গ্যাসের চাপ কম থাকায় দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া বা দীর্ঘ সময় অচল থাকার ঝুঁকি কমাতে গ্যাসের সুষম বণ্টন এবং এলাকাভিত্তিক সাপ্তাহিক রেশনিং ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছে পোশাক ও বস্ত্র খাতের চারটি শীর্ষ সংগঠন। এ বিষয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) কাছে যৌথভাবে আবেদন জানিয়েছে তারা।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ), বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) এবং বাংলাদেশ টেরি টাওয়েল অ্যান্ড লিনেন ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিটিএলএমইএ) যৌথ চিঠিতে এ দাবি জানিয়েছে। সংগঠনগুলোর সভাপতি ও শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা এতে স্বাক্ষর করেন।
চিঠিতে বলা হয়েছে, গ্যাস বণ্টনে বিদ্যমান বৈষম্যের কারণে দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলোতে প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রফতানি পণ্যের নির্ধারিত শিপমেন্ট সময়ের মধ্যে শেষ করা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম যৌথ আবেদনের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, প্রতিদিন অল্প চাপের গ্যাস দিয়ে কারখানা চালানোর তুলনায় নির্দিষ্ট এলাকায় পর্যায়ক্রমে পূর্ণ চাপের গ্যাস সরবরাহ করা হলে উৎপাদন কার্যক্রম অনেক বেশি কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।
তার ভাষ্য, জিটিসিএল যদি এলাকাভিত্তিক রেশনিং ব্যবস্থা চালু করে, তা হলে কারখানাগুলো আগেভাগে উৎপাদন পরিকল্পনা তৈরি করতে পারবে। এতে শ্রমিকদের কাজ ছাড়া বসিয়ে রেখে বেতন দেওয়ার পরিস্থিতিও কমবে।
তিতাসের আওতায় অধিকাংশ পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানা : শিল্প মালিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্পের অধিকাংশ কারখানাই তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির আওতাধীন এলাকায় অবস্থিত। সংগঠনগুলোর হিসাবে, দেশের মোট টেক্সটাইল ও পোশাক কারখানার প্রায় ৯৪ শতাংশ, অর্থাৎ আনুমানিক ৬ হাজার ৫০০টি কারখানা তিতাসের আওতাভুক্ত এলাকায় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ শ্রমিক, যা খাতটির মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৯২ শতাংশ। একই সঙ্গে দেশের পোশাক খাতের প্রায় ৫২ বিলিয়ন ডলারের বার্ষিক রফতানি আয়ের বড় অংশ এসব কারখানা থেকে আসে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্যাস সরবরাহের সাম্প্রতিক চিত্র তুলে ধরতে সংগঠনগুলো ২০২৬ সালের ৫ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাঁচ দিনের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। তাদের হিসাবে, শিল্প ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ খাতে দেশের অনুমোদিত মোট গ্যাস চাহিদার ৭৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ, অর্থাৎ দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৪৮৮ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) তিতাসের আওতাধীন এলাকায় প্রয়োজন হয়। এর বিপরীতে তিতাসের দৈনিক বরাদ্দ ৯৮০ এমএমসিএফডি হলেও ওই পাঁচ দিনে গড়ে সরবরাহ হয়েছে ৮৮৩ দশমিক ২০ এমএমসিএফডি। ফলে ওই সময়ে তিতাস এলাকায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯৬ দশমিক ৮০ এমএমসিএফডি গ্যাসের ঘাটতি ছিল বলে দাবি করেছে সংগঠনগুলো।
অন্যদিকে, দেশের অন্যান্য কয়েকটি অঞ্চলে বরাদ্দের তুলনায় তুলনামূলক বেশি গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, তিতাস ছাড়া অন্য পাঁচটি আঞ্চলিক গ্যাস বিতরণ কোম্পানি মিলিয়ে দৈনিক ৩৭৩ দশমিক ৬০ এমএমসিএফডি গ্যাস পেয়েছে, যা তাদের আনুপাতিক বরাদ্দের তুলনায় ৭০ দশমিক ৩৭ এমএমসিএফডি বেশি।
পাঁচ দিন পূর্ণ চাপ, দুদিন সীমিত সরবরাহ : গ্যাস সংকট মোকাবিলায় শিল্পাঞ্চলগুলোকে কয়েকটি নির্দিষ্ট জোনে ভাগ করে পর্যায়ক্রমে গ্যাস সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের সংগঠনগুলো। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি জোনে সপ্তাহের টানা পাঁচ দিন পূর্ণ চাপ ও পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্যাস সরবরাহ করা যেতে পারে। এরপর দুদিন ওই এলাকায় সংযোগ বন্ধ রাখা অথবা সীমিত চাপে গ্যাস দেওয়ার মাধ্যমে পরবর্তী জোনে সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করা হবে।
তবে রেশনিংয়ের সময়সূচি তৈরির ক্ষেত্রে শিল্পের ধরন ও কারখানার কার্যক্রম বিবেচনায় নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠনগুলো। বিশেষ করে কন্টিনিউয়াস প্রসেস প্লান্ট, বয়লার পরিচালনা, রফতানি পণ্য জাহাজীকরণের নির্ধারিত সময়, শ্রম আইন এবং কারখানার নিরাপত্তা বিধিমালা বিবেচনায় রেখে সরবরাহ সূচি তৈরির কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া যেসব বিতরণ এলাকায় বরাদ্দের তুলনায় অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, সেখান থেকে গ্যাসের একটি অংশ তিতাস এলাকায় পুনর্বণ্টনের দাবিও জানিয়েছে সংগঠনগুলো। তাদের মতে, এতে শিল্প-কারখানার যন্ত্রপাতি নিরাপদে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
শিল্প উৎপাদনের ক্ষতি কমিয়ে রফতানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে দ্রুত এলাকাভিত্তিক সাপ্তাহিক গ্যাস রেশনিং চালুর ওপর জোর দিয়েছে চার সংগঠন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে