দিন-রাত নদীতে জাল ফেলে নৌকায় বসে থাকেন জেলেরা। চাতক পাখির মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিশ্রামহীন বসে থাকেন ইলিশের আশায়। কিন্তু মেলে না সেই কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা। তবুও আশায় বসে থাকেন তারা। কারণ, ঋণের কিস্তি পরিশোধের তাড়া আছে। এনজিও থেকে ঋণ, মহাজন/পাইকারদের কাছ থেকে দাদন নেয়া ঋণ যেন উদ্বিগ্ন করে রাখছে জেলেদের।
সুগন্ধা, বিষখালী, হলতা ও গাবখান নদীতে ছড়িয়ে আছে জেলেদের নৌকা। ইলিশের নেশায় তারা তীব্র রোদে নৌকায় বসে পানিতে ভেসে বিশ্রামহীন নদীর বুকে জাল ফেলে চষে বেড়াচ্ছেন। আবার নদীর পাড়ে ঘাটে নৌকা বাঁধা, কোনো নৌকায় শুকাতে দেওয়া হয়েছে ভেজা জাল। জেলেদের ব্যস্ততা থাকার কথা এখন নদীতে—জাল ফেলে ইলিশ ধরায়। কিন্তু বাস্তবতা যেন ভিন্ন। নদীতে জাল ফেলছেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন, নদীর বুক চষে বেড়াচ্ছেন; তবু কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা মিলছে না। দিনভর নদীতে ঘুরে যে পরিমাণ মাছ পাওয়া যাচ্ছে, তাতে নৌকার জ্বালানি, বরফ, জালের খরচসহ দৈনন্দিন ব্যয় মেটানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ মাথার ওপর রয়েছে ঋণের বোঝা। নিয়মিত দিতে হচ্ছে এনজিওর কিস্তি। নৌকা ও জাল কেনা কিংবা মেরামতের জন্য মহাজনের কাছ থেকে নেওয়া দাদনের টাকাও শোধ করতে হবে। সামনে আবার শুরু হবে ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা। ফলে ইলিশের মৌসুম শেষের দিকে এসে ঝালকাঠির সুগন্ধা, বিষখালী, হলতা ও গাবখান নদীর জেলেদের জীবনে আনন্দের বদলে নেমে এসেছে দুশ্চিন্তার কালো মেঘ। তাদের কাছে এখন নদীতে ইলিশের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে ঋণের কিস্তির বোঝা।

ঝালকাঠি সদর উপজেলার পোনাবালিয়া ও দেউরি গ্রামের সুগন্ধা নদীর এবং বাদুরতলা ও চল্লিশকাউনিয়া বিষখালী নদীর পাড়ে গিয়ে জেলেদের সাথে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে নলছিটি উপজেলার মাটিভাঙ্গা এলাকার জেলেদের কাছ থেকেও।
জেলেরা জানান, ইলিশের মৌসুমকে ঘিরে তারা কয়েক মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি নেন। কেউ নৌকা মেরামত করেন, কেউ নতুন জাল কেনেন, আবার কেউ পুরোনো জাল সংস্কার করেন। এসব কাজে প্রয়োজন হয় বড় অঙ্কের টাকা। অনেকের সেই টাকা নিজের হাতে থাকে না। ফলে এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়, আবার অনেকে মহাজনের কাছ থেকে দাদন নেন। তাদের আশা থাকে, মৌসুমে ভালো ইলিশ পাওয়া গেলে মাছ বিক্রির আয় থেকে একদিকে সংসার চলবে, অন্যদিকে ঋণের কিস্তি ও দাদনের টাকা পরিশোধ করা যাবে। কিন্তু এবার সেই হিসাব বারবারই ভুল প্রমাণিত হচ্ছে।
সদর উপজেলার দেউরি গ্রামের জেলে নুরু মিয়ার বয়স ৬৫ বছর। জীবনের প্রায় পুরোটা সময়ই সুগন্ধা ও বিষখালী নদীতে মাছ ধরে কাটিয়েছেন তিনি। নদীর কোন জায়গায় কখন ইলিশের ঝাঁক পাওয়া যায়, কোথায় জাল ফেললে মাছ ওঠার সম্ভাবনা বেশি—দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় এসব তার নখদর্পণে। কিন্তু এবার সেই অভিজ্ঞতাও যেন কাজে আসছে না। নুরু মিয়া বলেন, আমার বয়স ৬৫ বছর। জীবনের প্রায় পুরোটা সময়ই সুগন্ধা আর বিষখালী নদীতে মাছ ধরে কাটিয়েছি। নদীর কোন জায়গায় কখন ইলিশ থাকে, কোথায় জাল ফেললে মাছ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি—এসব অনেক বছরের অভিজ্ঞতা থেকে জানি। কিন্তু এবার নদীর অবস্থা একেবারেই আলাদা। জাল ফেলছি, নদীতে ঘুরছি, কিন্তু আগের মতো ইলিশ পাচ্ছি না। কখনো সারাদিনে যে পরিমাণ মাছ পাই, তা দিয়ে নৌকার তেলের খরচও ঠিকমতো ওঠে না। এই বয়সে নদীতে না নেমে উপায়ও নেই, কারণ মাছ ধরেই সংসার চালাতে হয়। ইলিশের মৌসুমে ভালো মাছ পাব, কিছু টাকা জমাব—এই আশাতেই সারা বছর অপেক্ষা করি। কিন্তু এবার মাছ কম থাকায় খুব দুশ্চিন্তায় আছি। সামনে নিষেধাজ্ঞা শুরু হবে, তখন মাছ ধরতে পারব না। সংসার কীভাবে চলবে, ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ করব—এসব চিন্তাই এখন মাথায় ঘুরছে।

নুরু মিয়ার মতোই নদীতে মাছ ধরেন সংসার চালান আকাব্বর মৃধা। ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে নদীতে মাছ ধরেন তিনি। ইলিশের মৌসুম শুরুর আগে নৌকা ও জাল কেনা এবং মেরামতের জন্য ঋণ করেছিলেন। পরিকল্পনা ছিল, চার-পাঁচ মাস মাছ ধরে আয় করে সেই ঋণ পরিশোধ করবেন। এরপর অবশিষ্ট আয় দিয়ে চলবে সংসার। কিন্তু মৌসুম শেষের দিকে চলে এলেও আশানুরূপ ইলিশ না পাওয়ায় তাঁর সেই হিসাব এখন মিলছে না। মাছ কম, খরচ বেশি—ফলে আয়-ব্যয়ের ব্যবধান প্রতিদিনই বাড়ছে।
আকাব্বর মৃধা বলেন, ইলিশের মৌসুম আসার আগে নৌকা-জাল ঠিক করতে অনেক টাকা খরচ করছি। সেই টাকা নিজের ছিল না, ঋণ করে নিতে হয়েছে। ভেবেছিলাম, মৌসুমে ভালো মাছ পাব, মাছ বিক্রি করে ঋণের টাকা শোধ করব, সংসারও চালাব। কিন্তু নদীতে আগের মতো ইলিশ নেই। সারাদিন নদীতে ঘুরেও অনেক সময় তেমন মাছ পাই না। নৌকার তেল, জাল আর অন্যান্য খরচ বাদ দিলে হাতে তেমন কিছুই থাকে না। এদিকে কিস্তির সময় হয়ে যাচ্ছে। সামনে আবার মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা শুরু হবে। তখন আয় বন্ধ থাকবে, কিন্তু ঋণের কিস্তি তো বন্ধ থাকবে না। এখন বুঝতে পারছি না, কীভাবে ঋণের টাকা শোধ করব আর সংসার চালাব।
বাদুরতলা এলাকার কাদের মাঝি বলেন, বিষখালী নদীতে অনেক বছর মাছ ধরে সংসার চালাই। এই সময়টাতে আমরা ইলিশের আশায় নদীতে নামি। কিন্তু এবার নদীতে জাল ফেলেও আশানুরূপ ইলিশ পাচ্ছি না। সারাদিন নদীতে থাকার পর যে মাছ পাই, তা দিয়ে নৌকার তেল, জাল ও অন্যান্য খরচই ঠিকমতো ওঠে না। অথচ সংসারের খরচ তো আছেই, তার ওপর ঋণের কিস্তি দিতে হচ্ছে। নৌকা-জাল ঠিক করার জন্যও টাকা ধার করেছি। আশা ছিল ইলিশ ধরে সেই টাকা পরিশোধ করব। এখন মাছ কম পাওয়ায় কীভাবে ঋণের টাকা শোধ করব, সেটাই বুঝতে পারছি না। নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে তো নদীতে নামতেও পারব না। তাই সামনে কীভাবে সংসার চলবে, তা নিয়ে খুব চিন্তায় আছি।
কাঁঠালিয়া-বেতাগী সীমান্তসংলগ্ন এলাকার জেলে আখের আলী জানান, এ অঞ্চলের জেলেরা সারা বছর ইলিশের এই মৌসুমটির অপেক্ষায় থাকেন। কারণ বছরের কয়েক মাস ইলিশ ধরেই তাদের বড় একটি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়। তবে এবার সেই আশায়ও যেন ভাটা পড়েছে। নদীতে ইলিশের উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকায় জেলেদের অনেকেই প্রত্যাশিত আয় করতে পারেননি।
আখের আলীর ভাষায়, একদিকে এনজিও ঋণের কিস্তি নিয়মিত দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে মহাজনের কাছ থেকে নেওয়া দাদনের টাকাও পরিশোধ করতে হবে। মাছ কম পাওয়ায় সেই টাকা কীভাবে শোধ করবেন, সেটিই এখন তাদের বড় চিন্তা।
প্রতি বছর জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়কে ইলিশ আহরণের গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। এই সময়ে সুগন্ধা ও বিষখালী নদীতে জাল ফেলেন কয়েকশ জেলে। বছরের এই কয়েক মাসের আয়ের ওপর অনেক পরিবারের বাকি সময়ের জীবনযাত্রা নির্ভর করে। মাছ ধরার আয় দিয়ে পরিবারের খাবার, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, নৌকা ও জালের খরচসহ বিভিন্ন ব্যয় মেটানোর চেষ্টা করেন তারা। কিন্তু চলতি মৌসুমের শুরু থেকেই প্রত্যাশা অনুযায়ী ইলিশ না পাওয়ায় সেই আয়ের পথ সংকুচিত হয়ে এসেছে। জেলেদের ভাষায়, নদীতে মাছ না থাকলে শুধু মাছ বিক্রির আয়ই কমে না; একই সঙ্গে বাড়তে থাকে ধার-দেনা। কারণ নদীতে নামতে হলেও জ্বালানি লাগে, বরফ লাগে, খাবার লাগে এবং নৌকা-জালের রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। মাছ না উঠলে এসব খরচও অনেক সময় উঠে আসে না।
সুগন্ধা নদীর পাড়ে বাঁধা নৌকাগুলো শুধু মাছ ধরার বাহন নয়—এসব নৌকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে শত শত পরিবারের স্বপ্ন, ঋণ, সংসার আর ভবিষ্যৎ। জালগুলো শুধু মাছ ধরার উপকরণ নয়; এগুলো দিয়েই সন্তানদের পড়াশোনা, ঘরের খাবার, চিকিৎসা আর বছরের প্রয়োজনীয় খরচ জোগানোর চেষ্টা করেন জেলেরা। কিন্তু নদীতে যখন ইলিশ কমে যায়, তখন শুধু জেলেদের জালই খালি থাকে না—খালি হয়ে যায় তাঁদের সংসারের হিসাবের খাতাও। সুগন্ধার পাড়ে তাই এখন জেলেদের চোখ নদীর দিকে। তাদের অপেক্ষা এক ঝাঁক ইলিশের জন্য। কারণ সেই ইলিশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঋণের কিস্তি পরিশোধের আশা, দাদনের টাকা শোধ করার চিন্তা এবং পরিবারের আগামী দিনের বেঁচে থাকার হিসাব।
নিষেধাজ্ঞার আগে শেষ আশাটুকুও নদীর দিকে। ইলিশ আহরণের ওপর নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে নদীতে নামতে পারবেন না জেলেরা। তখন মাছ ধরার আয় বন্ধ হয়ে যাবে, কিন্তু তাদের ঋণের কিস্তি বন্ধ হবে না। নৌকা-জালের জন্য নেওয়া দাদনের টাকাও পরিশোধের চাপ থাকবে। এ কারণে নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগে যতটুকু সময় আছে, সেটুকুই এখন জেলেদের শেষ ভরসা। নদীতে ইলিশের ঝাঁক দেখা দিলে হয়ত কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন তারা। কিন্তু নদীতে কাঙ্ক্ষিত মাছ না এলে সামনে আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে বলে আশঙ্কা তাদের।
জেলেদের অভিযোগের সঙ্গে মৎস্য বিভাগের হিসাবেও কিছুটা মিল পাওয়া যাচ্ছে। ঝালকাঠি জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমের জুন থেকে সেপ্টেম্বর—এই চার মাসে জেলায় যে পরিমাণ ইলিশ আহরণ হয়েছে, তা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, দেশের অন্যান্য জেলার নদ-নদীতে এ বছর ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়লেও সেই তুলনায় সুগন্ধা ও বিষখালী নদীতে ইলিশের উপস্থিতি কম। নদীর পানির দূষণ ও পলি জমার কারণে এমনটা হতে পারে বলে ধারণা করছেন তিনি।
সময়ের আলো/এনএন