বগুড়ার আদমদীঘিতে নির্ধারিত বা সাইনবোর্ডযুক্ত বিক্রয়কেন্দ্রে না বসে অন্যত্র সার মজুত ও বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে ডিলারদের বিরুদ্ধে। এমনকি এক এলাকার জন্য বরাদ্দ করা সার অন্য ইউনিয়ন বা বাজারে নিয়ে গিয়ে সাব-এজেন্ট কিংবা অন্য ব্যবসায়ীর দোকান ব্যবহার করে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।
উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এলাকার জন্য সার ডিলার রয়েছেন ২৯ জন। এর মধ্যে ১০ জন বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অনুমোদিত এবং ১৯ জন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) অনুমোদিত ডিলার।
কৃষক ও খুচরা সার ব্যবসায়ীরা যাতে কম সময় ও খরচে কাছাকাছি স্থান থেকে সার সংগ্রহ করতে পারেন, সে জন্য উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি ডিলারদের নিজ নিজ লাইসেন্সের এলাকার বাইরে বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভায় সমন্বয় করে বিক্রয় পয়েন্ট নির্ধারণ করেছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, সমন্বয় করা পয়েন্টে ডিলাররা আদৌ দোকান ও গুদাম স্থাপন করেছেন কি না, সেখানে সার নেওয়া হয়েছে কি না—এ বিষয়ে নিয়মিত তদারকি নেই।
দীর্ঘদিন সরেজমিনে অনুসন্ধান করে সমন্বয় করা পয়েন্টে একাধিক বিসিআইসি ও বিএডিসি ডিলারের দোকান পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে।
সান্তাহার ইউনিয়নের জন্য সমন্বয় করা বিসিআইসি ডিলার মেসার্স রফিকুল ইসলামের কোনো দোকান বা গুদাম ইউনিয়ন এলাকায় পাওয়া যায়নি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই ডিলারের দোকান ও গুদাম পরিচালনা করা হচ্ছে সান্তাহার পৌরসভা শহরের জেলা পরিষদ ডাকবাংলোর পাশের একটি বাড়ি থেকে।
একইভাবে মেসার্স ঈসামনি চাউল কল নামের বিসিআইসি অনুমোদিত ডিলারের সমন্বয় পয়েন্ট কুন্দুগ্রাম ইউনিয়নে হলেও সেখানে তার বিক্রয়কেন্দ্র পাওয়া যায়নি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই ডিলারের সার চাঁপাপুর ইউনিয়নের বাজারের এক সার ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানে নামিয়ে মজুত ও বিক্রি করা হচ্ছে।
চাঁপাপুর বাজারের ওই ব্যবসায়ী ওবায়দুর রহমান ওরফে ওবায় বলেন, সেখানে সার মজুত ও বিক্রির বিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিসারের অনুমোদন রয়েছে কি না, তা তিনি দেখাতে পারেননি। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সার মজুত ও বিক্রির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ডিলার প্রতিষ্ঠানের লেটারপ্যাড, ক্যাশমেমো, সিল ও খাতাপত্রও ব্যবহার করছেন।
চাঁপাপুর ইউনিয়নে সমন্বয় করা নসরতপুরের মেসার্স মঙ্গল চন্দ্র সাহা নামের ডিলারের কিছু পরিমাণ সার চাঁপাপুর বাজারের সোবাহান অ্যান্ড সন্স নামের একটি বিএডিসি ডিলারের দোকানে নামানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই দোকান ব্যবহারের বিষয়ে কৃষি অফিসারের লিখিত অনুমোদন দেখাতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা।
সান্তাহার পৌরসভা এলাকায় সমন্বয় করা বিসিআইসি ডিলার মেসার্স মির্জামল বিশ্বেশ্বর লালের সার পৌরসভা-সংলগ্ন ছাতিয়ানগ্রাম ইউনিয়নের কামারকুড়ি মৌজার একটি চালকলের গুদাম ভাড়া নিয়ে বিক্রয়কেন্দ্র হিসেবে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে ওই স্থানে কৃষকদের সার কিনতে যেতে দেখা যায় না বলে চালকলে থাকা কয়েকজন জানিয়েছেন।
তাদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি তৎপরতা বাড়ার পর পৌরসভা শহরে থাকা ওই ডিলারের নিজস্ব ঘরে সার খালাস, মজুত ও বিক্রি করতে দেখা যাচ্ছে।
কৃষি অফিসের নির্ধারিত পয়েন্ট অনুযায়ী বিএডিসি ডিলার মেসার্স ইদ্রিস ট্রেডার্সের বিক্রয়কেন্দ্র ছাতিয়ানগ্রাম ইউনিয়নের পূর্বঢাকা রোডের পশ্চিম সিংড়া এলাকায়।
