বিদেশে ‘ভালোবাসার’ বাণী, পশ্চিমবঙ্গে খ্রিস্টানদের প্রার্থনায় হামলার অভিযোগ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের একটি গ্রাম সুতাহাটা। ২৬ আগস্ট সকাল গড়িয়ে দুপুর। রানিচক গ্রামের গৌতম বেরার বাড়িতে তখন প্রায় ৫০

2026-09-20T20:55:28+00:00
2026-09-20T20:55:28+00:00
 
  রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৫ আশ্বিন ১৪৩৩
রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
দ্য ডিপ্লোম্যাটের নিবন্ধ
বিদেশে ‘ভালোবাসার’ বাণী, পশ্চিমবঙ্গে খ্রিস্টানদের প্রার্থনায় হামলার অভিযোগ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৫৫ পিএম 
রানিচক গ্রামের গৌতম বেরার বাড়িতে ফেসবুক লাইভস্ট্রিম ভিডিও। ছবি : দ্য ডিপ্লোম্যাট
ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের একটি গ্রাম সুতাহাটা। ২৬ আগস্ট সকাল গড়িয়ে দুপুর। রানিচক গ্রামের গৌতম বেরার বাড়িতে তখন প্রায় ৫০ জন মানুষ জড়ো হয়েছেন। বাড়িটিতে বাইবেল পাঠ, প্রার্থনা ও ধর্মীয় আলোচনা চলছিল। সেখানে উপস্থিতদের অনেকেই ছিলেন হিন্দু, যারা ছিলেন বেরা পরিবারের বন্ধু ও পরিচিতজন।

হঠাৎ সেই প্রার্থনা সভার খবর পৌঁছে যায় হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কয়েকজন সদস্যের কাছে। তাদের অভিযোগ ছিল, সেখানে একজন খ্রিস্টান যাজক গিয়ে হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করছেন। 

একজন ব্যক্তি ঘটনাস্থলের দিকে যেতে যেতে ফেসবুকে লাইভ করেন। তাকে বলতে শোনা যায়, তারা দেখতে যাচ্ছেন সেখানে কী হচ্ছে। তিনি বাড়িটিতে পৌঁছানোর আগেই তার কয়েকজন সহযোগী সেখানে ঢুকে পড়েছিলেন বলে দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। 

তারা বাড়িতে ঢুকে উপস্থিত ব্যক্তিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন, প্রার্থনা সভা বন্ধ করে দেন এবং কয়েকজনকে বাইরে বের করে দেন। পরে উপস্থিত অন্যদের সঙ্গেও হাতাহাতি হয় বলে অভিযোগ।

ভিডিওতে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘তোমরা হিন্দু, বাড়িতে হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি আছে। তাহলে একজন ফাদারকে এনে খ্রিস্টধর্ম পালন করছ কীভাবে?’ আরেকজন বাইবেল হাতে নিয়ে সেটি দেখিয়ে আপত্তি জানাচ্ছিলেন।

ঘটনাস্থলের আরেকটি ভিডিওতে গেরুয়া পতাকা হাতে কয়েকজনকে প্রার্থনায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ‘হরে কৃষ্ণ, হরে রাম’ এবং ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিতে বাধ্য করার চেষ্টা করতে দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একপর্যায়ে পুলিশ প্রার্থনায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। ভিড়ের মধ্য থেকে ‘মারো, মারো’ ধরনের স্লোগানও শোনা যায়।

বাইবেল পাঠ করছিলেন যাজক জয় কুমার ঘুঘু। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ তাকে আরও ১৬ জনের সঙ্গে প্রথমে সুতাহাটা ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যায়। সেখানে তাদের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। এরপর সবাইকে থানায় নিয়ে গিয়ে প্রার্থনা সভার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাদের মোবাইল ফোনও পরীক্ষা করা হয়। রাত ৮টার দিকে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। 

ঘুঘু দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেন, হামলাকারীদের বিরুদ্ধে তারা কোনো পুলিশ অভিযোগ করেননি, কারণ যিশু ক্ষমা করতে শিক্ষা দিয়েছেন। বরং তারা হামলাকারীদের মঙ্গল কামনা করে প্রার্থনা করবেন। 

তবে একই সঙ্গে তার প্রশ্ন— ভারতের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদ যেখানে প্রত্যেক নাগরিককে বিবেকের স্বাধীনতা এবং নিজ ধর্ম পালন, প্রচার ও প্রসারের অধিকার দিয়েছে, সেখানে খ্রিস্টধর্ম প্রচারে আপত্তি কেন? 

আরএসএসের সঙ্গে যোগসূত্রের অভিযোগ

সুতাহাটার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের কয়েকজন নিজেদের ‘শ্রী রাম জন্মোৎসব সমিতি’র সদস্য বলে পরিচয় দেন। দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংগঠনটি আরএসএস ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর বিভিন্ন অনুষ্ঠানের প্রচার করে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের সঙ্গে সম্পর্কের বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ করে।

ঘটনাস্থলে ভিডিও ধারণকারী একজন নিজেকে এবং তার সহযোগীদের বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বা ভিএইচপির সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

একটি ভিডিওতে প্রার্থনা সভার আয়োজক ও সেখানে উপস্থিত যাজকের ছবি দেখিয়ে একজনকে বলতে শোনা যায়, তাদের যেখানে দেখা যাবে, সেখানেই ঝাড়ু দিয়ে পেটাতে হবে এবং তারা সন্ত্রাসীদের চেয়েও খারাপ।

আরেকটি ভিডিও বজরং দলের একটি ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয় বলে দ্য ডিপ্লোম্যাট জানিয়েছে। সেখানে নিজেদের ভিএইচপির স্থানীয় ইউনিটের সদস্য হিসেবে পরিচয় দেওয়া কয়েকজনকে বলতে শোনা যায়, সনাতন ধর্ম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধর্ম এবং ভিডিওতে যাদের চিহ্নিত করা হয়েছে, তাদের কোথাও দেখা গেলে যেন খবর দেওয়া হয়।

কয়েক ঘণ্টা পর শ্রী রাম জন্মোৎসব সমিতির একটি ফেসবুক পোস্টে বলা হয়, ‘ঈশ্বর পিতার’ নামে ধর্মীয় প্রচারণা চালানো ব্যক্তিদের জন্য এই ঘটনা একটি সতর্কবার্তা এবং তাদের ধরা পড়লে কঠোর পরিণতি ভোগ করতে হবে।

বিদেশে তখন ‘ভালোবাসা ও ঐক্যের’ বার্তা

সুতাহাটার এই ঘটনার কয়েক দিন পরই আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্য সফরে সংগঠনটির শতবর্ষ উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছিলেন।

নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে ২৯ আগস্ট এক অনুষ্ঠানে ভাগবত হিন্দু পরিচয়ের সঙ্গে সব ধর্মীয় পথের প্রতি সম্মান এবং প্রত্যেক মানুষের মর্যাদার কথা বলেন। তিনি বৈচিত্র্যকে ঐক্যের অংশ হিসেবে গ্রহণ, সম্মান ও সুরক্ষার কথা তুলে ধরেন। 

৬ সেপ্টেম্বর লন্ডনের এক অনুষ্ঠানে তিনি আরএসএসের কর্মকাণ্ডের ভিত্তি ঘৃণা নয়, বরং ‘শুদ্ধ সাত্ত্বিক প্রেম’— অর্থাৎ পবিত্র ও ঐশ্বরিক ভালোবাসা বলে উল্লেখ করেন।

কিন্তু দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভাগবত যখন বিদেশে ঐক্য ও ভালোবাসার বার্তা দিচ্ছিলেন, তখন পশ্চিমবঙ্গে আরএসএস-ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যদের বিরুদ্ধে খ্রিস্টানদের প্রার্থনা সভায় বাধা দেওয়ার একাধিক অভিযোগ সামনে আসে।

আগস্ট-সেপ্টেম্বরে একের পর এক অভিযোগ

শুধু সুতাহাটাই নয়, প্রতিবেদনে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের আরও বেশ কয়েকটি ঘটনার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

২৩ আগস্ট হাওড়ার উলুবেড়িয়ায় একটি চার্চ প্রাঙ্গণে ঢুকে প্রার্থনার কক্ষ ভাঙচুর ও কয়েকজনকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। একই দিনে দক্ষিণ ২৪ পরগনার মগরাহাটের বানিবেড়িয়া এলাকায় একটি বাড়িতে খ্রিস্টানদের প্রার্থনা সভা বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ করা হয়।

৩০ আগস্ট দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে নিজের বাড়িতে খ্রিস্টানদের প্রার্থনা সভা আয়োজন করায় এক আইনজীবীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। হাওড়ার জগৎবল্লভপুরে একটি প্রার্থনা সভায় হামলা এবং উত্তর ২৪ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জে আরেকটি প্রার্থনাস্থল ভাঙচুরের অভিযোগও করা হয়।

১ সেপ্টেম্বর উত্তর ২৪ পরগনার হাসনাবাদ রূপমারি বাজার এলাকায় খ্রিস্টানদের পরিচালিত একটি স্কুল বন্ধ করে তালা লাগিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। প্রতিবাদকারীদের অভিযোগ ছিল, স্কুলের দেয়ালে যিশুর ছবি রয়েছে, কিন্তু কোনো হিন্দু দেবতার ছবি নেই। তারা প্রশ্ন তোলে, শিশুদের যিশুর জীবন সম্পর্কে কেন পড়ানো হচ্ছে।

