ইরান হুতিদের মাধ্যমে বাব আল-মান্দাব প্রণালীকে দীর্ঘমেয়াদে সামরিক প্রভাবের আওতায় নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে সতর্ক করেছেন ইয়েমেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল ইব্রাহিম হাইদান।
তিনি বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে সামুদ্রিক করিডরকে ‘সামরিকীকরণের’ যে মডেল ইরান তৈরি করেছে, সেটিই লোহিত সাগরে প্রয়োগের চেষ্টা করা হচ্ছে।
হাইদানের দাবি, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) বিশেষজ্ঞরা হুতিদের সক্ষমতা বাড়াতে সহযোগিতা করছেন। তারা দুর্গ, কমান্ড ও অপারেশন কক্ষ এবং ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও দূরনিয়ন্ত্রিত নৌযান তৈরির স্থাপনা নির্মাণে সহায়তা দিচ্ছেন।
আশরাক আল-আওসাতকে হাইদান বলেন, ‘বর্তমানে যে হুমকি রয়েছে, বিপদ শুধু সেখানেই সীমাবদ্ধ নয়; ভবিষ্যতের জন্য যা তৈরি করা হচ্ছে, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, কৌশলগত এলাকাগুলোতে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকলে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর একটি বাব আল-মান্দাবের ওপর ইরান উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেতে পারে। একই সঙ্গে চোরাচালান নেটওয়ার্ক ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর মাধ্যমে ইয়েমেনকে হর্ন অব আফ্রিকার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
বাব আল-মান্দেব ‘সামরিকীকরণের’ আশঙ্কা
হাইদান বলেন, ইয়েমেন একটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ। তাই দেশটিতে কোনো ঘটনা ঘটলে তার প্রভাব দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো বাব আল-মান্দেব এলাকায় ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা সামরিক অবকাঠামো।
তার দাবি, আইআরজিসির সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা হুতিদের সামরিক সক্ষমতা উন্নয়ন এবং বিভিন্ন অভিযান পরিচালনায় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছেন।
বাব আল-মান্দেব ও এর আশপাশের দ্বীপ, উপকূল এবং পার্বত্য এলাকায় সক্ষমতা, দুর্গ, ঘাঁটি, অপারেশন কক্ষ ও গুহা নির্মাণ করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। এসব স্থাপনায় ড্রোন ও দূরনিয়ন্ত্রিত নৌযান তৈরি এবং ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের কাজ হচ্ছে বলে জানান হাইদান।
তার মতে, হরমুজ প্রণালিতে ‘সামুদ্রিক করিডর সামরিকীকরণের’ যে অভিজ্ঞতা ইরানের রয়েছে, বাব আল-মান্দেবেও সেটি প্রয়োগের লক্ষ্য রয়েছে। এতে একটি উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক জলপথ ভবিষ্যতে প্রভাব ও চাপ প্রয়োগের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
মায়ুন দ্বীপ কি আরেক লারাক হতে পারে?
