শিক্ষক এ.এস.এম ওবায়দুল্লাহ চৌধুরী তার বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের ইতি টানলেন এক রাজকীয় সংবর্ধনার মধ্য দিয়ে। ছবি : সময়ের আলো দীর্ঘ ৩৭ বছর আগে যে আঙিনায় তরুণ শিক্ষক হিসেবে পা রেখেছিলেন, সেখান থেকেই বিদায় নিলেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে। পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার বোয়ালমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এ.এস.এম ওবায়দুল্লাহ চৌধুরী তার বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের ইতি টানলেন এক রাজকীয় সংবর্ধনার মধ্য দিয়ে। অবসরে যাওয়ার দিনে তাকে প্রাইভেটকারে চড়িয়ে সসম্মানে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছেন স্কুলটির সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী।
১৯৯০ সালে মরহুম আব্দুস সামাদের হাত ধরে যখন বোয়ালমারী স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয়, তখনই সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন ওবায়দুল্লাহ চৌধুরী। সেই থেকে ২০২৬ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৭ বছর তিনি একই প্রতিষ্ঠানে কখনও শিক্ষক, কখনও অভিভাবক, আবার কখনও পথপ্রদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার হাত ধরে হাজারও শিক্ষার্থী আজ বিভিন্নভাবে প্রতিষ্ঠিত। দীর্ঘ এই সময়ে তিনি স্কুলটিকে শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, নিজের ঘর-সংসার হিসেবে আগলে রেখেছিলেন।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি রূপ নেয় এক অশ্রুসিক্ত মিলনমেলায়। প্রিয় ‘স্যার’কে বিদায় জানাতে বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা ছুটে আসেন। অনুষ্ঠানের শুরুতেই তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও সম্মাননা স্মারকসহ নানা উপহারে সিক্ত করা হয়। এ সময় বিদ্যালয়টি হতে ট্যালেন্ট পুলে তিন মেধাবী শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শামীমা আক্তারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা সীমান্ত কুমার বসাক, রিসোর্স সেন্টারের ইনস্ট্রাক্টর আ.খ.ম ফররুখ আহম্মদ, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি মামুনুর রশীদ এবং জেলা শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মকবুলার রহমান। এছাড়াও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নারগিস আক্তার, জামরিগুরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আকরাম হোসেন জাকারিয়াসহ বিভিন্ন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক, বিদ্যালয়ের সহসভাপতি নীরব রানা ও সাবেক সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন, আব্দুর রহিমসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা বলেন, ওবায়দুল্লাহ চৌধুরী শুধু একজন শিক্ষক নন, তিনি এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাকালীন থেকে স্তম্ভ। ৩৭ বছর একই স্কুলে থেকে তিনি সততা ও শৃঙ্খলার যে দৃষ্টান্ত রেখে গেলেন, তা বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষকদের জন্য এক মহান শিক্ষা। তবে স্কুলের সপ্তাহে কিংবা যখনই মনে হবে এসে সময় কাটানো ও পাঠদানেরও অনুরোধ জানান বক্তারা।
নিজের বিদায়ি বক্তব্যে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি ওবায়দুল্লাহ চৌধুরী। তিনি বলেন, এই স্কুলটিই ছিল আমার পৃথিবী। শিশুদের মাঝেই আমি জীবন খুঁজে পেয়েছিলাম। আজ শরীরটা নিয়ে চলে যাচ্ছি, কিন্তু মনটা এই প্রাঙ্গণেই পড়ে থাকবে। আর আমি সপ্তাহে একবার হলেও স্কুলটিতে আসবো।
বক্তব্য দেওয়ার সময় স্কুল প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধান শিক্ষক মরহুম আব্দুস সামাদের স্মৃতিচারণ করে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লে উপস্থিত সবার চোখে জল আসে।
অনুষ্ঠান শেষে এই গুণী শিক্ষককে একটি প্রাইভেটকারে বসিয়ে তার নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। এ সময় রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ ও খুদে শিক্ষার্থীরা হাত নেড়ে ও পুষ্পবৃষ্টির মাধ্যমে তাদের প্রিয় অভিভাবককে শেষ বিদায় জানান। তেঁতুলিয়ার এই প্রান্তিক জনপদে একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রতি মানুষের এমন অকৃত্রিম ভালোবাসা দীর্ঘকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সময়ের আলো/আতা