জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয়ের পর্বত ও হিমবাহের স্থিতিশীলতা কমছে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে পানিচক্রও ক্রমেই অনিয়মিত হয়ে পড়ছে। কোথাও বাড়ছে খরা, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি— জাতিসংঘ ও একদল জলবায়ু বিজ্ঞানীর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
এএফপি বলছে, গত আগস্টে চীন-নেপাল সীমান্তে ভয়াবহ হিমবাহ ধসের ঘটনায় জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা ছিল বলে জানিয়েছে ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন (ডব্লিউডব্লিউএ)। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি কোনো একক চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনা ছিল না, বরং দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়ন, হিমবাহ, পারমাফ্রস্ট বা মাটির নিচে জমে থাকা বরফ গলে যাওয়া এবং ভূতাত্ত্বিক অস্থিতিশীলতার সমন্বিত ফল।
ডব্লিউডব্লিউএ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিমালয়ে তাপমাত্রা বাড়ার কারণে বরফ জমাট থাকার সীমা আরও ওপরে উঠে গেছে। ফলে পাহাড়ের গভীরে থাকা বরফ ও পারমাফ্রস্ট দীর্ঘ সময় ধরে গলন তাপমাত্রার সংস্পর্শে থাকছে। এতে পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে পড়ছে। গত ২৬ আগস্ট লাংটাং লিরুং পর্বতের একটি বিশাল অংশের পাথর ও হিমবাহ ভেঙে পড়ে। এর ফলে পানি, বরফ ও পাথরের বিশাল স্রোত নেমে গিয়ে নিচের জনপদ ও অবকাঠামো ধ্বংস করে।
নেদারল্যান্ডসের উট্রেখট বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্বত জলবিদ্যাবিদ ও গবেষণাটির সহলেখক ওয়াল্টার ইমারজেল বলেন, ওই অঞ্চলে হিমবাহ সরে যাওয়া ও পারমাফ্রস্টের অবনতির কারণে পাহাড়ের স্থিতিশীলতায় মৌলিক ও অপরিবর্তনীয় পরিবর্তন ঘটছে। বিজ্ঞানীদের মতে, ২০১৫ সালের ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পেও ওই পাহাড়ের ঢাল কিছুটা দুর্বল হয়ে থাকতে পারে। তবে সাম্প্রতিক ধসের ক্ষেত্রে ভূমিকম্পটির সুনির্দিষ্ট ভূমিকা কতটা ছিল, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
চলতি বছর স্থানীয়ভাবে রেকর্ড করা সবচেয়ে উষ্ণ মাস ছিল জুলাই ও আগস্ট। এ ছাড়া ২০২৫ সালের শেষ দিকে ভারী তুষারপাতের ফলে পরবর্তীতে গলিত পানির পরিমাণ বেড়ে যাওয়াও ধসের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
চীনের তিব্বত ও নেপালে ওই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৪৪৬ জনের মৃত্যু এবং অন্তত ৬ হাজার ৬৬৯ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে ১ হাজার ৪০৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। চীনে ৪৩ জনের মৃত্যু ও ৫১৯ জন নিখোঁজ থাকার কথা জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। নেপাল সরকার জানিয়েছে, ওই দুর্যোগের পর পুনর্গঠনে প্রায় ৪৭৮ কোটি ডলার ব্যয় হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে পানিচক্রেও পরিবর্তন : একই দিনে প্রকাশিত জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পৃথিবীর পানিচক্রও ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। কোথাও পানির ঘাটতি, আবার কোথাও অতিরিক্ত পানি— এই দুই চরম অবস্থার মধ্যে দোলাচল বাড়ছে। ডব্লিউএমওর স্টেট অব গ্লোবাল ওয়াটার রিসোর্সেস প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বের নদীগুলো গত তিন দশকের মধ্যে অন্যতম শুষ্ক অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছে। একই সময়ে পৃথিবীর সব অঞ্চলের হিমবাহের আকারও কমেছে।
আরও পড়ুন
ভূগর্ভ, নদী, হ্রদ, মাটি, উদ্ভিদ, বরফ ও তুষারে জমে থাকা মোট মিঠা পানির পরিমাণও টানা এক দশক ধরে কমছে। ডব্লিউএমও মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো বলেন, ভূগর্ভস্থ পানি ও হিমবাহের মতো ধীরে পরিবর্তিত পানির উৎসগুলো এতদিন পৃথিবীর ‘সঞ্চয়ী হিসাবের’ মতো কাজ করেছে। খরা বা শুষ্ক মৌসুমে এসব উৎস পানির সংকট সামাল দিতে সহায়তা করত। কিন্তু এখন সেই মজুদও দ্রুত কমে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনের হিসাবে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে হিমবাহগুলো সম্মিলিতভাবে প্রায় ১ হাজার ৪০০ গিগাটন পানি হারিয়েছে। এই পরিমাণ পানি দিয়ে প্রায় ৫৬ কোটি অলিম্পিক সুইমিং পুল ভরাট করা সম্ভব। ২০২৫ সালে পর্যবেক্ষণ করা বিশ্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভূগর্ভস্থ পানির কূপে পানির স্তর স্বাভাবিক মাত্রার বাইরে ছিল বলেও জানিয়েছে ডব্লিউএমও।
সামনে আরও খরা-বন্যার ঝুঁকি : ডব্লিউএমও জানিয়েছে, বর্তমান এল নিনো পরিস্থিতি এই অনিয়ম আরও বাড়াতে পারে। এল নিনো প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিস্থিতি, যা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বৃষ্টি ও বাতাসের ধরনকে প্রভাবিত করে।
ডব্লিউএমও মহাসচিব সতর্ক করে বলেছেন, শক্তিশালী এল নিনোর কারণে বিশ্বের কোনো কোনো অঞ্চলে খরার ঝুঁকি বাড়তে পারে, আবার অন্য অঞ্চলে বাড়তে পারে বন্যার আশঙ্কা। ২০২৫ সাল গত ৩৫ বছরের মধ্যে নদীগুলোর প্রবাহের দিক থেকে সবচেয়ে শুষ্ক তিনটি বছরের একটি ছিল। ওই বছর মাত্র ৩৬ শতাংশ নদী অববাহিকায় পানির প্রবাহ স্বাভাবিক ছিল। একই পরিমাণ এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে কম এবং ২১ শতাংশ এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি প্রবাহ দেখা গেছে।
ডব্লিউএমও বলেছে, পানিচক্রের পরিবর্তন বুঝতে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও আন্তঃসীমান্ত তথ্য বিনিময় জরুরি। কারণ একটি দেশের নদী বা হিমবাহের পরিবর্তনের প্রভাব অন্য দেশেও পড়তে পারে। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের সাম্প্রতিক বিপর্যয়কে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে সংস্থাটি বলেছে, এক দেশে হিমবাহজনিত দুর্যোগ অন্য দেশেও ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে