নেপালে বিধ্বস্ত বাড়ির সামনে এক নারী বাসিন্দা। ছবি : কাঠমান্ডু পোস্টনেপালের রাসুয়া জেলার লাংটাং লিরুং পর্বতে ভয়াবহ ধস নামার অনেক আগে থেকেই বিপর্যয়ের মঞ্চ তৈরি হচ্ছিল। দিন, সপ্তাহ, মাস এমনকি বছর ধরে বাড়তে থাকা তাপমাত্রা পর্বতের বরফ ও শিলাস্তরকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে তুলছিল। একপর্যায়ে প্রায় দুই বর্গকিলোমিটার হিমবাহের বরফ ও শিলার বিশাল অংশ ভেঙে উপত্যকায় নেমে আসে। তৈরি হয় ভয়াবহ ধ্বংসাবশেষের স্রোত। এতে ১ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষ নিহত এবং আরও প্রায় ৫ হাজার নিখোঁজ হন।
আন্তর্জাতিক গবেষকদের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, এই বিপর্যয়ের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের গবেষণায় দেখা গেছে, হিমালয়ের ওই অঞ্চলে প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণায়ন পর্বতের ঢালকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছিল।
উষ্ণতার কারণে শিলার ফাটল ধরে রাখার মতো জমাট পারমাফ্রস্ট গলেছে। একই সঙ্গে হিমবাহের বরফ পাতলা হয়ে পিছু হটেছে। যে উচ্চতায় আগে তুষারপাত হতো, সেখানে পড়েছে বৃষ্টি। বৃষ্টি ও গলিত বরফের পানি শিলার গভীর ফাটলে ঢুকে সেগুলোকে আরও পিচ্ছিল করে তোলে। সব মিলিয়ে দুর্বল ভূতাত্ত্বিক কাঠামোটি ধসের জন্য আরও প্রস্তুত হয়ে ওঠে।
নেদারল্যান্ডসের ইউট্রেখট বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্বত জলবিদ্যাবিদ ও গবেষণার সহলেখক ওয়াল্টার ইমারজিল বলেন, ঢালটি আগে থেকেই ভূতাত্ত্বিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কিন্তু হিমবাহের পশ্চাদপসরণ, পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়া, অতিরিক্ত বরফগলা পানি এবং অস্বাভাবিক উষ্ণতা সেটিকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে।
গবেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে মানবসৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ। রাসুয়ার ঘটনা তাই শুধু একটি পাহাড়ধস নয়; দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীতে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে একের পর এক বিপর্যয় তৈরির বড় সতর্কবার্তাও।
ক্লাইমেট সেন্ট্রালের জলবায়ু বিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু পারশিং বিষয়টিকে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলের দাবানলের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি প্রতিটি ঘটনা ঘটাচ্ছে— এমন নয়; বরং পরিবেশকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে বড় ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
রাসুয়ার ঘটনায় নেপালের বন্যা সতর্কীকরণ ব্যবস্থাও ধ্বংসাবশেষের স্রোতের গতি ও ব্যাপকতার সঙ্গে পেরে ওঠেনি। গবেষকদের মতে, এ ধরনের বিপর্যয় অনেক সময় মানুষের অভিযোজন সক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে যায়। তাই শুধু আগাম সতর্কতা নয়, ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনে আন্তর্জাতিক সহায়তাকেও জলবায়ু মোকাবিলার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
এই বাস্তবতার ভিত্তিতেই ক্ষয়ক্ষতির অর্থ চেয়েছে নেপাল। দেশটির অর্থ ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় গত ৩১ আগস্ট জাতিসংঘের ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’-এর কাছে ২ কোটি ডলার চেয়েছে। রাসুয়া দুর্যোগ থেকে পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনে নেপালের প্রয়োজন আনুমানিক ৪৮০ কোটি ডলার— যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১১ শতাংশেরও বেশি। তহবিল থেকে একটি দেশ সর্বোচ্চ যে পরিমাণ অর্থ চাইতে পারে, নেপাল সেই পরিমাণই চেয়েছে।
নেপাল এই অর্থকে সাধারণ সহায়তা হিসেবে দেখছে না; বরং জলবায়ু ন্যায্যতার দাবি হিসেবে তুলে ধরছে। কারণ বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান বছরে ০.১ শতাংশেরও কম। অথচ উষ্ণ পৃথিবীর অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিমালয়ের দেশটি নিয়মিতই এর প্রভাব মোকাবিলা করছে।
ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ডিজাস্টার স্টাডিজের পরিচালক বসন্ত রাজ অধিকারীর ভাষায়, জলবায়ু পরিবর্তনে নেপালের অবদান সামান্য হলেও এর ক্ষতির ভার দেশটিকেই বহন করতে হচ্ছে। তাই অভিযোজন ও প্রশমন কার্যক্রমে অর্থায়ন প্রয়োজন।
পুনর্গঠনের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ বিপর্যয় ঠেকাতে অস্থিতিশীল পাহাড়ি ঢাল ও হিমবাহ শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের নতুন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় নেপাল। দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় আন্তর্জাতিক তহবিলের অর্থ খুবই কম। ২০২২ সাল থেকে ধনী দেশগুলো জাতিসংঘের লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডে ৮২ কোটি ২০ লাখ ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর বিপরীতে ১১৯টি দেশ এখন পর্যন্ত প্রায় ২৮০ কোটি ডলার সহায়তা চেয়েছে।
রাসুয়ার মতো দুর্যোগে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা নির্ধারণও সহজ নয়। ভূতাত্ত্বিক দুর্বলতা, ২০১৫ সালের গোরখা ভূমিকম্পের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, হিমবাহের পরিবর্তন এবং উষ্ণতা— সবকিছুই একসঙ্গে কাজ করতে পারে। প্রয়োজনীয় ভূগর্ভস্থ তাপমাত্রা ও শিলার ফাটলে পানির চাপের মতো তথ্যও গবেষকদের হাতে নেই। ফলে ধসের কতটা অংশ সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘটেছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।
তবু একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে— হিমালয়ের জলবায়ু বদলে যাচ্ছে। আর তার প্রভাব শুধু নেপালেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। হিমালয়ের নিচের অববাহিকায় বসবাসকারী ২০০ কোটির বেশি মানুষও এর ঝুঁকিতে রয়েছে।
অধিকারীর সতর্কবার্তা তাই শুধু নেপালের জন্য নয়, গোটা উচ্চ পার্বত্য এশিয়ার জন্য— উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড় আরও অস্থিতিশীল হচ্ছে, আর দুর্যোগের ঝুঁকিও ক্রমেই বাড়ছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও