মুবাসসিরা খানম রাথী, বয়স ৭ বছর। কারাগারেই জন্মগ্রহণ করেন, মায়ের সঙ্গে কারাগারেই বসবাস ছিল। বাহিরের জগৎ ও আত্মীয়-স্বজনদের দেখার সুযোগ হয়নি। কিন্তু সম্প্রতি হাইকোর্টের আদেশে খালাস পেয়ে মা কামরুন নাহার মনির সাথে এখন মুক্ত আকাশে কন্যা রাথী। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকালে কাশেমপুর কারাগার থেকে মায়ের সাথে কন্যা রাথীও মুক্ত আকাশে বের হয়ে আসেন। এসময় আরও ৭ জন আসামি মুক্তি লাভ করেন।
এ শিশুর কোনো অপরাধ না থাকলেও মায়ের অপরাধে তার সঙ্গে ফাঁসির সেলে কারাযাপন করে আসছিল। ফলে স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয় আলোচিত ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফীকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি (হাইকোর্টে খালাসপ্রাপ্ত) কামরুল নাহার মনির শিশুসন্তানের।
আলোচিত এ মামলার অন্যতম আসামি কামরুন নাহার মনিকে ২০১৯ সালের ১৬ই এপ্রিল গ্রেফতার করে পিবিআই। গ্রেফতারের সময় মনি তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিল। গ্রেফতারের পরদিন মনিকে আদালতে তুলে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। নুসরাত জাহান রাফীকে পুড়িয়ে হত্যার সময় ব্যবহৃত বোরকাগুলো যে দোকান থেকে কেনা হয়েছিল আসামি মনিকে নিয়ে ১৯শে এপ্রিল সে দোকানে অভিযান চালায় পিবিআই।
২০ এপ্রিল, শুক্রবার রাতে প্রসবব্যথা নিয়ে আসামি কামরুন নাহার মণি ফেনী জেলা কারাগার থেকে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়। রাত ১২.১০ মিনিটে স্বাভাবিক ডেলিভারির মাধ্যমে কন্যাসন্তান জন্ম দেয় মনি।
কারামুক্তির পর কামরুন নাহার মনি জানান, শিশু কন্যা রাথী কারাযাপন করায় একটি স্বাভাবিক জীবন যাপনের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়। ভবিষ্যতেও তার স্বাভাবিক জীবনযাপন নিয়ে শঙ্কা থেকে যায়।
নুসরাত জাহান রাফীকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ৭ বছর ইতোমধ্যে পার হয়েছে। বর্তমানে বিচারিক আদালতের রায়ের ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল শুনানির রায়ের প্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত ১০ আসামিকে খালাস প্রদান করেন।
এর আগে, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফীকে যৌন নিপীড়ন চেষ্টার দায়ে সোনাগাজী ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ দৌলাকে আটক করে পুলিশ। পরে ৬ এপ্রিল ওই মাদরাসার সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে অধ্যক্ষের সহযোগীরা রাফীর শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে তার শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যায়। ১০ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে রাফীর মৃত্যু হয়।
ঘটনাটি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশি গণমাধ্যমেও সমালোচনার ঝড় তোলে। ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত দৃষ্টান্ত মুলক শাস্তির দাবিতে রাস্তায় নেমে আসেন আন্দোলনকারীরা। ৬১ কার্যদিবসে গত বছরের ২৪ অক্টোবর ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ। এছাড়া প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা করে জরিমানাও করে আদালত।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন, সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ দৌলা, নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সোনাগাজীর পৌর কাউন্সিলার মাকসুদ আলম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, হাফেজ আব্দুল কাদের, আবছার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ওরফে তুহিন ওরফে শম্পা ওরফে চম্পা, আব্দুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, মোহাম্মদ শামীম, মাদরাসার তৎকালীন গভর্নিং বডির সহসভাপতি ও উপজেলা আ. লীগের সাবেক সভাপতি রুহুল আমিন।
সময়ের আলো/আতা