তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানকে নিয়ে গঠিত ‘মক্কা জোট’-কে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার কাজ এগিয়ে চলছে বলে জানিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। তার ভাষায়, জোটটি ভবিষ্যতে একটি ‘গেম-চেঞ্জিং প্ল্যাটফর্ম’ হয়ে উঠতে পারে।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) তুরস্কের সম্প্রচারমাধ্যম এনটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফিদান বলেন, জোটের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। চুক্তিতে উল্লেখ থাকা সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সামরিক সদর দফতর চালুর প্রস্তুতিও এগিয়ে গেছে।
ফিদান বলেন, তিন দেশ ইতোমধ্যে এসব কাঠামো কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে অভিন্ন বোঝাপড়ায় পৌঁছেছে। এখন বাকি রয়েছে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং সদর দফতরকে কার্যকর করা।
নতুন দেশ যুক্ত করার পরিকল্পনা
মক্কা জোটকে শুধু তিন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না তুরস্ক। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার পর অন্য আঞ্চলিক দেশগুলোকে জোটে যুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে বলে জানান ফিদান।
তিনি বলেন, এই জোটের লক্ষ্য অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে নতুন আঞ্চলিক ব্লক তৈরি করা নয়। বরং আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধান করার সক্ষমতা বাড়ানো এবং একটি অভিন্ন প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা।
ফিদানের ভাষায়, জোটটি হবে ‘এই অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য উন্মুক্ত’। আঞ্চলিক সমস্যা মোকাবেলায় আঞ্চলিক মালিকানাই এর মূল ভিত্তি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে তুরস্কের অবস্থান
ইয়েমেনের হুতিদের সাম্প্রতিক হামলা প্রসঙ্গে ফিদান বলেন, সৌদি আরবের ভূখণ্ড, সার্বভৌমত্ব ও অবকাঠামো গুরুতর হামলার মুখে পড়েছে। মক্কা জোটের চুক্তি অনুযায়ী সদস্য দেশগুলোর একে অপরের প্রতি মিত্র হিসেবে দায়িত্ব রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সৌদি আরবকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান বিরোধের বাইরে রাখার পক্ষে মত দেন ফিদান। তার মতে, রিয়াদ নিজেও এই সংঘাতে জড়াতে চায় না। তবে প্রয়োজন হলে বিশেষ করে কিছু কারিগরি ও সামরিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা দেওয়ার বিষয়ে তুরস্ক প্রস্তুত রয়েছে।
মক্কা জোট নিয়ে সমালোচনা প্রত্যাখ্যান
মক্কা জোটকে এখনো কেবল কাগজে-কলমে থাকা একটি উদ্যোগ হিসেবে ইসরায়েল, ইরান, ভারত ও গ্রিসের সমালোচনার বিষয়ে ফিদান বলেন, এসব মন্তব্য জোটটির গুরুত্বের প্রতি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নজরকেই প্রকাশ করে।
তিনি বলেন, জোটের চুক্তি স্বাক্ষরের পর খুব বেশি সময় পার হয়নি। এরই মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির কাজ এগিয়ে চলছে। তাই জোটকে অকার্যকর হিসেবে চিহ্নিত করা সময়ের আগেই মূল্যায়ন করা হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় অচলাবস্থা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেন ফিদান। তার মতে, গত কয়েক মাস ধরে দুই দেশের আলোচনায় অচলাবস্থা রয়েছে। এর প্রভাব ইয়েমেন ও বাব আল-মান্দেব প্রণালীসহ বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও পড়ছে।
ফিদান বলেন, পাকিস্তানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়েছিল। তবে বাস্তবায়নের পর্যায়ে গিয়ে সমস্যা তৈরি হয় এবং পরে দুই পক্ষ নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী ওই প্রক্রিয়াকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে শুরু করে।
কাতার, পাকিস্তান ও ওমানের মধ্যস্থতামূলক প্রচেষ্টা বিভিন্ন সময়ে অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি। ফিদানের আশা, আলোচনার মাধ্যমে দুই পক্ষের গ্রহণযোগ্য একটি সমাধান বের করা সম্ভব হবে।
গাজা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ
গাজা শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপ থেকে দ্বিতীয় ধাপে যেতে না পারায় হতাশা প্রকাশ করেন ফিদান। তার দাবি, প্রথম ধাপে ফিলিস্তিনি পক্ষ ও হামাস বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করলেও পরে ইসরায়েল নতুন কিছু দাবি উত্থাপন করেছে।
তিনি বলেন, গাজায় মানবিক সহায়তা প্রয়োজনীয় পরিমাণ ও গতিতে পৌঁছাচ্ছে না। পাশাপাশি আবাসন ও পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী প্রবেশেও বাধা রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অধিকৃত পশ্চিম তীরেও বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা বাড়ছে বলে মন্তব্য করেন ফিদান। তিনি বলেন, তুরস্ক পশ্চিম তীর ও গাজার মধ্যে রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় কাজ করছে।
সিরিয়ার পরিস্থিতি
সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের সরকার পতনের পর দেশটির পুনর্গঠন, ঐক্য, আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও নিরাপত্তা নিয়ে তুরস্ক কাজ করছে বলে জানান ফিদান।
তিনি বলেন, আঙ্কারা ও দামেস্কের মধ্যে বিভিন্ন প্রকল্প ও সহযোগিতা পর্যবেক্ষণের জন্য একটি যৌথ পরিকল্পনা গ্রুপ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সিরিয়ার সরকারি বাহিনীতে সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ)-এর একীভূতকরণ প্রক্রিয়া নিয়েও ফিদান বলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। তবে বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে বিষয়টি এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে বিভিন্ন উদ্যোগ চললেও স্থায়ী সমাধান এখনো কঠিন বলে মন্তব্য করেন ফিদান। তার মতে, যুদ্ধের কারণে জ্বালানি, পরিবহন ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বেসামরিক মানুষের জীবন ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
কৃষ্ণসাগর দিয়ে শস্য পরিবহনও তুরস্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। ইউক্রেন ও রাশিয়ার শস্য বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে না পারলে বিভিন্ন দেশে খাদ্যনিরাপত্তা সংকট তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
গ্রিসের সঙ্গে এজিয়ান বিরোধ
গ্রিস-তুরস্ক সম্পর্কের বিষয়ে ফিদান বলেন, এজিয়ান সাগরের বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা প্রয়োজন। দ্বীপগুলোর সামরিকীকরণ নিয়েও তুরস্কের আপত্তির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
তিনি বলেন, এ অঞ্চলের প্রয়োজন অস্ত্র প্রতিযোগিতা নয়, বরং শান্তি। যুদ্ধ কোনো পক্ষের স্বার্থেই নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তইয়্যেব এরদোয়ান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশ নিতে নিউইয়র্ক যাবেন বলেও জানান ফিদান। সেখানে বৈশ্বিক বিভিন্ন সমস্যা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক নিয়েও ফিদান বলেন, আঙ্কারা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নত করতে চায়। একই সঙ্গে কাটসা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং এস-৪০০ ইস্যু সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় বললেন ফিদান
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)কে শুধু প্রযুক্তিগত বা অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার বিষয় হিসেবে না দেখে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানান ফিদান।
তার মতে, ভবিষ্যতে এআই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ ও সক্ষমতা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তুরস্ককে বড় ডেটা সেন্টার স্থাপন, বিপুল পরিমাণ ডেটা তৈরি এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে এ ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়াতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ফিদান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ইতোমধ্যে এআই ও ডেটা সেন্টারে বড় বিনিয়োগ করছে। তুরস্কেরও এ ক্ষেত্রে দ্রুত ও বড় পরিসরে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