প্রাকৃতিক পরিবেশে কিছু পাখির ডাক একটু বেশিই হৃদয় স্পর্শ করে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ স্বভাবতই উচ্চ কম্পাঙ্কের তীব্র ডাকের চেয়ে মৃদু, কম ফ্রিকোয়েন্সির এবং কিছুটা জটিল সুরের পাখির ডাক বেশি পছন্দ করে। সুরের এই পছন্দ কেবল পাখিপ্রেমী বা বিশেষজ্ঞদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পাখি সম্পর্কে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও সাধারণ মানুষ এই সুন্দর সুরগুলোর প্রতি একইভাবে আকৃষ্ট হয়।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, বিবর্তনের ধারায় পাখির এই স্বাভাবিক কলকাকলি যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে পরিবেশের নিরাপত্তা ও মানসিক প্রশান্তির বার্তা পৌঁছে দিয়ে আসছে।
সম্প্রতি ফ্রন্টিয়ার্স সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণার প্রধান লেখক ড. নাদিন কালব বলেন, এটি নির্দেশ করে যে পাখির গান উপভোগ করা কেবল আপনি কী শুনছেন তা জানার চেয়েও অনেক বেশি মৌলিক কিছুর সঙ্গে সম্পর্কিত। গবেষণার ফলাফল দেখাচ্ছে আমরা পাখির গান কতটা পছন্দ করি তার পেছনে বিভিন্ন শব্দগত বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ এবং এসব শব্দগত বৈশিষ্ট্যের ভিন্ন ভিন্ন মিশ্রণ খুবই আনন্দদায়ক সুর তৈরি করতে পারে।
গবেষকরা বলেছেন, এই ফলাফলগুলো পাখিরা কীভাবে আমাদের পরিবেশকে প্রভাবিত করে তা আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করতে পারে এবং পরবর্তীতে তা পার্ক, শহরের সবুজ এলাকা এবং মানুষ যেখানে মন সতেজ করতে যায় এমন স্থানগুলোর নকশা তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।
এ গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক ড. ক্রিস্টোফ র্যান্ডলার বলেন, সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো পাখিদের প্রতি মনোযোগ দেওয়া প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগে আমাদের অভিজ্ঞতাই বদলে দিতে পারে। এমনকি কোন পাখি কী বার্তা দিচ্ছে আমরা তা না বুঝলেও এর গান আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে, মনের ভেতর ইতিবাচক অনুভূতি জাগাতে পারে এবং আমাদের চারপাশের জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে আরও বেশি সচেতন করে তুলতে পারে।
গবেষণা দলটি ৮৪ জন মানুষকে ১২৩ প্রজাতির বুনো পাখির ডাকের রেকর্ড শুনতে দেয় এবং প্রতিটি পাখির ডাক তাদের কাছে কতটা আনন্দদায়ক লেগেছে সে অনুযায়ী নম্বর দিতে বলা হয়। পাঁচে মধ্যে গড়ে ৪.৫২ পয়েন্ট পেয়ে জরিপের সেরা নির্বাচিত হয় ‘কমন ব্ল্যাকবার্ড’ বা ইউরেশিয়ান ব্ল্যাকবার্ড। সচরাচর বাগান, পার্ক এবং বনাঞ্চলে দেখা পাওয়া ব্ল্যাকবার্ড পুরো ইউরোপজুড়েই একটি পরিচিত পাখি, যার গান এককথায় গম্ভীর, সুরেল ও বাঁশির সুরের মতো মধুর।
তালিকার অন্য প্রান্তে ছিল লক্ষ্মীপেঁচা (বার্ন আউল), যার ডাক গড়ে মাত্র ১.৩২ রেটিং পেয়েছে। লক্ষ্মীপেঁচার ডাক মূলত এক ধরনের গা ছমছমে, কর্কশ ও তীব্র চিৎকার। জরিপ করা অন্যান্য পাখির মধ্যে ‘ইউরোপীয় গোল্ডফিঞ্চ’ পাঁচের মধ্যে ৪.২৬ রেটিং পেয়েছে; এর পরপরই ছিল ‘ইউরোপীয় রবিন’ (৪.০৪) এবং ‘ব্লু টিট’ (৩.৯২)।
ঠিক কী কারণে একটি পাখির ডাক মধুর লাগে আর অন্যটির ডাক কম সুন্দর শোনায়, কালব এবং টিউবিংগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক র্যান্ডলার ঠিক এই প্রশ্নটির উত্তরই মূলত খুঁজতে চেয়েছিলেন। র্যান্ডলার বলেন, একটি বিস্তৃত প্রশ্ন থেকেই আমাদের এই আগ্রহের জন্ম। কেন পাখিদের সঙ্গে মানুষের কিছু কিছু সাক্ষাৎ বিশেষভাবে ইতিবাচক অনুভূতি তৈরি করে? আমাদের আগের গবেষণায় আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি, পাখি এবং পাখি পর্যবেক্ষণ মানুষের মানসিক প্রশান্তি ও সার্বিক সুস্থতায় অবদান রাখতে পারে।
র্যান্ডলার জানান, এ যাত্রায় গবেষকরা শব্দগুলোকে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে চেয়েছেন— যার মাধ্যমে ‘পাখির ডাকের জীববিদ্যা এবং মানুষের অনুভূতির মনোবিজ্ঞানকে’ একসঙ্গে মেলানো হয়েছে। মানুষ যখন পাখির গানগুলোকে রেটিং দিল, তখন গবেষকরা কোন বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণে গানগুলো বেশি সুরেলা ও মধুর মনে হয়েছে তা নির্ধারণ করতে সেই রেটিংগুলোকে পাখির ডাকের অ্যাকোস্টিক বা শব্দগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন।
র্যান্ডলার উল্লেখ করেন, সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ফলাফলগুলোর একটি ছিল, মানুষ সাধারণত জটিল প্রকৃতির পাখির গানগুলো বেশি পছন্দ করে। তিনি বলেন, আমরা স্বজ্ঞাতভাবেই হয়তো ভেবেছিলাম সহজ ও পুনরাবৃত্তিমূলক শব্দগুলো সহজবোধ্য এবং তাই বেশি আনন্দদায়ক হবে, কিন্তু ঠিক এর উল্টো চিত্রটিই দেখা গেছে। জটিল শব্দগুলোই সাধারণত বেশি আনন্দদায়ক রেটিং পেয়েছে। গবেষকদের মতে, এই ফলাফলগুলো একসময় শহর পরিকল্পনাবিদ এবং পার্ক নকশাকারদের কোলাহলপূর্ণ স্থানগুলো সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করতে পারে। শুধু শব্দদূষণ কমানোর ওপর জোর না দিয়ে, কর্মকর্তারা মানুষ যে ধরনের শব্দ শুনতে পায় সেগুলোর প্রতিও বেশি মনোযোগ দিতে পারেন— যার মধ্যে পাখির গানের মতো প্রাকৃতিক শব্দগুলোও অন্তর্ভুক্ত।
তবে র্যান্ডলার বলেন, এই গবেষণাটি এখনও শুরুর পর্যায়ে রয়েছে। তাই কোনো স্থানে কেবল বেশি বেশি পাখির ডাক জুড়ে দিলেই সমস্যার সমাধান নাও হতে পারে। তার দল আগের একটি গবেষণায় দেখেছে যে, লাউডস্পিকারে অতিরিক্ত পাখির ডাক বাজানো প্রাকৃতিক আবহ থেকে আসা পাখির ডাকের মতো মানসিক প্রশান্তি দেয় না।
ইংল্যান্ডের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক এবং পাখির সুরবিষয়ক গবেষক ড. ওলগা ফেহের বলেন, এই ফলাফলগুলো ইঙ্গিত দেয় মানুষের পাখির গান পছন্দের পেছনে অন্তত কিছু জৈবিক উপাদান কাজ করে। তবে ফেহের এই নতুন গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।
