যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে কসোভোর সাবেক প্রেসিডেন্ট হাশিম থাচিকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত কসোভো স্পেশালিস্ট চেম্বার্স। হত্যা, নির্যাতন ও বেআইনি আটকের মতো অপরাধে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) কসোভো যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ রায় দেন। ৫৮ বছর বয়সী থাচি ১৯৯০-এর দশকে সার্বিয়ার কাছ থেকে কসোভোর স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধের সময় কসোভো লিবারেশন আর্মির (কেএলএ) শীর্ষ কমান্ডারদের একজন ছিলেন।
ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়েছে, সংঘাতের সময় কেএলএর সদস্যরা ৯৬ জন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সার্বীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতার অভিযোগে চিহ্নিত ব্যক্তিকে হত্যা করেছে। এসব হত্যাকাণ্ডের জন্য থাচিকে দায়ী করা হয়েছে। তবে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
রায় ঘোষণার সময় স্যুট ও টাই পরা থাচি নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সভাপতিত্বকারী বিচারক চার্লস স্মিথ তার সাজা পড়ে শোনান।
থাচির পাশাপাশি কেএলএর আরও তিন সাবেক জ্যেষ্ঠ কমান্ডারকেও বিভিন্ন অভিযোগে সাজা দেওয়া হয়েছে। জাকুপ ক্রাসনিকিকে ২৫ বছর, কাদরি ভেসেলিকে ১৮ বছর এবং রেক্সহেপ সেলিমিকে ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ভেসেলি ও সেলিমির সাজার মধ্যে হেফাজতে কাটানো সময়ও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। রায়ে চার আসামিকে আপিলের অধিকার দেওয়া হয়েছে।
তবে চারজনই মানবতাবিরোধী অপরাধের ছয়টি অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েছেন। বিচারকরা জানিয়েছেন, বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ও পদ্ধতিগত হামলার অংশ হিসেবে এসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল—এমন প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছেন কৌঁসুলিরা।
কসোভোতে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ
থাচির বিরুদ্ধে দেওয়া রায় কসোভোতে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করেছে। ১৯৯৮-৯৯ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে কেএলএ ও থাচির ভূমিকার কারণে অনেক কসোভো আলবেনীয় তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখেন।
কসোভোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী গ্লাউক কোনজুফকা রায়টিকে ‘ভয়াবহ ও কসোভোর জন্য ক্ষতিকর’ বলে মন্তব্য করেছেন। আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এদি রামা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্য হেগের একটি চিত্র প্রকাশ করেন, যেখানে আলবেনীয় ভাষায় ‘মারে’ শব্দটি লেখা ছিল। শব্দটির অর্থ ‘লজ্জা’ বা ‘অসম্মান’।
কসোভোর রাজধানী প্রিস্টিনায় হাজারো মানুষ বড় পর্দায় রায় ঘোষণার সরাসরি সম্প্রচার দেখেন। সাজা ঘোষণার পর অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং কেউ কেউ কেএলএ ও থাচির সমর্থনে স্লোগান দেন।
অন্যদিকে, সার্বিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইভিৎসা দাচিচ রায়কে প্রিস্টিনার জন্য একটি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্য, সার্বিয়া ও সার্বীয় জনগণ দীর্ঘদিন ধরে কেএলএর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করে আসছে, এই রায় তারই স্বীকৃতি।
১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি কেএলএর আত্মপ্রকাশ ঘটে। ১৯৯৭ ও ১৯৯৮ সালে সংগঠনটির সশস্ত্র তৎপরতা জোরদার হয়। এর জবাবে সার্বীয় বাহিনী বড় ধরনের পুলিশি ও সামরিক অভিযান চালায়। ১৯৯৯ সালে সংঘাত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়। ওই যুদ্ধে আনুমানিক ১৩ হাজার মানুষ নিহত হন এবং কয়েক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।
যুদ্ধের সময় থাচি কেএলএর রাজনৈতিক ও তথ্যবিষয়ক বিভাগের অন্যতম প্রধান ছিলেন। যুদ্ধ শেষে তিনি কসোভোর প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত তিনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
২০২০ সালের নভেম্বরে ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্ত হওয়ার পর তিনি প্রেসিডেন্ট পদ থেকে পদত্যাগ করেন। একই বছরের নভেম্বরে তাকে ও অন্য অভিযুক্ত কমান্ডারদের দ্য হেগে আটক করা হয়।
রায় নিয়ে ভিন্নমত
কসোভোর বালকান ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিং নেটওয়ার্কের পরিচালক জেটা জাররা আল জাজিরাকে বলেন, এই রায় কসোভোর আলবেনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মধ্যে আরও অবিচারের অনুভূতি তৈরি করেছে।
তার দাবি, সার্বীয় বাহিনীর সদস্যরা ১০ হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষ হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকলেও তাদের অধিকাংশকে জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি। অথচ কেএলএর চার সদস্যকে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
জাররা আরও বলেন, কসোভোর যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালকে অনেকে এমন একটি আদালত হিসেবে দেখেন, যেখানে কেবল একটি জাতিগোষ্ঠী— কসোভো আলবেনীয়দের— বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে। তার মতে, যুদ্ধের সব পক্ষের ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়া জরুরি।
এদিকে, আল জাজিরার প্রতিবেদক সোনিয়া গ্যালেগো বলেন, কসোভো বর্তমানে রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে রয়েছে। সরকারের স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরির পথে নতুন এই রায় আরও একটি বাধা তৈরি করতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সময়ের আলো/কেএইচ