৬ মিটার সড়কে রোড মার্কিং করা হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
পৌরসভার নথিপত্র অনুযায়ী এসব কাজের পরিমাপ, বিল প্রস্তুত ও কাজ সম্পন্নের প্রত্যয়নপত্রে স্বাক্ষর করেছেন তৎকালীন টাঙ্গাইল পৌরসভার প্রশাসক সঞ্জয় কুমার মহন্ত, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহজাহান আলী, সহকারী প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম এবং উপসহকারী প্রকৌশলী শামীম আল মামুন। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন না করেই বিল উত্তোলন করা হয়েছে। এর আগেও এই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির বিষয়ে অভিযোগ উঠেছে।
চলতি বছরের ১৪ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টাঙ্গাইল সফরকে কেন্দ্র করে গত ৪ এপ্রিল টাঙ্গাইল পৌরসভার রাজস্ব খাত থেকে প্রায় ৬৩ লাখ টাকার একাধিক উন্নয়নমূলক কাজ হাতে নেয় পৌর কর্তৃপক্ষ। দরপত্র আহ্বানের মাত্র ১০ থেকে ১২ দিনের মধ্যেই অধিকাংশ কাজ শেষ হয়েছে উল্লেখ করে ফাইনাল বিল উত্তোলন করা হয়।
পৌরসভার নথিপত্র, ওয়ার্ক অর্ডার, বিল-ভাউচারে উঠে এসেছে নানা অসংগতির তথ্য। ঠিকাদার ও পৌরসভার কর্মকর্তাদের যোগসাজশে রাজস্ব খাতের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান তাদের উপর উঠা সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। স্থানীয়রা প্রধানমন্ত্রীর আগমনে টাঙ্গাইলে রাস্তা অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ হাতে নেয়া টাকা আত্মসাতে জড়িতের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পৌরসভার একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী জানান, টাঙ্গাইলে গত ১৪ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরকে কেন্দ্র করে গত ৪ এপ্রিল টাঙ্গাইল পৌরসভার রাজস্ব খাত থেকে প্রায় ৬৩ লাখ টাকার একাধিক উন্নয়নমূলক কাজ হাতে নেয় পৌর কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় প্রভাবশালীর এক বিএনপির নেতার অফিসে বসে এসব কাজের ঠিকাদার নির্ধারণ করা হয়। তিনটি উন্নয়নমূলক কাজের রাজস্ব খাত থেকে ৪৩ লক্ষ টাকা এবং শামসুল হক তরুণ সংস্কার ও রং, বিন্দুবাসিনী সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় এবং রাইফেলস ক্লাবের দেয়ালে রংসহ অন্যান্য কাজের জন্য বাবদ প্রায় ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইল পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম জানান, নিয়ম অনুযায়ী সকল কাজ সম্পন্ন করে ঠিকাদারদের বিল প্রদান করা হয়েছে। এতে কোনো অনিয়ম করা হয়নি।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইল পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমানের সাথে একাধিকবার মোবাইলে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
সময়ের আলো/আতা