১৯৯৯ সালে লন্ডন ও মস্কোতে প্রায় দুই দশক কাটানোর পর কানাডীয় কূটনীতিক স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে অটোয়ায় পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এক সাংবাদিক। তখন অনেকেই বলেছিলেন, ‘বেচারা!’ কেউ কেউ আবার কানাডার রাজধানীকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘একঘেয়ে, প্রত্যন্ত শহর’ হিসেবে। কিন্তু ২৭ বছরেরও বেশি সময় পর সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই।
একসময় অটোয়াকে বলা হতো এমন এক শহর, যেখানে আনন্দ-উৎসবের বালাই নেই। এমনকি এক পুরোনো মার্কিন কৌতুকেও শহরটির নাম নিয়ে রসিকতা করা হয়েছিল— ‘অটো’ মানে বন্ধ আর ‘ওয়া’ মানে সন্ধ্যা ৬টার পর। অর্থাৎ সন্ধ্যার পরই যেন অটোয়া ঘুমিয়ে পড়ে।
কিন্তু সেই অটোয়া এখন অনেকটাই বদলে গেছে। প্রাণবন্ত, পরিবারবান্ধব এবং পর্যটকদের জন্য সহজে ঘোরার মতো একটি শহর হয়ে উঠেছে কানাডার রাজধানী। শহরের বেশির ভাগ আকর্ষণই মূল কেন্দ্রের আশপাশে। ২০২৫ সালে গ্রীষ্মকালীন পর্যটকের সংখ্যায় রেকর্ডও গড়েছে অটোয়া। এর পেছনে দুর্বল কানাডীয় ডলার, বড় সংগীত উৎসব এবং শিশুদের জন্য জাতীয় জাদুঘরগুলোতে বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগ ভূমিকা রেখেছে।
অবশ্য অটোয়ায় গেলে মন্ট্রিয়ল বা কুইবেক সিটির মতো জাঁকজমকপূর্ণ ভবন কিংবা ১৭ শতকের পাথুরে রাস্তা দেখার আশা না করাই ভালো। ১৮৫৭ সালে ব্রিটেনের রানি ভিক্টোরিয়া অটোয়াকে কানাডার রাজধানী হিসেবে বেছে নেওয়ার সময় এটি ছিল ছোট্ট এক কাঠ সংগ্রহের শহর। এরপরও শহরটি তুলনামূলক ছোটই থেকে গেছে।
ঘোরার শুরু বাইওয়ার্ড মার্কেট থেকে
অটোয়া ঘোরার জন্য শুরু করা যায় বাইওয়ার্ড মার্কেট থেকে। একসময় এখানে ছিল পতিতালয়, কোলাহলপূর্ণ পানশালা আর কাঠুরিয়াদের আনাগোনা। এখন এটি শহরের অন্যতম প্রাণবন্ত এলাকা—কেনাকাটা, খাবার আর বিনোদনের জন্য।
বাজারের ভেতরে আদিবাসী শিল্প ও খাবারের সামগ্রী পাওয়া যায়। শিশুদের জন্য উপহার, হাতে তৈরি বিচিত্র স্মারক এবং নানা ধরনের চকলেটের দোকানও রয়েছে। সঙ্গে আছে কানাডার ঐতিহ্যবাহী ম্যাপল সিরাপের স্টল।
তবে অটোয়ায় গিয়ে যে খাবারটি না খেলেই নয়, সেটি ‘বিভারটেইল’। পুরো গমের ময়দার তৈরি মণ্ড হাতে টেনে লম্বা করে গরম তেলে ভাজা হয়। এরপর ওপরে দেওয়া হয় বিভিন্ন উপকরণ। দারুচিনি, চিনি ও লেবুর রসের সংমিশ্রণটি সবচেয়ে জনপ্রিয়।
বাইওয়ার্ড মার্কেট থেকে কয়েক মিনিট হাঁটলেই কানাডার পার্লামেন্ট ভবন। মূল সেন্টার ব্লক দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের কারণে বন্ধ থাকলেও অন্য ভবনগুলোতে বিনামূল্যে গাইডেড ট্যুরের সুযোগ রয়েছে।