লোহিত সাগরের দ্বীপগুলো নিয়েও সতর্ক করেছেন হাইদান। তার মতে, হুতিরা আরও সময় পেলে উন্নত নজরদারি, ট্র্যাকিং ও জ্যামিং ব্যবস্থার সহায়তায় সেখানে ঘাঁটি, আশ্রয়স্থল ও সুরক্ষিত গুহা তৈরি করতে পারে।
বাব আল-মান্দাবের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা মায়ুন দ্বীপ ইরানের হরমুজ প্রণালির লারাক দ্বীপের মতো সামরিক ভূমিকা নিতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ ছাড়া জুকার ও হানিশ দ্বীপপুঞ্জ এবং লোহিত সাগরের উপকূল ও পার্বত্য এলাকাগুলোও হুতিরা প্রণালিতে তাদের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করতে পারলে একটি ‘সমন্বিত সামরিক ব্যবস্থার’ অংশ হয়ে উঠতে পারে বলে জানান তিনি।
লোহিত সাগর থেকে হর্ন অব আফ্রিকা
হাইদান বলেন, হুমকি শুধু বাব আল-মান্দাবেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রণালিটির ওপর হুতিদের নিয়ন্ত্রণ থাকলে আইআরজিসি ইয়েমেনকে লোহিত সাগর ও হর্ন অব আফ্রিকার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার সুযোগ পেতে পারে।
তার দাবি, চোরাচালান নেটওয়ার্ক ও সমুদ্রপথ ব্যবহার করে অস্ত্র, সরঞ্জাম ও সামরিক দক্ষতা স্থানান্তর করা হতে পারে। এর মাধ্যমে হুতিদের সামরিক ও লজিস্টিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি হর্ন অব আফ্রিকায় সক্রিয় সশস্ত্র ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যোগাযোগও বাড়তে পারে।
বিশেষ করে সোমালিয়ার আল-শাবাবের কথা উল্লেখ করে হাইদান বলেন, এসব গোষ্ঠীর সক্ষমতা হুতি ও আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
তার ভাষ্য, এ ধরনের সমন্বয় বাব আল-মান্দাবকে ‘বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরানের প্রভাব বিস্তারের ঘাঁটিতে’ পরিণত করতে পারে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়লে তেহরানকে কৌশলগত একটি হাতিয়ার দিতে পারে।
কোস্টগার্ডের জরুরি সহায়তা প্রয়োজন
হাইদান বলেন, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে এবং হারানো অঞ্চল পুনরুদ্ধার ও নিরাপদ করার চেষ্টা করছে।
হুতিদের অর্থায়ন ও সরবরাহের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে চোরাচালানের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
সীমিত সম্পদ নিয়েও ইয়েমেনের কোস্টগার্ড দায়িত্ব পালন করছে জানিয়ে হাইদান বলেন, তাদের মিত্র ও বন্ধুদেশগুলোর কাছ থেকে ‘জরুরি ও বিশেষায়িত সহায়তা’ প্রয়োজন।
এ সহায়তার মধ্যে সমুদ্রপথে নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ সক্ষমতা, ট্র্যাকিং ও মনিটরিং ব্যবস্থা, টহল নৌযান এবং আধুনিক সরঞ্জাম থাকা উচিত বলে জানান তিনি। চোরাচালান নেটওয়ার্ক শনাক্ত, তাদের গতিপথ অনুসরণ এবং চালান আটকে দিতে গোয়েন্দা সক্ষমতাও বাড়ানো প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
হাইদান বলেন, বাব আল-মান্দাব রক্ষা এবং চোরাচালান মোকাবিলা এখন আর শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। তার ভাষায়, ‘আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল ও বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা শুরু হয় রাষ্ট্র তার ভূখণ্ড ও জলসীমার ওপর সার্বভৌমত্ব প্রয়োগের মাধ্যমে।’
এডেন ও লাহজে নিরাপত্তা জোরদার
পশ্চিম উপকূলের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির পর বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ায় লাহজ প্রদেশ, অন্তর্বর্তী রাজধানী এডেন ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলে জানান হাইদান।
সামরিক ফ্রন্টলাইনের বাইরে সংকট ছড়িয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একই সঙ্গে বাস্তুচ্যুত বেসামরিকদের সুরক্ষা এবং নিরাপত্তা প্রস্তুতি বাড়ানোর কাজ করছে বলে জানান তিনি।
বাস্তুচ্যুত মানুষের চলাচলকে হুতিরা নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ফাঁক তৈরি, অনুপ্রবেশ বা অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করতে না পারে—এ বিষয়েও নজর রাখা হচ্ছে বলে জানান হাইদান।
যৌথ অপারেশন কক্ষ
হাইদান বলেন, প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি ‘যৌথ অপারেশন কক্ষের’ মাধ্যমে সমন্বয় করছে।
এই কক্ষের মাধ্যমে পরিস্থিতির সমন্বিত মূল্যায়ন, দায়িত্ব বণ্টন এবং মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার কাজ করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ এবং তথ্য বিনিময়ও বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে ফ্রন্টলাইন, সড়ক এবং যেসব এলাকা দিয়ে হুতিদের সদস্য বা সেল অনুপ্রবেশ কিংবা অস্ত্র ও বিস্ফোরক পরিবহন করতে পারে, সেসব এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
হাইদান বলেন, বাস্তুচ্যুতি মূলত একটি মানবিক বিষয়। তবে এর সুযোগ নিয়ে যাতে হুতিদের সদস্য বা সেল সরকারি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।
স্লিপার সেল ও চোরাচালানের ঝুঁকি
নিরাপত্তা বাহিনীর সামনে থাকা হুমকি সম্পর্কে জানতে চাইলে হাইদান অনুপ্রবেশের চেষ্টা এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের চলাচলকে ব্যবহার করে সদস্য বা তথ্য-উপাত্ত ও সরঞ্জাম পাচারের আশঙ্কার কথা বলেন।
তার মতে, স্লিপার সেল, চোরাচালান নেটওয়ার্ক ও সংঘবদ্ধ অপরাধও নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
এডেন ও লাহজে জোরদার করা নিরাপত্তাব্যবস্থা মূলত ‘প্রতিরোধমূলক ও আগাম সতর্কতামূলক’ বলে জানান তিনি। এর লক্ষ্য হলো ফ্রন্টলাইনে সামরিক চাপ যেন শহরগুলোতে ছড়িয়ে না পড়ে এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিও বজায় থাকে।
মোকা অভিযানকে ‘বাস্তব পরীক্ষা’ বললেন হাইদান
মোকায় সাম্প্রতিক ঘটনাকে নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রস্তুতি এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জরুরি পরিকল্পনার ‘সরাসরি ও বাস্তব পরীক্ষা’ হিসেবে উল্লেখ করেন হাইদান।
তিনি বলেন, শুরু থেকেই এসব পরিকল্পনায় সামরিক বাহিনীর অগ্রসর হওয়া ও পিছু হটা, ফ্রন্টলাইন পরিবর্তন, বাস্তুচ্যুতি বৃদ্ধি এবং ফ্রন্টলাইনের পেছনের প্রদেশগুলোর ওপর বাড়তে থাকা চাপের বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা হয়েছিল।
হাইদানের ভাষ্য, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা কোনো নির্দিষ্ট সামরিক ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত সাময়িক কাজ নয়; এটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘অবিচ্ছেদ্য ও স্থায়ী’ দায়িত্ব।
সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে ‘যোগসাজশের’ অভিযোগ
হাইদান আরও বলেন, হুতি, সন্ত্রাসী সংগঠন, চোরাচালান নেটওয়ার্ক ও সংঘবদ্ধ অপরাধী গোষ্ঠীগুলোকে আলাদা হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে না। তার দাবি, তাদের মধ্যে ‘যোগসাজশ’ রয়েছে।
তার মতে, বিস্তৃত যুদ্ধ, ফ্রন্টলাইনের পরিবর্তন এবং সেনা পুনর্বিন্যাসের সুযোগ নিয়ে এসব গোষ্ঠী নিরাপত্তার শূন্যতা তৈরি করতে পারে। সোমালিয়ার আল-শাবাবের সঙ্গে হুতিদের যোগাযোগের বিষয়টিও উল্লেখ করেন তিনি।
হাইদান বলেন, নিরাপত্তা সংস্থাগুলো হুতিদের হুমকি, সন্ত্রাসবাদ, সংঘবদ্ধ অপরাধ ও চোরাচালানকে আলাদা বিষয় হিসেবে না দেখে ‘একটি একক নিরাপত্তাব্যবস্থা’ হিসেবে বিবেচনা করছে।
এ কারণে সংবেদনশীল এলাকায় নিরাপত্তা প্রস্তুতি ও মোতায়েন বাড়ানো এবং প্রবেশপথ, সড়ক ও চোরাচালান রুটে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