দেশে সাশ্রয়ী মূল্যে স্মার্টফোন উৎপাদন শুরু হয়েছে। চার থেকে পাঁচ হাজার টাকায় স্মার্টফোন পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। শনিবার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ‘ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন ২.০’ শীর্ষক গ্রুপ ডায়লগে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশে সাশ্রয়ী মূল্যে স্মার্টফোন উৎপাদন শুরু হয়েছে। চার থেকে পাঁচ হাজার টাকায় স্মার্টফোন পাওয়া যাবে। এতে কৃষক ও সাধারণ মানুষের প্রযুক্তি ব্যবহারের পথ আরও সুগম হবে। তারা আরও সহজে আবহাওয়া, সারের মাত্রা কিংবা পণ্যের বাজারদর জানতে পারবেন।
এ ছাড়া ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার কার্ড এবং ইমাম-পুরোহিতদের ভাতা ব্যাঙ্কিংয়ের মাধ্যমে চালু করার ফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ঘটছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সার্বিক উন্নয়ন এবং তাদের অর্থনৈতিক মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে শক্তিশালী ইন্টারনেট, ‘এক নাগরিক এক ওয়ালেট’ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।
মন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি একে অপরের পরিপূরক। ডিজিটাল অর্থনীতির সার্বিক গতি নিশ্চিত করতে নিরবচ্ছিন্ন ও উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ অপরিহার্য। শক্তিশালী ইন্টারনেট অবকাঠামো ছাড়া ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার সুফল পুরোপুরি অর্জন করা সম্ভব নয়।
‘ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রোডাক্ট’ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রান্তিক উৎপাদক ও কারিগরদের চিহ্নিত করে তাদের ডিজিটাল পেমেন্ট ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনার পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে উদ্ভাবন যেন থমকে না যায়, সে জন্য প্রয়োজনীয় সাইবার নিরাপত্তা ও নীতিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
শিগগিরই দেশে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল ব্যাংকিং শিগগিরই হতে যাচ্ছে। এ নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই, কারণ এটি আমাদের ডিজিটাল অর্থনীতি ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অন্যতম প্রধান অংশ।’
তিনি জানান, ডিজিটাল ব্যাংকিং বাংলাদেশের অর্থনীতি ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির একটি মূল উপাদান হয়ে উঠবে। সাইবার নিরাপত্তা জোরদার, উন্নত ডিজিটাল অবকাঠামো নির্মাণ এবং ক্রেডিট তথ্যের সঠিক সমন্বয়ের ওপর জোর দিয়ে নীতি নির্ধারকরা পর্যায়ক্রমে এই সেবা চালুর পরিকল্পনা করছেন।
আর্থিক সেবার পরিসর বাড়ানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল ব্যাঙ্কিংকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই; বরং নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ, ডিজিটাল পেমেন্ট ও ব্যাঙ্কিং সুবিধার সমন্বয়ে গঠিত একটি বিস্তৃত ইকোসিস্টেম হিসেবে এ ব্যবস্থাকে বিবেচনা করতে হবে।’ এই সেবা বিস্তারের আগেই শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
সংলাপ চলাকালে অংশগ্রহণকারীরা বাংলা কিউআরের অপব্যবহার এবং সর্বনিম্ন মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) ও ইন্টারচেঞ্জ রিইম্বার্সমেন্ট ফি (আইআরএফ) তুলে নেওয়ার বিষয়টি উত্থাপন করেন, যা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রদানকারীদের বিজনেস মডেলকে ব্যাহত করেছে। তারা জানান, চার্জমুক্ত পেমেন্ট সুবিধার সুযোগ নিয়ে কিছু এজেন্ট এমএফএসের টাকা ব্যাংকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে, যা বন্ধে কঠোর তদারকি দরকার।
এমডিআর হলো ডিজিটাল লেনদেন প্রক্রিয়ার জন্য মার্চেন্টদের পক্ষ থেকে ব্যাংক ও পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারদের দেওয়া ফি। আর আইআরএফ হলো এক ধরনের আন্তঃব্যাংক সার্ভিস চার্জ, যা বাংলা কিউআর স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানকে দিতে হয়—যার অ্যাপ ব্যবহার করে পেমেন্ট করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, এমডিআর ও আইআরএফ শূন্য করা হলে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো ক্যাশ-ইন চার্জ বাড়াতে বাধ্য হতে পারে, যা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যকে ব্যাহত করবে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, বাংলা কিউআর এমন একটি বিষয় যা আমাদের গ্রহণ করতেই হবে, তবে একই সঙ্গে এর অপব্যবহার রোধ করতে হবে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ, তবে একটি ‘বিগ-ব্যাংক’ ধরনের সমাধান তৈরির জন্য অনেক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এই উদ্যোগ টেকসই হতে হবে। এই সমস্যার একক কোনো সমাধান নেই, একটি একটি করে সমাধান করতে হবে।
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলা কিউআর বাস্তবায়নের জন্য একটি টেকসই রোডম্যাপ থাকতে হবে, যেখানে আজকের অংশীজনদের মতামত বড় আকারে বিবেচনায় নেওয়া হবে। স্পষ্টতই, এসব কাজ করতেই হবে, তবে ডিজিটাল ভবিষ্যতের বিভিন্ন অংশজুড়ে আরও অনেক কাজও করতে হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে