ডেঙ্গু-হামে বেড়েই চলেছে মৃত্যু

এম মামুন হোসেন

জাতীয়

হামের উপসর্গ ও ডেঙ্গুতে এক দিনে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হামে ১১ জন ও ডেঙ্গুতে ৬ জন মারা

2026-09-24T01:23:37+00:00
2026-09-24T01:27:03+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৯ আশ্বিন ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয়
ডেঙ্গু-হামে বেড়েই চলেছে মৃত্যু
এম মামুন হোসেন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:২৩ এএম  আপডেট: ২৪.০৯.২০২৬ ১:২৭ এএম
ছবি : সংগৃহীত
হামের উপসর্গ ও ডেঙ্গুতে এক দিনে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হামে ১১ জন ও ডেঙ্গুতে ৬ জন মারা গেছেন। এ সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম ও উপসর্গ নিয়ে নতুন করে এক হাজার ২৭০ জন ও ডেঙ্গুতে এক হাজার ৮৬৮ জন ভর্তি হয়েছে। বুধবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের হামবিষয়ক ও ডেঙ্গুবিষয়ক আলাদা প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

টিকা দেওয়ার পরেও হাম ও এ রোগের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন শিশুর প্রাণহানি হচ্ছে। সংক্রমণও কমছে না। কেন মৃত্যু থামছে না? আর সংক্রমণ কেনই বা কমছে না? এই প্রশ্ন উঠছে এখন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মোটা দাগে হামের প্রকোপ না কমার দুটি কারণ বলেছেন। এগুলো হলো— অনেক শিশুর টিকা না পাওয়া এবং হাম মোকাবিলায় ‘গাইডলাইন’ বা নির্দেশিকায় দুর্বলতা। 

গত দুই দশকে এমন চিত্র দেখেনি বাংলাদেশ। টিকা দেওয়ার পর এখন অ্যান্টিবডি যাচাই করা উচিত, আদতেই টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধের প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি তৈরি হলো কি না। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত মাঠে বাস্তবায়ন করা গেলে হামের প্রকোপ এ পর্যায়ে আসত না।

ঢাকা বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে ছয়জন, সিলেটে একজন, চট্টগ্রামে দুজন, খুলনায় একজন ও রংপুরে দুজনের মৃত্যু হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হাম ও হামের উপসর্গে এ পর্যন্ত মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৭৬ জনে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে ১০১ জন ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে এক দিনে এক হাজার ৮৬৮ জন ডেঙ্গু রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।

একসময় হাম নির্মূলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু টিকাদানে ঘাটতি ও নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাতের কারণে হাম রোগের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের মুখে পড়েছে। 


হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে। দেখা দিয়েছে শয্যা ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট। একই সঙ্গে প্রতিদিনই হাম আক্রান্ত শিশুদের হাসপাতালে আসার সংখ্যা বাড়ছে। এপ্রিল থেকে দেশজুড়ে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাতের পর থেকেই শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। ওই সময় রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশ। বিশেষ করে নয় মাসের কম বয়সি শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ এই বয়সে নিয়মিত হাম টিকা দেওয়ার সুযোগ থাকে না।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাব চলছে।

প্রায় ৮ বছর ধরে মৃত্যু তো দূরে থাক, হামে সংক্রমণের সংখ্যা চারশর বেশি হয়নি। এ পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালে হাম দূরীকরণের লক্ষ্য ছিল। আর এ বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালে হাম নির্মূলের সনদ পাওয়া যেত। কিন্তু এবার একেবারে পরিস্থিতি উল্টো হয়ে গেছে। বাংলাদেশ এ বছর হাম সংক্রমণে শীর্ষে উঠে এলেও আগের বছরগুলোয় চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৫ সালে রোগী শনাক্ত হয়েছিল ১৩২ জন, ২০২৪ সালে ২৪৭ জন, ২০২৩ সালে ২৮২ জন, ২০২২ সালে ৩১১ জন।

চলতি বছরের শুরু থেকে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হলেও সে বিষয়ে নজর দেওয়া হয়নি। গত মার্চ থেকে হাম ব্যাপকভাবে বাড়তে শুরু করে। কিন্তু চিকিৎসার ক্ষেত্রেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এপ্রিল থেকে মে মাসজুড়ে চলে গণটিকাদান। কিন্তু সে সময়ও প্রায় ৪০ লাখ শিশু বাদ পড়ে যায়।

