২০২৯ সালের পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের আগেই ভারতের ক্ষমতাসীন জোটের অধীনে থাকা ২১টি রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউনিফর্ম সিভিল কোড (ইউসিসি) চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এ লক্ষ্য ঘোষণা করেছেন।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) মুম্বাইয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় অমিত শাহ বলেন, বিজেপি নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স বা এনডিএ শাসিত ২১টি রাজ্যেই ২০২৯ সালের মধ্যে ইউসিসি বাস্তবায়ন করা হবে বলে তিনি আশাবাদী।
ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির দীর্ঘদিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত রাজনৈতিক লক্ষ্য হলো অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করা। ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে অমিত শাহের এই ঘোষণা সেই উদ্যোগকে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নিয়ে এলো।
ইউসিসি কী?
ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা অভিন্ন দেওয়ানি বিধির মূল লক্ষ্য হলো ধর্ম ও সম্প্রদায়ভিত্তিক ব্যক্তিগত আইনগুলোর পরিবর্তে একটি অভিন্ন আইনি কাঠামো চালু করা।
বর্তমানে ভারতে ফৌজদারি আইনের ক্ষেত্রে একটি অভিন্ন আইন থাকলেও বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার ও দত্তক নেওয়ার মতো পারিবারিক বিষয়ের আইন ধর্মীয় সম্প্রদায় ও প্রচলিত রীতিনীতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
ইউসিসি চালু হলে এসব বিষয়ে ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্য একই ধরনের আইনি কাঠামো কার্যকর করার চেষ্টা করা হবে।
কেন বিতর্কিত ইউসিসি?
ইউসিসির সমর্থকেরা মনে করেন, অভিন্ন দেওয়ানি আইন আইনের চোখে সমতা নিশ্চিত করবে। বিশেষ করে বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ ও উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে নারীরা ধর্ম নির্বিশেষে সমান অধিকার পাবেন বলে তারা মনে করেন।
বিজেপি এই উদ্যোগকে মুসলিম নারীদের অধিকারসংক্রান্ত বিভিন্ন সংস্কারের সঙ্গেও যুক্ত করেছে। এর মধ্যে তাৎক্ষণিক তিন তালাক প্রথা বাতিলের বিষয়টি উল্লেখযোগ্য।
অমিত শাহ বলেন, তিন তালাক বাতিল করা হয়েছে, মুসলিম নারীদের সমান অধিকার দেওয়া হয়েছে।
তবে সমালোচকেরা, বিশেষ করে ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়ের বিভিন্ন অংশ, মনে করেন দেশজুড়ে অভিন্ন ব্যক্তিগত আইন চালু করা হলে সংবিধান-সুরক্ষিত ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতিতে হস্তক্ষেপ হতে পারে।
ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী হিন্দু হলেও দেশটিতে আনুমানিক ২২ কোটি মুসলিম বসবাস করেন। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশও ভারত।
এ কারণে ইউসিসি বাস্তবায়নের উদ্যোগে আইনের অভিন্নতা, নারীর সমঅধিকার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
বিজেপির দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক এজেন্ডা
অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কয়েক দশক ধরে বিজেপির অন্যতম প্রধান আদর্শিক অঙ্গীকার। এর পাশাপাশি অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণ এবং সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদের অধীনে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করাও দলটির দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল।
রোববারের সংবাদ সম্মেলনে অমিত শাহ নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ৩৭০ ও ৩৫এ অনুচ্ছেদ বাতিলের মাধ্যমে কাশ্মীরকে ভারতের সঙ্গে পুরোপুরি একীভূত করা হয়েছে। এছাড়া নকশালবাদ এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতির উদাহরণ হিসেবে ভারতের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, বিমান হামলা এবং অপারেশন সিন্দুরের কথাও উল্লেখ করেন অমিত শাহ।
অবৈধ অভিবাসন নিয়েও কঠোর বার্তা
সংবাদ সম্মেলনে অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত করে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার সরকারের অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেন অমিত শাহ।
তিনি বলেন, আমরা প্রতিটি অবৈধ অনুপ্রবেশকারীকে শনাক্ত করে একে একে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করছি।
মণিপুরে ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস বা এনআরসি কার্যক্রমে ১৯৫১ সালকে ভিত্তিবর্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে শাহ বলেন, রাজ্যের মিত্র ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। সিদ্ধান্ত হলে তা জানানো হবে।
তবে অনিবন্ধিত অভিবাসীদের কীভাবে শনাক্ত করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। তাঁর যুক্তি, পদ্ধতি প্রকাশ্যে জানানো হলে তা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে দুর্বল করতে পারে।
২০২৯ সালকে সামনে রেখে বড় পরিকল্পনা
অমিত শাহের ঘোষণা থেকে স্পষ্ট, ভারত সরকার শুধু একটি কেন্দ্রীয় আইন প্রণয়নের অপেক্ষায় না থেকে রাজ্য পর্যায়েও ইউসিসি বাস্তবায়নের উদ্যোগ এগিয়ে নিতে চায়।
ফলে ২০২৯ সালকে সামনে রেখে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ শাসিত ২১টি রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালুর পরিকল্পনা ভারতের রাজনীতিতে নতুন করে বড় বিতর্ক তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ধর্মীয় স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত আইন ও নারীর অধিকারের প্রশ্নে এই উদ্যোগের প্রভাব নিয়ে আলোচনা আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