হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধজনিত সংকট ও সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামোয় হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ সচল রাখতে বিকল্প পথ খুঁজছে রিয়াদ। এর অংশ হিসেবে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর থেকে তেল রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার পর ওমানের সোহর বন্দর ব্যবহার করে এশিয়ার ক্রেতাদের কাছে অপরিশোধিত তেল পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সৌদি আরবের তেল রপ্তানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন। প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন দিয়ে দেশটির পূর্বাঞ্চলের তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে নেওয়া হয়। ফলে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল পাঠানোর ক্ষেত্রে পাইপলাইনটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হিসেবে কাজ করে আসছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক হামলায় পাইপলাইনের তিনটি পাম্পিং স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্যাটেলাইট ছবি ও শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে। এর পর শুক্রবার থেকে পাইপলাইনটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুরোপুরি মেরামতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ইয়ানবু থেকে তেল রপ্তানি কমিয়ে সৌদি আরব পারস্য উপসাগরীয় দিক দিয়ে বিকল্প রুট ব্যবহারের চেষ্টা করছে। ওমানের সোহর বন্দরের কাছে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর বা ‘শিপ-টু-শিপ’ পদ্ধতিতে এশিয়ার শোধনাগারগুলোর কাছে অতিরিক্ত তেল পাঠানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে কিছু তেল পাঠানোর ক্ষেত্রে ‘ডার্ক শিপমেন্ট’ বা শনাক্তকরণ ব্যবস্থা সীমিত রেখে জাহাজ চলাচলের পথও ব্যবহার করা হচ্ছে বলে বাণিজ্যিক সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে। তবে হরমুজে জাহাজ চলাচল এখনো ব্যাপকভাবে কমে আছে। বুধবার মাত্র তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে, যেখানে আগের দিন সংখ্যা ছিল ১২ এবং ১০ দিনের গড় ছিল প্রায় ১৭টি।
সৌদি আরবের এই বিকল্প রপ্তানি ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহে তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কমাতে পারে বলে বাজারে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বৃহস্পতিবারও তেলের দাম প্রায় ১ শতাংশ কমেছে। রয়টার্সের হিসাবে, শুক্রবার সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৩ দশমিক ৭৭ ডলার এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ১০০ দশমিক ৮৮ ডলারে নেমে আসে।
তবে সংকট পুরোপুরি কাটেনি। সৌদির ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় প্রভাব পড়তে পারে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, পাইপলাইনটি স্বাভাবিক সময়ে দিনে প্রায় ৪ থেকে ৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহন করতে পারে, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশের সমান।
ফলে ইয়ানবু, সোহর ও হরমুজ—এই তিনটি রুটকে ঘিরে সৌদি আরবের বর্তমান তৎপরতা শুধু দেশটির তেল রপ্তানি সচল রাখার চেষ্টা নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের মধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার বিকল্প পথ তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সূত্র : আল-জাজিরা, রয়টার্স
সময়ের আলো/টিকে