ডিলার ইদ্রিস আলী আদমদীঘি হাইস্কুলের ভোকেশনাল শাখার সহকারী শিক্ষক। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তার নামে ডিলারি লাইসেন্স রয়েছে, তবে তিনি কখনো ব্যবসা দেখভাল করেননি। ডিলারির কার্যক্রম পরিচালনা করেন আদমদীঘি সদর উপজেলার শিয়ালশন এলাকার বিএডিসি ডিলার খন্দকার মাহবুব আলম। তার ছেলে খন্দকার জোবায়েরকে ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি কৃষি কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
এ নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন, ডিলার নিজে ব্যবসা পরিচালনা না করলে ম্যানেজার নিয়োগ করে সার ব্যবসা পরিচালনার বিষয়টি কতটা নিয়মসঙ্গত।
নসরতপুরের মেসার্স আরাফাত ট্রেডার্সের সমন্বয় পয়েন্ট চাঁপাপুর ইউনিয়নে। তবে ওই ডিলারের সার কুন্দুগ্রাম বাজারের বিএডিসির বীজ ডিলার ও কীটনাশক ব্যবসায়ী জয়ন্ত সরকারের দোকানে খালাস করা হয় বলে জানা গেছে।
জয়ন্ত সরকার বলেন, কিছুদিন তিনি কৃষি অফিসারকে জানিয়ে সার খালাস ও বিক্রি করেছেন। বর্তমানে ডিলার নিজেই তার নির্ধারিত পয়েন্টে সার মজুত ও বিক্রি করছেন। তবে সরেজমিনে চাঁপাপুর বাজারে গিয়ে ওই ডিলারের দোকানের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
উপজেলা সদরের শিয়ালশন ঠিকানার মেসার্স মা ট্রেডার্সের সমন্বয় পয়েন্ট সান্তাহার ইউনিয়নের ছাতনী বাজারে। সোমবার ও মঙ্গলবার টানা দুই দিন সরেজমিনে গিয়ে নতুন করে নেওয়া দোকানটি বন্ধ পাওয়া যায়।
এ সময় বাজারের ব্যবসায়ী ও কৃষক আবু বক্কর সিদ্দিক, তোফাজ্জল হোসেন, ইউনুস আলীসহ প্রায় অর্ধশত কৃষক বলেন, ছাতনী বাজারে সারের কোনো ডিলার আছে বলে তারা জানেন না। তাদের দাবি, ওই ডিলারের মাধ্যমে আগে কখনো সার কেনাবেচা হয়নি। ফলে তারা কখনো ইউনিয়নের সান্দিড়া বাজারের পাপ্পুর দোকান, আবার কখনো সান্তাহার শহরের রফিক ডিলারের কাছ থেকে সার কিনে আনেন।
একই কথা বলেন ছাতনী বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম খান। তিনি জানান, গত ৮ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার বাজারের উত্তর পাশের শেষ দিকে থাকা এনামুল হকের দোকানে হঠাৎ করে মেসার্স মা ট্রেডার্স নামের বিএডিসি ডিলারের সাইনবোর্ড লাগানো হয়। তার দাবি, সাইনবোর্ডে দেওয়া মোবাইল নম্বরটিও ভুল। ওই দোকানে সার আছে কি না, তা-ও বাজারের অনেকের জানা নেই।
তবে মা ট্রেডার্সের মালিক জান্নাতুল ইসলাম বলেন, তিনি গত এক বছর ধরে ছাতনী বাজারের ওই দোকানে সার মজুত ও বিক্রি করে আসছেন।
নসরতপুর বাজারের মেসার্স তুষার ট্রেডার্স নামের বিএডিসি ডিলারের সমন্বয় পয়েন্ট কুন্দুগ্রাম ইউনিয়নে। তবে সরেজমিনে সেখানে ওই ডিলারের কোনো দোকান পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কিছুদিন কুন্দুগ্রাম বাজারের জয়ন্ত সরকার নামের এক বীজ ডিলার ও কীটনাশক ব্যবসায়ীর দোকানে তুষার ট্রেডার্সের সার খালাস, মজুত ও বিক্রি করা হতো। পরে তাদের মধ্যে বনিবনা না হওয়ায় বর্তমানে নসরতপুর ইউনিয়নের মুরইল বাজারের বিএডিসি অনুমোদিত সার ডিলার মেসার্স তাপস ট্রেডার্সের দোকানকে তুষার ট্রেডার্সের সার খালাস, মজুত ও বিক্রির পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তাপস ও তুষার আপন দুই ভাই। স্থানীয়দের দাবি, তুষার ট্রেডার্সের মালিক সত্যেন্দ্রনাথ দাস তুষার প্রায় আট বছর আগে স্বপরিবারে ভারতের শিলিগুড়িতে চলে গেছেন। তবে তার ভাই এবং বিএডিসির সার ও বীজ ডিলার সব্যসাচী দাস তাপস স্থানীয়দের এ তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন।
এভাবে নির্ধারিত বিক্রয়কেন্দ্রের বাইরে সার মজুত ও বিক্রির অভিযোগ নিয়ে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। একই সঙ্গে ডিলারদের নির্ধারিত পয়েন্টে কার্যক্রম পরিচালনা এবং সার সরবরাহ ব্যবস্থার তদারকি নিয়ে উপজেলা কৃষি বিভাগের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সময়ের আলো/জোই