টিকাদানে ঘাটতি, সংক্রমণে ঊর্ধ্বগতি : সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে একসময় বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বজুড়ে ছিল আলোচিত। নিয়মিত টিকাদান, জাতীয় ক্যাম্পেইনের কারণে হামসহ এ ধরনের রোগের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব এড়ানো যাচ্ছিল। এখন সংকট দেখা দেওয়ার মূল কারণ হিসেবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় টিকাদানের ঘাটতিকে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যে দেখা যায়, ২০০৬ সালের জাতীয় হাম টিকাদান কর্মসূচিতে ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সি ৩ কোটি ৪২ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল। লক্ষ্যমাত্রার পুরোটাই বা ১০০ শতাংশ অর্জিত হয়েছিল।

২০১০ সালে ফলোআপ ক্যাম্পেইনে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ মাস থেকে ৫ বছর বয়সি ১ কোটি ৮১ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া। সেবারও কভারেজ ছিল ১০০ শতাংশ। ২০১৪ সালে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা কর্মসূচির মাধ্যমে ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সি ৫ কোটি ২৭ লাখ শিশুকে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক হয়েছিল। সেবার কভারেজ ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।

২০২০-২১ সালের পর বিশেষ ক্যাম্পেইন আর হয়নি। এর মধ্যে নিয়মিত টিকাদানের কভারেজও কমতে থাকে। ২০২৫ সালে এ হার ৫৯ শতাংশে নেমে আসে। দেশের বিভিন্ন স্থানে টিকার স্বল্পতাও দেখা দেয়।

জনস্বাস্থ্যবিদ বে-নজীর আহমেদ বলেন, ২০২০ সালে হাম-রুবেলার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির পর ২০২৪ সালেও একই ধরনের কর্মসূচি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি, যা ছিল বড় ভুল। তিনি আরও বলেন, ২০২৫ সালে বছরজুড়ে নিয়মিত টিকাদানেও গাফিলতি ছিল।

চলতি বছর গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু হলে দেখা যায়, প্রায় ৪০ লাখ শিশু এর বাইরে রয়ে গেছে; এটিও বড় ধরনের ভুল। এ কারণেই এখন পাঁচ বছরের বেশি এবং ৯ মাসের কম বয়সি শিশুরাও হামের ঝুঁকিতে পড়েছে। এমনকি বেশি বয়সি মানুষের মধ্যেও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধির সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় সামনে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরজুড়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা করছে। অর্থাৎ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আগামী দুই মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি হয়ে পড়েছে।

দেশে সাধারণত বর্ষা পরবর্তী সময়কে, অর্থাৎ আগস্ট থেকে অক্টোবরকে ডেঙ্গুর ‘পিক সিজন’ বা ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ মৌসুম বলা হয়। অন্যান্য বছরের মতো এ বছরও এই সময়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করছেন, সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও বেশি খারাপ হবে।

এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, কর্মস্থলের কারণে পুরুষরা ঢাকায় আসছে বা শহরে যাচ্ছে এবং টেস্ট করিয়ে দেখছে। কিন্তু নারীরা সেই সুযোগ পাচ্ছেই না। যদি সব ডেঙ্গু রোগী চিহ্নিত করা যেত, তা হলে সংখ্যাটা কাছাকাছি-ই হতো।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. আবদুল আলীম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে এডিস মশা বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। নগরকেন্দ্রিক এডিস মশার প্রজননকাল জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর। কিন্তু এডিস মশা এখন সারা দেশে, সারা বছর প্রার্দুভাব দেখা যাচ্ছে। 

তিনি বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মশক নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষকে সচেতন করার কাজটি আর সেভাবে হচ্ছে না। কিন্তু চেষ্টাটা ধরে রাখতে হবে। এডিস ও কিউলেক্স মশা নিধনের জন্য আলাদা আলাদা কর্মসূচি রাখতে হবে। স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, শিক্ষাসহ সব বিভাগের মধ্যে সমন্বিত একটি উদ্যোগ দরকার, যা এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।


সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে
  বিষয়:   ডেঙ্গু  হাম  বেড়েই চলেছে  মৃত্যু 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: