বিশ্ব অর্থনীতিতে সম্পদ ও আয়ের বড় অংশ ক্রমেই সমাজের অতি ক্ষুদ্র একটি জনগোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। শীর্ষ ০.১ শতাংশ মানুষের সঙ্গে বাকি জনগোষ্ঠীর আয় ও সম্পদের ব্যবধান এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা শুধু অর্থনৈতিক বৈষম্যই বাড়াচ্ছে না, সামাজিক ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপরও প্রভাব ফেলছে। বিপুল সম্পদের মালিকানা বাড়তি ভোগের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি মানুষের মতামত গঠনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতাও তৈরি করছে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক কৌশিক বসু এ সতর্কতার কথা জানিয়েছেন। তার মতে, বিশ্বে বৈষম্য এখন অগ্রহণযোগ্য মাত্রায় পৌঁছেছে। অর্থনৈতিক ক্ষমতা যখন সমাজের অতি ক্ষুদ্র একটি অংশের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন তা একপর্যায়ে মানুষের ‘কণ্ঠস্বরের বৈষম্য’ তৈরি করতে পারে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘সৈয়দ হুমায়ুন কবীর স্মৃতি গবেষণা সম্মেলন ২০২৬’-এ মূল বক্তার বক্তব্যে এসব কথা বলেন কৌশিক বসু। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভার্চ্যুয়ালি সম্মেলনে যুক্ত হন কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সম্মানিত এই অধ্যাপক।
সম্পদ থেকে কণ্ঠস্বরের বৈষম্য
কৌশিক বসু বলেন, আগে অতি ধনী ব্যক্তিরা বেশি বাড়ি, গাড়ি, বিমান বা জাহাজ কিনতে পারতেন। বর্তমানে বিপুল সম্পদের মালিকেরা সংবাদপত্র, টেলিভিশন স্টেশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতো মানুষের মতামত গঠনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমগুলোর মালিকানাও অর্জন করতে পারেন। ফলে অর্থনৈতিক বৈষম্য শুধু আয় ও সম্পদের ব্যবধানেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, মানুষের কণ্ঠস্বরের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।
তার মতে, এই প্রবণতা গণতন্ত্রের জন্য নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ভারতের গ্রামপর্যায়ের কিছু গবেষণার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, স্থানীয় সভায় সাধারণ মানুষ নিজেদের সমস্যার কথা বললেও কোনো ক্ষমতাবান বা অতি ধনী ব্যক্তি উপস্থিত হলে অনেক সময় সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর স্তিমিত হয়ে যায়। বিশ্বপর্যায়েও যোগাযোগ ও মতপ্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমগুলোর ওপর অতি ধনীদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
শ্রমের ভাগ কমছে
বৈষম্যের এই চিত্রের সঙ্গে প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের বিষয়টিও যুক্ত করেছেন কৌশিক বসু। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের বিস্তারের ফলে প্রচলিত শ্রমের চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
কৌশিক বসুর বক্তব্য অনুযায়ী, জিডিপির তুলনামূলক বড় অংশ এখন মুনাফা, আয় ও মেধাস্বত্ব থেকে আসছে। বিপরীতে শ্রমিকদের কাছে যাওয়া অংশ কমছে। ফলে উৎপাদন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে, তা নতুন করে বিবেচনার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। কারণ দেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ শ্রমের মাধ্যমে আয় করে জীবিকা নির্বাহ করে। ফলে শ্রমের চাহিদা কমে গেলে বা প্রযুক্তি শ্রমের বিকল্প হয়ে উঠলে আয় ও কর্মসংস্থানের ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
উন্নয়নের সংজ্ঞা নিয়েও প্রশ্ন
বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি ‘সন্ধিক্ষণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন কৌশিক বসু। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংকট, মেরুকরণ, সংঘাত ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন একসঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। কী ঘটছে এবং এর পেছনে কী ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন কাজ করছে, তা বোঝার জন্য আরও গবেষণা ও গভীর চিন্তার প্রয়োজন।
তিনি বলেন, এখন সময় এসেছে উন্নয়ন বলতে আসলে কী বোঝায় এবং সমাজের সামনে কী ধরনের নীতিগত বিকল্প রয়েছে, তা নতুন করে ভাবার। শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, উন্নয়নের সুফল কারা পাচ্ছে এবং সমাজে সুযোগ ও সক্ষমতার বণ্টন কেমন, এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
সমাধানে জ্ঞান ও সামাজিক উদ্যোগ
শিল্পবিপ্লবের সময়ের উদাহরণ তুলে ধরে কৌশিক বসু বলেন, ১৭৫০ থেকে ১৮৫০ সালের শিল্পবিপ্লবের সময়ে নতুন জ্ঞান ও শক্তিশালী চিন্তার পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন ও নৈতিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। শিশুশ্রম বন্ধ এবং কর্মঘণ্টা কমানোর মতো দাবিও সেই সময়ের সামাজিক পরিবর্তনের অংশ ছিল।
বর্তমান সময়েও বৈষম্য, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও শ্রমবাজারের রূপান্তরের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জ্ঞান, নৈতিক চিন্তা, সামাজিক উদ্যোগ, গবেষণা ও সক্রিয়তাকে একই আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
‘ন্যায্যতা, সক্ষমতা ও জীবনকুশলতা’ শিরোনামে আয়োজিত সম্মেলনের এ পর্বে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান। বাঙলার পাঠশালা ফাউন্ডেশন ও সাজেদা ফাউন্ডেশন যৌথভাবে সম্মেলনের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাঙলার পাঠশালা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ জাভেদ চৌধুরী। সূচনা বক্তব্য দেন সাজেদা ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ফারুক সোবহান ও জ্যেষ্ঠ গবেষণা উপদেষ্টা সাজেদা আমিন।