একজন গোলরক্ষক কখনো কখনো পুরো ম্যাচের গল্পটাই বদলে দিতে পারেন। ম্যানুয়েল ন্যয়ারের অসাধারণ পজিশনিং, থিবো কোর্তোয়ার অবিশ্বাস্য সেভ কিংবা এমিলিয়ানো মার্তিনেজের টাইব্রেকারে প্রতিপক্ষকে থামিয়ে দেওয়ার দক্ষতা। কঠিন মুহূর্তে একটি সেভ যেমন দলকে বাঁচাতে পারে, তেমনি একটি ভুল বদলে দিতে পারে ম্যাচের ফল। বাংলাদেশের গোলপোস্টেও তাই সঠিক মানুষটিকে বেছে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।সামনে ফিফা আসিয়ান কাপসহ গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সূচি।
গোলবারের নিচে দায়িত্ব পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের কোচ টমাস ডুলির হাতে রয়েছে বেশ কিছু নাম। মিতুল মারমা, আনিসুর রহমান জিকো, মেহেদি হাসান শ্রাবণ, সুজন হোসেনের সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সাইফ কেরাওয়ালা। প্রত্যেকেরই আলাদা শক্তির জায়গা আছে। ফলে ডুলির জন্য গোলরক্ষক বাছাইটা কেবল প্রথম পছন্দ ঠিক করার বিষয় নয়, দলের প্রয়োজনের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মানানসই গোলরক্ষক খুঁজে নেওয়ার পরীক্ষা।
বর্তমানে সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে আছেন মিতুল মারমা। কয়েক বছর ধরেই জাতীয় দলের গোলবার সামলানো এই গোলরক্ষকের পারফরম্যান্সে সাম্প্রতিক সময়ে উন্নতির ছাপ স্পষ্ট। ২০২৫ সালে ছয় ম্যাচে নয় গোল হজম করলেও ২০২৬ সালে তার পারফরম্যান্সে এসেছে ধারাবাহিকতা। সান ম্যারিনোর বিপক্ষে বাংলাদেশের ২-১ ব্যবধানের জয়ের ম্যাচে একটি গোল হজম করেছেন। ২০২৩ সালে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সাতটি সেভ এবং একটি পেনাল্টি ঠেকানোও তার সামর্থ্যরে বড় উদাহরণ। ক্লাব ফুটবলেও মিতুলের পরিসংখ্যান তাকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দিতে পারে। ঢাকা আবাহনীর হয়ে গত মৌসুমে ২১ ম্যাচে মাত্র আট গোল হজম করেছেন, ১৫ ম্যাচে রেখেছেন ক্লিনশিট। নিয়মিত ক্লাব ফুটবলের পাশাপাশি জাতীয় দলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স— দুদিক থেকেই মিতুলের পাল্লা অন্যদের চেয়ে ভারী।
কিন্তু মিতুলের সামনে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী অভিজ্ঞ আনিসুর রহমান জিকো। দীর্ঘদিন জাতীয় দলের প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক ছিলেন। বাংলাদেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচে ৪৪ গোল হজম করলেও আট ম্যাচে ক্লিনশিট রেখেছেন। ২০২৩ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে জিতেছেন গোল্ডেন গ্লাভস। চোট ও ফর্মের কারণে অনেক দিন জাতীয় দলের বাইরে থাকলেও আন্তর্জাতিক ম্যাচের চাপ সামলানোর অভিজ্ঞতায় জিকো এখনও বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। তা ছাড়া আরও আছেন মেহেদি হাসান শ্রাবণ ও সুজন হোসেন। শ্রাবণ বসুন্ধরা কিংসের হয়ে সীমিত সুযোগ পেলেও গত মৌসুমে লিগে দুই ম্যাচের একটিতে ক্লিনশিট রেখেছেন। সুজনের শক্তির জায়গা নিয়মিত ক্লাব ফুটবল। মোহামেডানের হয়ে গত মৌসুমে ১৩ লিগ ম্যাচে চারটি ক্লিনশিট রেখেছেন তিনি।
এদের মধ্যে ভিন্ন প্রোফাইল সাইফ কেরাওয়ালার। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী এই গোলরক্ষক এবার জাতীয় দলের ক্যাম্পে এসে অন্যদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন। ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতা তার বড় শক্তি। তবে শুধু শারীরিক গড়ন নয়, ট্রায়ালেও নিজের সামর্থ্যরে প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। আসিয়ান কাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সিটি ক্লাবের বিপক্ষে ম্যাচে লাফিয়ে উঠে দুর্দান্ত একটি সেভ করে সবার নজর কাড়েন। ট্রায়ালে গোলরক্ষকদের মধ্যে তার পারফরম্যান্সও ছিল সবচেয়ে ভালো। ফলে মিতুল ও শ্রাবণের সঙ্গে সাইফের নামটিও এখন সম্ভাব্য সেরা তিনে জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে।
সাইফ খেলেন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অ্যাথলেটিক ক্লাবের হয়ে। ক্লাবটি আঞ্চলিক শৌখিন ও আধা-পেশাদার পর্যায়ে খেললেও ইউএস ওপেন কাপের অফিসিয়াল ম্যাচে গোলপোস্ট সামলানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। উচ্চতার কারণে ক্রস, কর্নার কিংবা সেটপিসে উঁচু বল মোকাবিলায় বাড়তি সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে পজিশনিং, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, পায়ে বল খেলা এবং চাপের মুহূর্তে নিজেকে স্থির রাখার ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই পরীক্ষায় সাইফ কতটা প্রস্তুত, সেটি সময়ই বলে দেবে। তবে ট্রায়ালে তার পারফরম্যান্স ডুলিকে আশাবাদী করতেই পারে।
অন্যদিকে সুজন হোসেন গত মৌসুমে মোহামেডানের হয়ে প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফর্ম করতে পারেননি। ফলে তার বাদ পড়ার সম্ভাবনা দেখছেন অনেকে। জিকোও বসুন্ধরা কিংসে নিয়মিত সুযোগ না পাওয়ায় এবং গেম টাইমিংয়ের ঘাটতিতে আগের ছন্দে ফিরতে পারেননি। সবকিছু বিবেচনায় ফিফা আসিয়ান কাপের জন্য মিতুল, শ্রাবণ ও সাইফকে নিয়ে ইন্দোনেশিয়ায় যাওয়ার সম্ভাবনাই এখন সবচেয়ে বেশি।
ডুলির সামনে চার-পাঁচটি ভিন্ন সমীকরণ। মিতুলের হাতে বর্তমান ফর্ম ও ধারাবাহিকতা, জিকোর সঙ্গে আছে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, শ্রাবণকে ঘিরে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা, সুজনের রয়েছে নিয়মিত ক্লাব ফুটবল আর সাইফ নিয়ে এসেছেন নতুন বৈশিষ্ট্য ও ভিন্ন ফুটবল-পরিবেশের অভিজ্ঞতা।
ফলে সামনে ফিফা আসিয়ান কাপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে কাকে গোলবারের নিচে দাঁড় করাবেন সেটি এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, গোলপোস্টে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেড়েছে। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাই ডুলিকে এমন একজনকে বেছে নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে, যার ওপর সবচেয়ে বড় মুহূর্তে ভরসা করা যায়। শেষ পর্যন্ত গোলরক্ষকের নাম নয়, নিরাপদ হাতজোড়াই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে