দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে নাজুক অবস্থায় রয়েছে। খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর মূলধন, তারল্য ও ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা চাপে পড়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি পৃথক ও স্বাধীন তদারকি সংস্থা গঠন, পরিচালনা পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা বাড়ানো এবং ব্যাংকিং আইন সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।
শনিবার রাজধানীর পুরানা পল্টনে ‘ব্যাংকিং খাতের আর্থিক অবস্থা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি। ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরাম (সিএমজেএফ) ও সিএফও সোসাইটি বাংলাদেশ যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।
মাহবুবুর রহমান বলেন, অনেক ব্যাংকেরই বর্তমানে নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে গেছে। মূলধন পর্যাপ্ততা দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। তার মতে, খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে পুনঃতফসিল করা ঋণের প্রকৃত ঝুঁকি সামনে এলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
তিনি বলেন, ২০০৮ সালে দেশে খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে তা ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
পৃথক তদারকি সংস্থার প্রস্তাব : ব্যাংক খাতের তদারকি ব্যবস্থায় আমূল সংস্কারের প্রয়োজন উল্লেখ করে মাহবুবুর রহমান যুক্তরাজ্যের মডেলের আদলে ‘প্রুডেনশিয়াল রেগুলেশন অথরিটি’ ও ‘ফাইন্যান্সিয়াল কনডাক্ট অথরিটি’র মতো পৃথক ও স্বাধীন সংস্থা গঠনের প্রস্তাব দেন।
তিনি বলেন, একটি কাঠামোর মাধ্যমে ৫০-৬০টি ব্যাংকের কার্যক্রম গভীরভাবে তদারকি করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য কঠিন। পাশাপাশি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে অন্তত ৫০ শতাংশ স্বতন্ত্র পরিচালক রাখার প্রস্তাব দেন তিনি। কোনো শেয়ারধারক পরিচালককে ক্রেডিট কমিটিতে না রাখার কথাও বলেন।
এ ছাড়া দেউলিয়া আইন ও সম্পত্তি হস্তান্তর আইন আধুনিকায়ন এবং খেলাপি ঋণকে লেনদেনযোগ্য আর্থিক সম্পদে রূপান্তরের ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সরকারি সিকিউরিটিতে ঝুঁকছে ব্যাংক : মাহবুবুর রহমান বলেন, অনেক ব্যাংকের ঋণ ও অগ্রিম কমলেও সরকারি সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ বেড়েছে। এতে স্বল্পমেয়াদে মুনাফা বাড়লেও ব্যাংকের মূল ব্যবসা— ঋণ বিতরণ ও আমানত সংগ্রহ দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
নিট সুদ আয় কমে যাওয়া ব্যাংকিং খাতের জন্য উদ্বেগের সংকেত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক হিসাবমান অনুসরণ করতে গিয়ে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বাড়তে পারে।
একীভূতকরণে কাঙ্ক্ষিত সুফল নিয়ে প্রশ্ন : পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শক্তিশালী ব্যাংকের সঙ্গে অন্য ব্যাংকের একীভূতকরণে প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক সমন্বয় থেকে সুফল পাওয়া যেতে পারে। তবে একাধিক দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে— এমন নিশ্চয়তা নেই।
তার মতে, একীভূতকরণের পরও যদি একই ধরনের শাখা, জনবল ও পরিচালন কাঠামো বহাল থাকে, তা হলে ব্যয় কমানোর উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।
সুশাসনই মূল শর্ত : ব্যাংকিং খাতের সংকটকে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা না দেখে ‘সিস্টেমিক ইস্যু’ হিসেবে দেখার আহ্বান জানান মাহবুবুর রহমান। শুধু মূলধন দিলেই দুর্বল ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রথমে প্রকৃত ক্ষতি নিরূপণ, সম্পদের মান যাচাই ও যথাযথ প্রভিশন নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাবের মাধ্যমে ব্যাংক পরিচালনা এবং অনিয়ম বন্ধ করা না গেলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না। প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সভায় নর্থ স্টার ইনভেস্টমেন্টসের চেয়ারম্যান মিনহাজ জিয়া বলেন, দেশের সঞ্চয়ের বড় অংশ ব্যাংক খাতে থাকায় ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের অস্থিরতার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়তে পারে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডআই