মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের চলমান যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ঝুঁকি এবং জাতিসংঘের আর্থিক ও রাজনৈতিক সংকট— এসব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সামনে রেখে নিউইয়র্কে শুরু হচ্ছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন। প্রায় ১৩০টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এতে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
এবারের অধিবেশনে দ্বিতীয়বারের মতো বক্তব্য দিতে জাতিসংঘে ফিরছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তার প্রশাসনের নীতির কারণে জাতিসংঘের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘে মার্কিন অর্থায়ন কমানোর পাশাপাশি বেশ কয়েকটি জাতিসংঘ সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করেছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবার সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন না। এর পরিবর্তে তিনি ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। বিষয়টি বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলায় জাতিসংঘের ভূমিকা ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
জাতিসংঘের নেতৃত্ব নিয়েও অনিশ্চয়তা
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ ২০২৬ সালের শেষ দিকে শেষ হচ্ছে। তার উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়েও এখনও কোনো স্পষ্ট প্রার্থী এগিয়ে নেই। জাতিসংঘের ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদে ইউক্রেন যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জাতিসংঘবিষয়ক বিশেষজ্ঞ রিচার্ড গোয়ান মনে করেন, জাতিসংঘ বর্তমানে একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটের মধ্যে রয়েছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের নিয়মিত বাজেটে ৭২৫ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করায় সাধারণ পরিষদে ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকি আপাতত এড়িয়েছে। তবে দেশটির এখনো জাতিসংঘের কাছে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বকেয়া রয়েছে।
আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি
এবারের অধিবেশনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ ও এর সম্ভাব্য ঝুঁকিও গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হবে। সম্প্রতি এআই খাতের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি প্রযুক্তিটির উন্নয়ন ধীর করার আহ্বান জানিয়েছেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব গুতেরেস দীর্ঘদিন ধরে এআই নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক নীতিমালা ও অভিন্ন নিরাপত্তা কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছেন। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অতীতে এআই-সংক্রান্ত ঝুঁকির সতর্কতাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং এ ধরনের আশঙ্কাকে ‘হোক্স’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতও অধিবেশনের অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয়। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘর্ষ এবং ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড পুরো অঞ্চলকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হুতি হামলার ঝুঁকি আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
গুতেরেস বলেন, এই সংকটের সামরিক সমাধান অত্যন্ত কঠিন। ইয়েমেনে দীর্ঘদিনের সংঘাতের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে তিনি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বুধবার সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও বৃহস্পতিবার বক্তব্য দেবেন।
অন্যদিকে, ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে এবারও সরাসরি নিউইয়র্কে উপস্থিত হওয়ার জন্য ভিসা দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। তবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ তাকে ভিডিওর মাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে।
সুদানের সংঘাত নিয়েও অধিবেশনের বাইরে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বড় ধরনের কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা কম বলে সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা মনে করছেন।
ইউক্রেন যুদ্ধ ও খাদ্যনিরাপত্তা
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধও জাতিসংঘের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পাবে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেবেন।
কূটনীতিকদের ধারণা, ইউক্রেনের কঠিন শীতের আগে আন্তর্জাতিক সমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা করবেন জেলেনস্কি। তবে রাশিয়া নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হওয়ায় ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে এবং এ কারণে যুদ্ধ বন্ধে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বললেও এখন পর্যন্ত স্থায়ী সমাধান হয়নি। চলতি মাসের শুরুতে তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কথা বলেছেন। নিউইয়র্কে জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠক হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
গুতেরেস একই সঙ্গে যুদ্ধের কারণে বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ, খাদ্যনিরাপত্তা ও জ্বালানি বাজারে সৃষ্ট সংকটের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি কৃষ্ণসাগর দিয়ে ইউক্রেন ও রাশিয়ার খাদ্য, সার ও জ্বালানি নিরাপদে রফতানির সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ এমন এক সময়ে বসছে, যখন একাধিক যুদ্ধ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, এআইয়ের দ্রুত বিকাশ এবং জাতিসংঘের নিজস্ব আর্থিক ও রাজনৈতিক সংকট আন্তর্জাতিক কূটনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