৭ সেপ্টেম্বর হাওড়ার বালিতে একটি ছোট, অস্থায়ী গির্জায় প্রার্থনা সভায় গিয়ে ভিএইচপি ও বজরং দলের সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচয় দেওয়া কয়েকজন সেখানে খ্রিস্টধর্ম প্রচার করা যাবে না বলে জানায়।

৯ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ ২৪ পরগনার মগরাহাটে একটি বাড়িতে গিয়ে কয়েকজন মানুষকে তারা কাকে উপাসনা করেন তা নিয়ে প্রশ্ন করা এবং যিশুর সামনে প্রার্থনা নিয়ে আপত্তি জানানোর অভিযোগ ওঠে।

১১ সেপ্টেম্বর একই এলাকার মামুদপুরে আরেকটি প্রার্থনা সভার আয়োজকদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করা হয়।

১২ সেপ্টেম্বর ক্যানিংয়ের তালদি এলাকায় একটি বাড়িতে আয়োজিত প্রার্থনা সভায় ভিএইচপির সদস্য পরিচয় দেওয়া কয়েকজন গিয়ে যিশুর ছবি ছিঁড়ে ফেলার নির্দেশ দেন এবং ভবিষ্যতে ওই সভা বন্ধ রাখতে বলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সেখানে বারবার ‘কেন যিশু?’ বলে প্রশ্ন করা হচ্ছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিজেদের ভিএইচপি ও বজরং দলের সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়ে অভিযোগকারীদের চ্যালেঞ্জ করার কথাও বলা হয়।

পরদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আরেকটি ভিডিওতে খ্রিস্টানদের ধর্মীয় বই ছিঁড়ে ফেলার দৃশ্য দেখা যায় বলে দ্য ডিপ্লোম্যাট জানিয়েছে। হামলাকারীরা কেন গীতা পড়া বা হরে কৃষ্ণের নাম না নিয়ে ‘গড দ্য ফাদার’ সম্পর্কে পড়া হচ্ছে, তা নিয়ে আপত্তি জানাচ্ছিলেন।


‘রোববার যেন আতঙ্কের দিন’

পশ্চিমবঙ্গের খ্রিস্টান সংগঠন বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবার সদস্য অর্পণ রানা দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ‘রোববার যেন আতঙ্কের দিনে’ পরিণত হয়েছে। তার দাবি, গত কয়েক মাসে প্রায় প্রতি রোববারই কোনো না কোনো ঘটনা ঘটেছে।

তার বক্তব্য, কোথাও জোরপূর্বক বা প্রতারণার মাধ্যমে ধর্মান্তরের অভিযোগ থাকলে সরকার তদন্ত করতে পারে। কিন্তু তার জন্য সাধারণ মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না।

সংগঠনটির সম্পাদক হেরড মুলিক বলেন, বিদেশে মোহন ভাগবতের দেওয়া ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের বক্তব্য তাদের আশাবাদী করেছে। তিনি আশা করেন, স্থানীয় প্রশাসনও এসব বক্তব্যের বাস্তব প্রতিফলন ঘটাবে।

মুলিকের দাবি, হামলার ঘটনা অনেক হলেও সব ক্ষেত্রে পুলিশে অভিযোগ করা হয়নি। অনেক ভুক্তভোগী আইনি ব্যবস্থা নিতে ভয় পাচ্ছেন। তার আরও অভিযোগ, কিছু ঘটনায় যাজক ও প্রার্থনাকারীদেরই পুলিশ আটক বা হয়রানি করেছে, অথচ হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

কেন বাড়িতে প্রার্থনা?

পশ্চিমবঙ্গের যেসব এলাকায় খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী খুবই ছোট, সেখানে অনেক সময় আলাদা চার্চ থাকে না। ফলে বাড়িতেই প্রার্থনা ও বাইবেল পাঠের আয়োজন করা হয়। এসব আয়োজনকে হাউস চার্চ বা হাউস ফেলোশিপ বলা হয়।

খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক হামলাগুলোর বড় অংশই এই ধরনের ছোট ও বাড়িভিত্তিক ধর্মীয় সমাবেশকে লক্ষ্য করে হচ্ছে।

একজন যাজক, যিনি সম্প্রতি এমন হয়রানির মুখে পড়েছেন, পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেন, তাদের জিজ্ঞেস করা হচ্ছে—হিন্দুরা কেন বাইবেল শুনছে। তার প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্রে কি কেউ বিভিন্ন হরে কৃষ্ণ অনুষ্ঠানে খ্রিস্টানদের অংশগ্রহণ নিয়ে একইভাবে প্রশ্ন তোলে?

পশ্চিমবঙ্গে এটি নতুন প্রবণতা?

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে— বিশেষ করে বিজেপিশাসিত কয়েকটি রাজ্যে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ বহুদিনের। তবে পশ্চিমবঙ্গে এ ধরনের ঘটনা তুলনামূলকভাবে নতুন বলে স্থানীয় খ্রিস্টান নেতারা দাবি করছেন।

২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার মাত্র ০.৭২ শতাংশ। সংখ্যায় ছোট হলেও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ও দাতব্য কর্মকাণ্ডে যুক্ত।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরপরই মে মাসে কয়েকটি ঘটনা ঘটে। মুর্শিদাবাদে বার্নালি চট্টোপাধ্যায় নামে এক খ্রিস্টান বিধবার বাড়িতে বিজেপির কর্মীদের বিরুদ্ধে ভাঙচুর এবং বাড়িটি মন্দিরে রূপান্তরের জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। একই দিনে বাঁকুড়ায় একটি প্রোটেস্ট্যান্ট প্রার্থনা সভায় বাধা দেওয়া এবং বাইবেল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করা হয়। 

এরপর অভিযোগের তালিকা আরও দীর্ঘ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পরিস্থিতির কারণে কয়েকটি জেলায় খ্রিস্টানরা বাড়িভিত্তিক প্রার্থনা সভা স্থগিত করেছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য সমীরুল ইসলাম অভিযোগ করেছেন, খ্রিস্টানদের ধর্ম পালন, প্রচার ও প্রসারের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। তার মতে, এটি ভারতের ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’-এর সাংবিধানিক ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

কংগ্রেসের পশ্চিমবঙ্গ শাখার সভাপতি শুভঙ্কর সরকারও অভিযোগ করেছেন, এসব ঘটনা রাজ্যের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় সহাবস্থান ও মিশ্র সংস্কৃতির ওপর আঘাত করছে।

অন্যদিকে, সিপিআইএমের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সম্পাদক মোহাম্মদ সেলিমের দাবি, ছোট ও অনানুষ্ঠানিক প্রার্থনা সভাগুলোকে লক্ষ্য করার একটি উদ্দেশ্য হলো খ্রিস্টানদের মধ্যে ভয় তৈরি করা, যাতে ঘটনাগুলো বড় ধরনের জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সংবাদে পরিণত না হয়।

এসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের দাবি হিসেবে দ্য ডিপ্লোম্যাটে প্রকাশ করা হয়েছে।

পরিবর্তনের পরপরই কেন এমন ঘটনা?

সুতাহাটার ২৬ আগস্টের ঘটনার একটি ভিডিওকে প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে হামলায় অংশ নেওয়া একজনকে বলতে শোনা যায়, সরকার পরিবর্তনের পরও এসব মানুষ অন্য ধর্মের প্রচার চালিয়ে যাচ্ছিলেন—এ কারণেই তাদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বক্তব্য থেকেই অভিযোগকারীদের একটি অংশের কাছে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে এসব ঘটনার সম্পর্ক থাকার ধারণা তৈরি হয়েছে। তবে এটি একটি অভিযোগ বা ব্যাখ্যা; এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।

সরকারের বক্তব্য কী?

দ্য ডিপ্লোম্যাট পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু এবং রাজ্যের আরএসএসের মুখপাত্র বিপ্লব রায়ের কাছে এসব অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য চেয়েছে।

প্রতিবেদন প্রকাশের সময় তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সাময়িকীটি জানিয়েছে, তাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।

এদিকে বিজেপির নেতা অমিত মালব্য সুতাহাটাসহ কয়েকটি ঘটনাকে স্থানীয় পর্যায়ের বিচ্ছিন্ন আপত্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন, পুলিশ পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণভাবে সামাল দিয়েছে।

ফলে একদিকে বিদেশের মাটিতে আরএসএস নেতৃত্বের পক্ষ থেকে ধর্মীয় ঐক্য, বৈচিত্র্য ও ভালোবাসার কথা বলা হচ্ছে; অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে খ্রিস্টানদের প্রার্থনা সভা ঘিরে হামলা ও হয়রানির একাধিক অভিযোগ সামনে আসছে। দ্য ডিপ্লোম্যাটের এই প্রতিবেদনের মূল প্রশ্নও সেখানেই—বিদেশে প্রচারিত সহাবস্থান ও ভালোবাসার বার্তা স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে।



সময়ের আলো/ইউএমএইচ
  বিষয়:   ভারত  পশ্চিমবঙ্গ  খ্রিস্টান 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: