দোকানের মালিকানা নিয়ে বিরোধের জেরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে দুই হলের অন্তত ১০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় সাভারের একটি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অন্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছেন।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুর সাড়ে তিনটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চত্বর ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলসংলগ্ন এলাকায় এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দুই হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হয়।
যেভাবে বিরোধের শুরু
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল উদ্বোধনের পর হলসংলগ্ন এলাকায় বেশ কয়েকটি দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসব দোকানের মধ্যে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলের সামনে থাকা কয়েকটি দোকান নিয়েই বর্তমানে দুই হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছে।
২০১৭ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল উদ্বোধনের পর ওই এলাকায় তৎকালীন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা হল প্রশাসনের সঙ্গে যোগসাজশ করে অন্তত ১৫টি দোকান বরাদ্দ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দোকান বরাদ্দের ক্ষেত্রে এক থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগও তখন ওঠে।
এরপর ২০২৪ সালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হল উদ্বোধন করা হয়। নতুন হলটির সামনের অংশে আগে থেকেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের নামে বরাদ্দ থাকা কয়েকটি দোকান রয়েছে। হলের অবস্থানগত কারণে এসব দোকানের মালিকানা নিয়ে নজরুল হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আপত্তি তৈরি হয়।
শিক্ষার্থীদের দাবি, হলের সামনে থাকা চারটি দোকান তাদের হলের শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ দেওয়া উচিত। অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের শিক্ষার্থীরা আগে থেকে বরাদ্দ থাকা দোকানগুলোর মালিকানা ছাড়তে রাজি নন। এ নিয়ে কয়েকদিন ধরেই দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল।
তালা দেওয়ার পরিকল্পনা ঘিরে উত্তেজনা
একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী ও শিক্ষার্থীর ভাষ্য অনুযায়ী, রোববার রাতে কাজী নজরুল ইসলাম হলের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ হলের সামনে থাকা চারটি দোকানে তালা দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সোমবার দুপুরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের কয়েকজন শিক্ষার্থী রবীন্দ্র চত্বরে অবস্থান নেন।
এর কিছুক্ষণ পর কাজী নজরুল ইসলাম হলের একদল শিক্ষার্থী সেখানে এলে দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে কথা-কাটাকাটি ও ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। দুই হলের শিক্ষার্থীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় দোকানে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
সংঘর্ষে কয়েকজন শিক্ষার্থী মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত পান। তাঁদের মধ্যে একজন শিক্ষার্থী মাথায় গুরুতর আঘাত পান বলে জানা গেছে।
১০ জন চিকিৎসা নিয়েছেন
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় চিকিৎসাকেন্দ্রের উপ-প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা রিজওয়ানুর রহমান জানান, বিকেল পৌনে পাঁচটা পর্যন্ত ১০ জন আহত শিক্ষার্থী চিকিৎসা নিতে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় সাভারের একটি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বাকিদের বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের সমঝোতার চেষ্টা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, দোকানের মালিকানা নিয়ে দুই হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরোধের খবর পাওয়ার পর সকাল থেকেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুই হলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সহকারী প্রক্টর আবদুছ সাত্তার জয় বলেন, দোকানের মালিকানা নিয়ে দুই হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। খবর পাওয়ার পর প্রশাসন সমঝোতার উদ্যোগ নেয়। সকাল থেকে দুই হলের সঙ্গে পৃথক বৈঠকও হয়েছে। তবে শেষ বৈঠকে কাজী নজরুল ইসলাম হলের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। এর মধ্যেই দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, প্রথমে দোকানে ভাঙচুর এবং পরে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন আহত হন। একজন শিক্ষার্থী মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক জাকির হোসেন বলেন, আহত শিক্ষার্থীদের ইতোমধ্যে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। এরপর দুই হলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
তিনি বলেন, প্রশাসন চাইছে, শিক্ষার্থীরা যেন নিজ নিজ হলে ফিরে যায়। আলোচনা শেষে এ বিষয়ে একটি সিদ্ধান্তে যাওয়া সম্ভব হবে।
দোকানগুলোর মালিকানা নিয়ে বিরোধের স্থায়ী সমাধান কীভাবে হবে, তা নিয়ে এখন দুই হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছেন সংশ্লিষ্টরা।
সময়ের আলো/আতা