একসময় উত্তরাঞ্চলে পোলট্রি খাতের পথপ্রদর্শক ছিল জয়পুরহাটের জামালগঞ্জ সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামার। এটি জেলার একমাত্র সরকারি মুরগির খামার। এখানেই উদ্ভাবিত হয়েছিল বহুল জনপ্রিয় সোনালি জাতের মুরগি। সেই সোনালি মুরগিকে কেন্দ্র করে জয়পুরহাটসহ উত্তরাঞ্চলে গড়ে ওঠে শত শত বাণিজ্যিক খামার। সৃষ্টি হয় লাখো মানুষের কর্মসংস্থান। দেশের পোলট্রি শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা প্রায় নয় দশকের পুরোনো এই সরকারি প্রতিষ্ঠানটি এখন জরাজীর্ণ অবকাঠামো ও জনবল–সংকটে অনেকটাই রুগ্ন হয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খামারের কয়েকটি শেডের ছাদের কংক্রিট খসে রড বেরিয়ে এসেছে। কোথাও ছাদ ধসে পড়া ঠেকাতে বাঁশের খুঁটি দিয়ে ঠেকনা দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে সীমানাপ্রাচীর ভেঙে গেছে। আগাছায় ঢেকে গেছে খামারের একাংশ।
খামার সূত্রে জানা গেছে, ১২টি শেডের মধ্যে চারটির ছাদ নষ্ট হয়ে দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। এসব শেডে বর্তমানে কোনো মুরগি পালন করা হয় না। ফলে মাত্র আটটি শেডে কার্যক্রম চলছে। এতে উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি কার্যক্রম পরিচালনাও ব্যাহত হচ্ছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৩৭ সালে ব্রিটিশ আমলে ৩০ বিঘা জমির ওপর ‘সরকারি হাঁস-মুরগির খামার’ নামে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠে। পরে হাঁস পালন বন্ধ হলে এর নাম পরিবর্তন করে ‘জামালগঞ্জ সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামার’ রাখা হয়। ২০০৮ সালে এখানে আধুনিক হ্যাচারি স্থাপন করা হয়। খামারে ২০ হাজার বাচ্চা ও দুই হাজার লেয়ার মুরগি লালন-পালনের লক্ষমাত্রা রয়েছে। অথচ এখন দুই হাজার বাচ্চা ও এক হাজার ৮০০ লেয়ার মুরগি লালন-পালন করা হচ্ছে। এখানে বছরে দুই লাখ একদিন বয়সী বাচ্চা উৎপাদন করে দেশের বিভিন্ন জেলার খামারিদের কাছে সরবরাহ করা হয়।
দেশের পোলট্রি শিল্পে খামারটির সবচেয়ে বড় অবদান সোনালি জাতের মুরগির উদ্ভাবন। ২০০০ সালের পর খামারের তৎকালীন সহকারী পরিচালক মো. শাহ জামালের নেতৃত্বে নতুন এই জাতের মুরগির উন্নয়ন শুরু হয়। প্রথমে শাহাপুর গ্রামের ১০টি খামারে পরীক্ষামূলকভাবে সোনালি মুরগি পালন করা হয়। দেশি মুরগির মতো স্বাদ ও আকর্ষণীয় রঙের কারণে অল্প সময়েই এটি সারাদেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
২০১০ সালের পর সোনালি মুরগিকে কেন্দ্র করে জয়পুরহাট, বগুড়া, নওগাঁসহ আশপাশের জেলায় গড়ে ওঠে বৃহৎ পোলট্রি শিল্প। বর্তমানে জয়পুরহাট অঞ্চলে রয়েছে ১১টি পোলট্রি ফিড মিল ও ৬৩টি হ্যাচারি। একসময় এ অঞ্চল থেকে প্রতিদিন প্রায় তিন লাখ একদিন বয়সী বাচ্চা উৎপাদিত হত। বছরে প্রায় দুই লাখ মেট্রিক টন মুরগির মাংস ও প্রায় ৪০ কোটি ডিম উৎপাদিত হত।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে এ অঞ্চলের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। স্থানীয় খামারি ও প্রাণিসম্পদ খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, দেশের পোলট্রি শিল্পে ঐতিহাসিক অবদান রাখা এই সরকারি খামারটি দ্রুত সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন। তাদের মতে, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও জনবল নিশ্চিত করা গেলে জামালগঞ্জ সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামার আবারও দেশের পোলট্রি খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
খামারি আরিফ ইফতেখার আহম্মেদ রানা বলেন, জামালগঞ্জ সরকারি মুরগি প্রজনন খামার একসময় আমাদের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিল। এখান থেকে উন্নত মানের বাচ্চা ও কারিগরি পরামর্শ পেতাম। এখন অবকাঠামোর বেহাল অবস্থার কারণে আগের মতো সুবিধা পাওয়া যায় না। দ্রুত সংস্কার করা হলে খামারিরা আবারও উপকৃত হবেন।
সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামারের উপপরিচালক ডা. মো. ওয়ালী-উল-ইসলাম বলেন, চারটি শেড দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত থাকায় উৎপাদন সক্ষমতা কমেছে। খামারে অনুমোদিত ২০ টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন সাত জন। বর্তমানে শেডে কাজ করার মতো কোন শ্রমিক নেই। অবকাঠামো ও জনবল দুই সংকট নিয়েই কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। জরাজীর্ণ শেড সংস্কার এবং জনবল নিয়োগের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার চাহিদা পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেলে সংস্কারকাজ শুরু করা হবে।
সময়ের আলো/এনএন