সরকারি পোর্টালের আদলে ক্লোন ওয়েবসাইট তৈরি করে ডিজিটাল ওয়ারিশ সনদ জাল করার ঘটনা ধরা পড়েছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে। ওই ভুয়া সনদে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সিল-স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে। পরে সেই সনদের ভিত্তিতে শিবপুর মৌজার প্রায় আড়াই কোটি টাকা মূল্যের ৫৭ দশমিক ৪৫ শতক জমির নামজারি করিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
জানা গেছে, সীতাকুণ্ড পৌরসভার অনুমোদিত ডিজিটাল সনদ পোর্টালের আদলে একটি ক্লোন ওয়েবসাইট তৈরি করে প্রতারক চক্র। ওই সাইট ব্যবহার করে হাছিনা বেগম নামের এক নারী কম্পিউটার অপারেটরদের সহায়তায় ১০৪৪৪৬ নম্বরের একটি ডিজিটাল ওয়ারিশ সনদ তৈরি করান।
তদন্তে দেখা যায়, সনদটিতে তারিখ দেওয়া হয়েছে ১৪ এপ্রিল, পহেলা বৈশাখের দিন। ওই দিন সরকারি ছুটি থাকলেও সনদটি ইস্যু করা হয়েছে বলে দেখানো হয়। এতে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম এবং সীতাকুণ্ড মডেল থানার ওসি মো. মহিনুল ইসলামের স্ক্যান করা স্বাক্ষর ও সিল ব্যবহার করা হয়েছে।
এর আগে সোনাইছড়ি মৌজাতেও আমেরিকা প্রবাসী ও জীবিত মোহাম্মদ জামাল উদ্দিনকে মৃত দেখিয়ে একই ধরনের ভুয়া ওয়ারিশ সনদের মাধ্যমে নামজারি করার চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে বিষয়টি ধরা পড়লে ওই নামজারি বাতিল করা হয়।
এবার শিবপুর মৌজার ১০টি দাগের ৫৭ দশমিক ৪৫ শতক জমি নামজারি করতে একই ধরনের জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, জমিটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
ভুয়া সনদটি আসল হিসেবে দেখিয়ে গত ১০ আগস্ট মিউটেশন কেস নম্বর ২২সেন-(IX-I)/২০২৬-২৭-এর মাধ্যমে জমিটির নামজারি অনুমোদন নেওয়া হয়। এরপর প্রকৃত ওয়ারিশ হাছিনা বানুর পরিবারকে পৈতৃক ভিটা থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা করা হলে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
পরে হাছিনা বানুর ছেলে মো. আলী আজম পৌর প্রশাসক ও ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগের পর পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে তদন্ত এবং ডিজিটাল সার্ভার অডিট করা হয়। অডিটে দেখা যায়, ১৪ এপ্রিল পৌরসভা থেকে এ ধরনের কোনো ওয়ারিশ সনদ ইস্যু করা হয়নি। সরকারি মূল সার্ভারেও ওই সনদের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
পৌর কর্তৃপক্ষ পরে সনদটি অবৈধ ও অস্তিত্বহীন ঘোষণা করে বাতিল করে। একই সঙ্গে ওই সনদ ব্যবহার করে কেউ যাতে জমি রেজিস্ট্রি বা নামজারি করতে না পারে, সে জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে সতর্কতামূলক চিঠি পাঠানো হয়।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত হাছিনা বেগমকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে হাজির হওয়ার নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি হাজির হননি। বর্তমানে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
পৌর প্রশাসক ও ইউএনও মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে তদন্তে জড়িত কম্পিউটার অপারেটর বা চক্রের অন্য সদস্যদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পুরোনো ভূমি রেকর্ডের দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে জমি দখলের চেষ্টা করে আসছে। ডিজিটাল সনদ ব্যবস্থার নিরাপত্তা জোরদার এবং ভূমি অফিসের কার্যক্রমে কঠোর নজরদারি না থাকলে এ ধরনের জালিয়াতি বন্ধ করা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সময়ের আলো/এসএকে