ফেহের অন্য একটি গবেষণার সূত্রে জানান, শব্দের প্রতি আমাদের কিছু প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত গভীর বিবর্তনীয় মূলের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। গত মার্চ মাসের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ এবং অন্য প্রাণীরা কিছু নির্দিষ্ট কণ্ঠস্বরের প্রতি একই ধরনের পছন্দ প্রদর্শন করে। ২০২০ সালের একটি গবেষণা উন্মোচন করেছে, মানুষের সংগীত এবং পাখির সুরের মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট ছন্দের মিল রয়েছে।
তবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও এই পছন্দগুলোকে প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে করেন ফেহের। তিনি ‘জেব্রা ফিঞ্চ’ নিয়ে গবেষণা করেন, যাদের দ্রুতগতির ও যান্ত্রিক সুরের গান প্রায়শই শ্রুতিকটু হিসেবে গণ্য হয়। তিনি লেখেন, কিন্তু আমি নিজে এই গান ব্যক্তিগতভাবে দারুণ পছন্দ করি, যা নিঃসন্দেহে এই পাখির সঙ্গে আমার সুন্দর কিছু স্মৃতির সংমিশ্রণের কারণে। তিনি আরও বলেন, যদিও এই নতুন গবেষণাটি ইঙ্গিত করে আমরা মানুষের জন্য তৈরি শব্দভিত্তিক পরিবেশের নকশা উন্নত করতে এই তথ্য ব্যবহার করতে পারি, তবে কেবল সুরেল ও আকর্ষণীয় প্রজাতির পাখিদের ওপর নজর দিলে যেসব পাখির গান কম মিষ্টি, তাদের সংরক্ষণের প্রচেষ্টা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়্যাল হলোওয়ের ‘অ্যানিমেল কমিউনিকেশন’ গবেষক ও মনোবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ড. রবার্ট ল্যাচলান মনে করেন, এই গবেষণাটি অনুসন্ধানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তবে ঠিক কোন জিনিসটি পাখির গানকে মানুষের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলে তা স্পষ্টভাবে বুঝতে আরও গবেষণার প্রয়োজন।
উচ্চ কম্পাঙ্কের সুরগুলোই কি সবসময় বেশি আকর্ষণীয় এমন প্রশ্ন তুলে তিনি উল্লেখ করেন যে, ব্ল্যাকবার্ড বা নাইটিনগেলের মতো যেসব পাখি সুন্দর গানের জন্য বিখ্যাত, তারা সাধারণত তুলনামূলক কম কম্পাঙ্কের ও বাঁশির মতো সুর ব্যবহার করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, সুরের কম্পাঙ্কের পরিমাপকে (ফ্রিকোয়েন্সি স্কেল) এমন কিছু নির্দিষ্ট মাত্রা থাকা অস্বাভাবিক নয়, যা আমাদের কাছে বেশি আকর্ষণীয় বলে মনে হয়।
গবেষণার প্রধান লেখক ড. কালব জানান, পাখির সুর মধুর লাগার পেছনে কোনো একক নির্দিষ্ট সূত্র নেই। ব্ল্যাকবার্ড, উইলো ওয়ার্বলার এবং ব্ল্যাকক্যাপ এই পাখিগুলোর সুর একে অন্যের থেকে বেশ আলাদা, অথচ এদের সবই উচ্চমাত্রার প্রশংসনীয় রেটিং পেয়েছে। আমাদের এই গবেষণার অর্থ এটি নয় যে কেবল একটি একক শব্দগত বৈশিষ্ট্যই আলাদাভাবে কাজ করে। বরং কম্পাঙ্ক (ফ্রিকোয়েন্সি), তীব্রতা এবং ফ্রিকোয়েন্সির পরিসরের (ব্যান্ডউইথ) সমন্বয়ই মূলত নির্ধারণ করে একটি পাখির ডাক কতটা সুরেল বা মধুর শোনাবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে