বগুড়ার কাহালুতে গড়ে উঠছে দেশের প্রথম কমিউনিটি ভিত্তিক এগ্রো ট্যুরিজম প্রকল্প ‘সুখের খামার এগ্রো লিমিটেড’।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) ত্রয়োদশ এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ার-২০২৬-এর মঞ্চে এক জমকালো আয়োজনে এর পরিকল্পিত নকশা উন্মোচন করা হয়। একই অনুষ্ঠানে প্রকল্পের সঙ্গে থাকা দেড় শতাধিক অংশীদারের হাতে জমির সাফ কবলা দলিলও তুলে দেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কণ্ঠশিল্পী ও সংগীত পরিচালক মিলন মাহমুদ। আরও উপস্থিত ছিলেন সুখের খামার এগ্রো লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. তাসদীখ হাবীব ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জোবায়ের ইসলাম। এছাড়া দেশ ও প্রবাস থেকে আসা অংশীদার, পর্যটন খাতের উদ্যোক্তা ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
সুখের খামারের উন্মোচিত এই নকশায় রয়েছে ১০০ রুমের এগ্রো রিসোর্টে রেস্টুরেন্ট, কনভেনশন হল, সুইমিং পুল, বোটিং সুবিধাসহ নানান সুবিধা। রিসোর্টের পাশেই একই আঙিনায় থাকছে সমন্বিত কৃষি খামার, ৪০০ গরুর খামার, বটম ক্লিন পদ্ধতির মাছের খামার, ছাগল ও দুম্বার খামারসহ ১ মেগাওয়াট উৎপাদনের সৌর বিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস প্লান্ট এবং একটি জামে মসজিদ ও হাফিজিয়া এতিমখানা মাদ্রাসা।
প্রকল্পের মাটি ভরাট ও সড়ক নির্মাণ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে; আগামী অক্টোবর থেকে পুরোদমে এটির নির্মাণকাজ শুরু হচ্ছে বলে আয়োজকরা জানান।
প্রকল্পটি পরিচালিত হচ্ছে শরীয়াহভিত্তিক মুশারাকা মডেলে। ইতোমধ্যে ২১টি দেশ ও ৪২টি জেলার এক হাজারের বেশি মানুষ প্রকল্পটির অংশীদার হয়েছেন এবং প্রত্যেক অংশীদারের নামে জমি রেজিস্ট্রেশন করে ২৫ জুলাই ফাউন্ডার নাইট নামের এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই দলিল হস্তান্তর করা হয়। শুক্রবার অনুষ্ঠানে নতুন করে আরো দেড় শতাধিক অংশীদার তাঁদের দলিল বুঝে পান।
অনুষ্ঠানে চেয়ারম্যান মো. তাসদীখ হাবীব বলেন, "বাংলাদেশের কৃষি খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা ন্যায্য দাম না পাওয়া। এগ্রো টুরিজম সেই সমস্যার একটি সমাধান। কারণ এখানে কৃষক শুধু ফসল বিক্রি করেন না, অভিজ্ঞতাও বিক্রি করেন। স্মার্ট কৃষিই হবে বাংলাদেশের পরবর্তী বিপ্লব আর সুখের খামার তার একটি বাস্তব উদাহরণ।"
ব্যবস্থাপনা পরিচালক জোবায়ের ইসলাম বলেন, "এক বছর আগে আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, আজ তার প্রমাণ দিচ্ছি। আমাদের খামারে ইতোমধ্যে দুই হাজারের বেশি অতিথি ঘুরে গেছেন। এটাতে এক গ্রামে এক কোটি টাকার নতুন অর্থনীতি তৈরি হয়েছে। আমরা মাটি থেকে শুধু ফসল নয়, ভবিষ্যৎ ফলাতে চাই। আজকের এই নকশা সেই ভবিষ্যতেরই প্রতিচ্ছবি।”
এগ্রো টুরিজম বা কৃষি পর্যটন হলো এমন পর্যটন, যেখানে দর্শনার্থীরা খামারে থাকেন, ফসল তোলা বা পশুপালনে অংশ নেন এবং গ্রামীণ জীবন অভিজ্ঞতা হিসেবে উপভোগ করেন। ইতালি, জাপান, থাইল্যান্ড ও ভারতের কেরালায় এটি এখন প্রতিষ্ঠিত শিল্প।
