শেয়ারবাজারে কাটছে আইপিওর খরা

জাহিদুল ইসলাম

জাতীয়

প্রায় আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে পুঁজিবাজারে নেই নতুন আইপিও অনুমোদন। এমনকি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছেও বর্তমানে

2026-09-21T00:47:13+00:00
2026-09-21T00:47:13+00:00
 
  সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৬ আশ্বিন ১৪৩৩
সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয়
শেয়ারবাজারে কাটছে আইপিওর খরা
জাহিদুল ইসলাম
প্রকাশ: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৪৭ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
প্রায় আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে পুঁজিবাজারে নেই নতুন আইপিও অনুমোদন। এমনকি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছেও বর্তমানে নতুন কোনো আইপিও আবেদন জমা নেই। 

তবে ইতিমধ্যেই বদলাতে শুরু করেছে দীর্ঘদিনের এই পরিস্থিতি। কিছু কোম্পানি প্রস্তুতি নিচ্ছে আইপিওর জন্য। বিভিন্ন মার্চেন্ট ব্যাংকের হাতে তৈরি হচ্ছে আবেদন জমার পাইপলাইন। পাশাপাশি সহজ করা হয়েছে আইপিওর নিয়মকানুন; সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ তৈরি এবং সরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানিকে বাজারে আনার উদ্যোগ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ফলে দীর্ঘদিনের আইপিও খরা সহসাই কাটতে পারে বলে আশা করছেন পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা।

ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান, পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদ ড. আবু আহমেদ আগামী দুয়েক মাসের মধ্যে দু-চারটি আইপিও আসবে বলে আশা করছেন। 

অন্যদিকে এমটিবি সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সেক্রেটারি সুমিত পোদ্দার জানিয়েছেন, তাদের নিজেদের একটি আইপিও জমার প্রস্তুতি চলছে এবং আরও দুই-তিনটি আইপিও পাইপলাইনে রয়েছে। প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত হলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই কিছু ভালোমানের আইপিও বাজারে আসতে পারে বলেও জানান তিনি।

আড়াই বছরেরও বেশি সময় স্থবির প্রাথমিক বাজার : দেশের পুঁজিবাজারে সর্বশেষ ২০২৪ সালের মার্চে টেকনো ড্রাগসের আইপিও অনুমোদন দিয়েছিল বিএসইসি। এরপর আর কোনো নতুন আইপিও অনুমোদন হয়নি। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুই বছর ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের বাজার কার্যত স্থবির রয়েছে।

এর চেয়েও বড় বিষয় হলো, বর্তমানে নতুন আইপিও অনুমোদনের অপেক্ষায় কোনো আবেদন নেই। চলতি সেপ্টেম্বরেও  কমিশনের কাছে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে আইপিওর মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহের আবেদন করেনি। অর্থাৎ এতদিন যে প্রশ্ন ছিল— আবেদন কেন অনুমোদন হচ্ছে না; সেটি পরিবর্তিত হয়ে এখন প্রশ্ন— কোম্পানিগুলো আইপিওর জন্য আবেদনই কেন করছে না?

তবে এই সময়ে সেকেন্ডারি মার্কেটে লেনদেনের গতি পুরোপুরি থেমে নেই। সর্বশেষ ১৭ সেপ্টেম্বর ডিএসইর প্রধান সূচক ৩৮ দশমিক ১ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৫৩২ পয়েন্টে ওঠে। একই দিনে লেনদেনের পরিমাণ ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ৬৬০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। 

সহজ হয়েছে আইপিও নিয়ম : আইসিবি চেয়ারম্যান ড. আবু আহমেদের মতে, আগে আইপিওর নিয়মকানুন জটিল ছিল এবং প্রক্রিয়ায় সময় বেশি লাগত। আগের কমিশন হয়তো গুণগত মান বিচার করতে গিয়ে আইপিও অনুমোদন দেয়নি। তবে বর্তমান কমিশন নিয়ম সহজ করেছে এবং আইপিওর বিকল্প হিসেবে ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের ব্যবস্থা রেখেছে।


তিনি বলেন, যেসব কোম্পানির মূলধন প্রয়োজন তারা আইপিওতে যাবে। আর যারা শুধু কিছু শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত করতে চায়, বেসরকারি, বহুজাতিক বা সরকারি কোম্পানিগুলো— তারা ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের সুযোগ নিতে পারবে। কিন্তু লিস্টিং প্রক্রিয়া সহজ করা হলেও এখন পর্যন্ত তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। আগামী দুই মাসের মধ্যে সাড়া পাওয়া যাবে বলে আশা করছি।

পাইপলাইনে আছে দুই থেকে চার প্রতিষ্ঠান : আইপিও খরা কাটার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন বিএমবিএ সেক্রেটারি সুমিত পোদ্দারও। তার মতে, আইপিও খরা ও স্থবিরতার পেছনে মূলত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, নীতিমালা পরিবর্তন, ক্যাপিটাল স্ট্রাকচারিং বা রেগুলেটরি বাধ্যবাধকতা এবং কোম্পানিগুলোর দুর্বল আর্থিক চিত্র কাজ করেছে।

তিনি বলেন, নতুন কমিশন আসার পর বিভিন্ন নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী জুন ক্লোজিংয়ের পুরো বছরের আর্থিক হিসাবের ওপর ভিত্তি করে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো আইপিও আবেদন করে। এ কারণে অনেকে অপেক্ষা করছেন।

এ ছাড়া বোনাস শেয়ার ছাড়া নগদ অর্থে পেইড-আপ ক্যাপিটাল বাড়ালে পরবর্তী দুই বছর আইপিও আবেদন করা যাবে না— এ ধরনের পুরোনো নিয়ম বা রেগুলেটরি ব্যাকলগও রয়েছে বলে জানান তিনি।

কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থাও আইপিও প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে। সুমিত পোদ্দারের ভাষ্য, সুদের হারের ওপর আগের ৬-৯ শতাংশের বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়ার পর কোম্পানিগুলোর অর্থায়ন ব্যয় ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১১-১২ শতাংশে পৌঁছেছে। 

তবে এখন নতুন করে আইপিওর পাইপলাইন তৈরি হচ্ছে বলে জানান তিনি। সুমিত পোদ্দার বলেন, বিভিন্ন ইনভেস্টমেন্ট ও মার্চেন্ট ব্যাংকের হাতে আইপিও জমার পাইপলাইন রয়েছে। এমনকি আমাদের নিজেদেরই একটি আইপিও জমার প্রস্তুতি চলছে এবং আরও দুই-তিনটি পাইপলাইনে রয়েছে। ডিএসই ও সিকিউরিটিজ কমিশন যদি আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করে, তা হলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই হয়তো কিছু ভালো মানের আইপিও বাজারে আসতে পারে। 

ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ে সরকারি-বহুজাতিক কোম্পানি :  আইপিওর পাশাপাশি সরাসরি তালিকাভুক্তির পথও তৈরি করছে বিএসইসি। সেপ্টেম্বরের শুরুতে কমিশন ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের খসড়া বিধিমালা অনুমোদন করে। পরে অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় করে খসড়াটি জনমতের জন্য প্রকাশ করা হয়।

সুমিত পোদ্দার বলেন, সরকার ও সিকিউরিটিজ কমিশন ডাইরেক্ট লিস্টিং রুলসকে খুবই ইতিবাচকভাবে নিয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে বহুজাতিক কোম্পানির ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত তাদের বিদেশি বোর্ড বা পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করায় প্রক্রিয়াটির সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বলা কঠিন বলে জানান তিনি।

ভালো শেয়ার সংকটে পুঁজিবাজার :  অন্যদিকে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম মনে করেন, বাজারের অন্যতম প্রধান সমস্যা এবং বর্তমান সংকটের কারণ হলো ভালো ও বিনিয়োগযোগ্য শেয়ারের সংখ্যা কম। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা অর্থ হারাচ্ছেন এবং বহু বছর ধরে কম রিটার্ন পাচ্ছেন।

তিনি বলেন, এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট কাটিয়ে উঠতে বাজারে ধারাবাহিকভাবে নতুন ও মানসম্পন্ন শেয়ার আনতে হবে। গত তিন বছরে বিষয়টি অনেকটাই উপেক্ষিত হয়েছে। তার মতে, নতুন ও মানসম্পন্ন শেয়ারের ঘাটতি বাজারের প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখা এবং নতুন বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে একটি বড় ঘাটতি।

কয়েক বছরের চিত্রে বড় পতন : আইপিওর পরিসংখ্যানেও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের চিত্র স্পষ্ট। ২০২১ সালে ১৫টি কোম্পানি আইপিওর মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল। ২০২২ সালে ছয়টি কোম্পানি সংগ্রহ করে ৬২৬ কোটি ২৬ লাখ টাকা। ২০২৩ সালে চারটি কোম্পানি প্রায় ২০২ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। আর ২০২৪ সালে চারটি কোম্পানি আইপিওর মাধ্যমে ৬৪৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করলেও মার্চের পর আর নতুন আইপিও অনুমোদনের ঘটনা ঘটেনি।

২০২৪ সালের মার্চের পর বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় ১৮টি গণপ্রস্তাবের আবেদন বাতিল বা প্রত্যাহার হয়েছে বলে জানা গেছে বাজারসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে। এসব প্রস্তাবের মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের সম্ভাবনা ছিল। 


বিএসইসির আহ্বান— বর্তমান নিয়মেই আবেদন : এমন পরিস্থিতিতে গত ১৬ সেপ্টেম্বরে নতুন করে কোম্পানিগুলোকে আইপিও আবেদন করার আহ্বান জানিয়েছে বিএসইসি। কমিশন জানিয়েছে, যেসব প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করতে চায়, তারা বর্তমান ‘পাবলিক অফার অব ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ বিধিমালা, ২০২৫’-এর অধীনে আবেদন করতে পারবে।

প্রথম আবেদনের দিকেই চোখ বাজার সংশ্লিষ্টদেরও :  দীর্ঘ আড়াই বছরেরও বেশি সময়ের আইপিও খরার পর এখন বাজারের সামনে নতুন প্রশ্ন— প্রথম আবেদনটি কবে আসবে। একদিকে বিএসইসি আবেদন করার আহ্বান জানিয়েছে, অন্যদিকে বাজারসংশ্লিষ্টরা একাধিক কোম্পানি পাইপলাইনে থাকার কথা বলছেন। 
ড. আবু আহমেদ আগামী এক-দুই মাসে দুই-চারটি আইপিও আসার আশা করছেন। সুমিত পোদ্দারের হিসাবে কিছু আইপিও ডিসেম্বরের মধ্যেই বাজারে আসতে পারে। আর সাইফুল ইসলাম এক বছরের মধ্যে কার্যকর প্রাথমিক বাজার দেখার প্রত্যাশা জানিয়েছেন।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে
  বিষয়:   শেয়ারবাজার  আইপিও  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: