ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম নুসা তেঙ্গারা প্রদেশের লোম্বোক দ্বীপ। ‘হাজার মসজিদের দেশ’ নামে পরিচিত এই দ্বীপের নর্থ লোম্বোক রিজেন্সির বায়ান গ্রামে রয়েছে এক অনন্য ঐতিহাসিক স্থাপনা—বায়ান বিলেক মসজিদ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকা এই মসজিদকে লোম্বোক দ্বীপে ইসলামের প্রাথমিক বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে দেখা হয়।
ইতিহাসের সাক্ষী বায়ান বিলেক
ঐতিহাসিক গবেষকদের মতে, মসজিদটি ষোড়শ বা সপ্তদশ শতাব্দীতে নির্মিত। লোম্বোক দ্বীপে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে বায়ান অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় উঠে এসেছে।
তবে মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন, তা নিয়ে একাধিক মত রয়েছে। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, সুফি সাধক শায়খ গাউস আবদুর রাজ্জাক ষোড়শ শতাব্দীতে এর গোড়াপত্তন করেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন, সানান গিরি বা সানান কালিসাগার অনুসারী টিটি মাস পেংঘুলু এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। অন্য একটি বর্ণনায় সুফি সাধক সুলতান প্রাপেনের নামও পাওয়া যায়।
তবে এসব দাবির বাইরে মসজিদটি লোম্বোকের প্রাচীন ইসলামী ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে পরিচিত।
বাঁশের বুননে অনন্য স্থাপত্য
আকারে ছোট হলেও বায়ান বিলেক মসজিদের নির্মাণশৈলী বেশ স্বতন্ত্র। ৯ মিটার × ৯ মিটার আয়তনের বর্গাকার মসজিদটির মোট আয়তন ৮১ বর্গমিটার। বাহ্যিক কাঠামো দেখে আধুনিক মসজিদের বদলে ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ স্থাপনার কথাই মনে হতে পারে।
মসজিদের দেয়াল তৈরি করা হয়েছে বাঁশের বুনন দিয়ে। ছাদেও ব্যবহার করা হয়েছে বাঁশের চেরা অংশ। মেঝেতে নেই আধুনিক টাইলস বা সিমেন্টের ব্যবহার। মাটি ও রিডের মাদুর দিয়ে তৈরি করা হয়েছে মেঝের আবরণ। আর মসজিদের ভিত্তিতে ব্যবহার করা হয়েছে নদীর মসৃণ পাথর।
চারকোনা কাঠামোটি দাঁড়িয়ে আছে চারটি গোলাকার কাঁঠাল কাঠের প্রধান খামের ওপর। ভেতরে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী কাঠের ঢোল বা বেদুগ। মসজিদের ভেতরে শায়খ গাউস আবদুর রাজ্জাকের মাজার রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে বিশ্বাস করা হয়। মসজিদের বাইরে রয়েছে সেবায়েত ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের স্মৃতিবিজড়িত দুটি ছোট কুঁড়েঘর।
স্থাপত্যে মহাজাগতিক দর্শন
বায়ান বিলেক মসজিদের নির্মাণশৈলীতে স্থানীয় জীবনদর্শনের প্রভাবও দেখা যায়। উত্তর লোম্বোকের লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, মসজিদের মাথা, শরীর ও পা ঊর্ধ্ব, মধ্য ও নিম্ন জগতের মহাজাগতিক ভারসাম্যের প্রতীক।
এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে স্থানীয় ‘ওয়েতু তেলু’ জীবনদর্শন। এটি আলাদা কোনো ধর্ম নয়; বরং স্রষ্টা, মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার একটি ঐতিহ্যবাহী জীবনরীতি। স্থানীয় একটি ধারণায় বলা হয়, ‘আদাত ওয়াদাহ, আমাগা দিরি’—অর্থাৎ ঐতিহ্য হলো পাত্র, আর ধর্ম তার ভেতরের আত্মা।
বিশেষ দিনেই প্রাণ ফিরে পায়
বর্তমানে বায়ান বিলেক মসজিদে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা হয় না। তবে ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) ও হিজরি নববর্ষের মতো বিশেষ উপলক্ষে মসজিদ প্রাঙ্গণে ঐতিহ্যবাহী আয়োজন হয়।
এসব দিনে মসজিদে প্রবেশের ক্ষেত্রে স্থানীয় ‘সাসাক’ পোশাক পরার রীতি রয়েছে। অজুর কাজে মাটির পাত্র, পানি তোলার জন্য নারকেলের খোলস এবং বসার জন্য বেতের মাদুর ব্যবহার করা হয়। এসব উপকরণ মসজিদটির প্রাচীন সংস্কৃতি ও স্থানীয় জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীর সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়।
মাতরাম শহর থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে বায়ান গ্রামে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক মসজিদ। লোম্বোকের ইতিহাস, ইসলামি ঐতিহ্য ও স্থানীয় সংস্কৃতি জানতে আগ্রহী পর্যটকদের কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি দর্শনীয় স্থান।
সূত্র: লোম্বোক ডিসপ্যাচ ডটকম
সময়ের আলো/টিকে