সাইকেলে শহর দেখা
খাওয়া শেষ হলে অটোয়াকে দেখার সবচেয়ে আনন্দের উপায় হতে পারে সাইকেল। শহরজুড়ে প্রায় ২০০ কিলোমিটার পথ ও ওয়াকওয়ে রয়েছে। পার্ক, রিডো ও অটোয়া নদীর পাশ দিয়ে চলে গেছে এসব পথ।
পার্লামেন্ট হিলের নিচ দিয়ে যাওয়া অটোয়া রিভার পথ থেকে শহরের দারুণ দৃশ্য দেখা যায়। আর শহরের কেন্দ্র থেকে কয়েক মিনিট সাইকেল চালালেই কোলাহল পেছনে ফেলে শোনা যায় শুধু পাখির ডাক।
যারা একটু ধীর গতিতে শহর দেখতে চান, তারা রিডো খালে প্রায় ৯০ মিনিটের নৌভ্রমণেও যেতে পারেন।
শীতের অটোয়া যেন অন্য শহর
গ্রীষ্মে অটোয়ার তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। কিন্তু শীতে তাপমাত্রা নেমে যায় মাইনাস ২০ ডিগ্রিতে। তখন শহরটির চেহারাই বদলে যায়।
শীতের অন্যতম আকর্ষণ রিডো খাল। বরফে জমে গেলে প্রায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ অংশ পরিণত হয় স্কেটওয়েতে। পর্যটকেরা বরফের ওপর স্কেটিং করেন, আর মাঝপথে থেমে গরম চকলেট ও বিভারটেইল খান।
জানুয়ারির শেষ থেকে ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে ১৮ দিনের ‘উইন্টারলুড’ উৎসব হয়। এতে বরফ খোদাই প্রতিযোগিতা, টোবোগান স্লাইডসহ নানা আয়োজন থাকে। আরও রোমাঞ্চ চাইলে শহরের ওপারে গাতিনো পার্কে স্নোশুয়িং কিংবা কাছের স্কি ঢালেও যাওয়া যায়।
সংস্কৃতি, খেলাধুলা আর স্থানীয় জীবন
শহরের সাংস্কৃতিক আকর্ষণের মধ্যে ন্যাশনাল গ্যালারি অন্যতম। সেখানে রেমব্রান্ট, ওয়ারহল, মন্ড্রিয়ান, রুবেন্স, সেজান ও ক্লিমটের কাজের পাশাপাশি কানাডীয় শিল্পীদের চিত্রকর্মও রয়েছে। গ্যালারির বাইরে বিশাল মাকড়সার ভাস্কর্য ‘মামান’ও দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে।
শিশুদের নিয়ে গেলে ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব নেচার, সায়েন্স মিউজিয়াম এবং এগ্রিকালচার অ্যান্ড ফুড মিউজিয়াম ঘুরে দেখা যায়। শহরের ওপারে গাতিনোতে রয়েছে মিউজিয়াম অব হিস্ট্রি।
আর কানাডার জনপ্রিয় খেলা হকির উত্তেজনা উপভোগ করতে চাইলে যাওয়া যায় কানাডিয়ান টায়ার সেন্টারে, যেখানে খেলে অটোয়া সেনেটরস।
অটোয়ায় স্থানীয়দের মতো পোশাক পরতে চাইলে শীতের জন্য সঙ্গে রাখতে পারেন ‘টুক’—উলের তৈরি বোনা শীতের টুপি। আর দিনের শেষে সূর্যাস্ত দেখতে হলে মেজরস হিল পার্ক হতে পারে উপযুক্ত জায়গা।
একসময় যে শহরকে ‘আনন্দহীন’ বলা হতো, সেই অটোয়া আজ ইতিহাস, প্রকৃতি, সংস্কৃতি, খেলাধুলা আর পারিবারিক বিনোদনের এক বৈচিত্র্যময় শহর। বড় শহরের জাঁকজমক হয়তো নেই, কিন্তু সেই ছোট পরিসরেই অটোয়া নিজের মতো করে তৈরি করেছে আলাদা এক আকর্ষণ।
সময়ের আলো/কেএইচ