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান IMARC Group-এর হিসাবে বৈশ্বিক এগ্রো টুরিজম বাজারের আকার ২০২৫ সালে ছিল ৮১ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা বছরে প্রায় ১১ শতাংশ হারে বেড়ে ২০৩৪ সালে ২০৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।
ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড টুরিজম কাউন্সিলের (WTTC) হিসাবে বাংলাদেশের জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ২০২৩ সালে ছিল প্রায় ১ লাখ ২ হাজার কোটি টাকা।
প্রতিবেশী ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে জিডিপিতে পর্যটনের অবদান ৫ থেকে ৬ শতাংশ, যেখানে বাংলাদেশে তা এখনো অনেক কম। সরকার এই অবদান ৬ থেকে ৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
কৃষিনির্ভর ও গ্রামপ্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ৬৪ জেলার প্রতিটিতেই এগ্রো টুরিজমের সম্ভাবনা রয়েছে, যা একই সঙ্গে কৃষকের আয়, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং জিডিপিতে পর্যটনের অবদান বাড়াতে পারে।
সুখের খামার এগ্রো ভিলেজ ইতোমধ্যে বাগইল গ্রামে ৪১ জনের সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি করেছে, ১০ জন নারী উদ্যোক্তাকে স্বাবলম্বী করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য, ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের আটটি বিভাগে আটটি সুখের খামার এগ্রো ভিলেজ গড়ে তোলা।
সুখের খামার এগ্রো ভিলেজ বাংলাদেশের প্রথম কমিউনিটি ভিত্তিক এগ্রো টুরিজম প্রজেক্ট। এখানে সাধারণ মানুষ শেয়ারের মাধ্যমে জমিসহ প্রকল্পের মালিক হন, প্রকল্পের ১৫টি উৎস থেকে অর্জিত প্রকৃত লাভের অংশ পান এবং প্রতি বছর পরিবারসহ রিসোর্টে বিনামূল্যে থাকার সুযোগ পান এবং উৎপাদিত প্রতিটি পণ্য সাশ্রয় মূল্যে মধ্যে কেনার সুযোগ পান।
নিবন্ধিত কোম্পানি ‘সুখের খামার এগ্রো লিমিটেড’ প্রকল্পটি পরিচালনা করে। প্রকল্পটির অবস্থান বগুড়ার কাহালু উপজেলার পাইকড় ইউনিয়নের বাগইল গ্রামে। পোস্ট অফিস আড়োলা। বগুড়া শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার, আর ঢাকা থেকে সড়কপথে যেতে সময় লাগে প্রায় ৪ ঘণ্টা।
‘এগ্রো ট্যুরিজম’ শব্দটি Agriculture ও Tourism—এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। এর মূল ধারণা হলো, গ্রাম ও খামারকেই পর্যটনের গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা।
এ ধরনের পর্যটনে শহরের মানুষ খামারে এসে অবস্থান করেন, ফসল তোলার অভিজ্ঞতা নেন, গরুর দুধ দোহানোর প্রক্রিয়া দেখেন এবং গ্রামীণ খাবার উপভোগ করেন। এসব অভিজ্ঞতার বিনিময়ে তারা অর্থ ব্যয় করেন। এর ফলে কৃষকের আয়ের নতুন উৎস তৈরি হয়, গ্রামের তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ে এবং কৃষি একটি সম্মানজনক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
বাংলাদেশে এগ্রো ট্যুরিজম বিষয়ে প্রথম পূর্ণাঙ্গ বই ‘এগ্রো ট্যুরিজম: গ্রামই গন্তব্য’ লিখেছেন জোবায়ের ইসলাম ও তাসদীখ হাবীব।
সময়ের আলো/জেডি