রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহে বাধা কারিগরি ত্রুটি

রফিক রাফি

জাতীয়

জ্বালানি ও বিদ্যুতের চলমান ঘাটতি থেকে বেরিয়ে আসতে শিগগিরই দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করতে চায় সরকার। সে উদ্যোগ অনুযায়ী

2026-09-24T02:15:33+00:00
2026-09-24T02:15:33+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৯ আশ্বিন ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয়
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহে বাধা কারিগরি ত্রুটি
রফিক রাফি
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:১৫ এএম 
শিগগিরই দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করতে চায় সরকার। ছবি : সংগৃহীত
জ্বালানি ও বিদ্যুতের চলমান ঘাটতি থেকে বেরিয়ে আসতে শিগগিরই দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করতে চায় সরকার। সে উদ্যোগ অনুযায়ী প্রকল্পের কাজ শেষের দিকে। ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৮২.৪ শতাংশ। চলতি বছরই প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার টার্গেট থাকলেও দেখা দিয়েছে কারিগরি জটিলতা। এতে পিছিয়ে গেছে প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর সময়সীমা।

ফলে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই ইউনিটটি কবে নাগাদ উৎপাদনে যাবে তা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউনিট-২-এর প্রেসারাইজার পাইলট অপারেটেড রিলিফ ভালভে (পিওআরভি) ত্রুটি ধরা পড়ে। প্রকৌশলীরা রিঅ্যাক্টর পরীক্ষার পরবর্তী ধাপে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় এ সমস্যা শনাক্ত হয়। ত্রুটির মূল কারণ খুঁজে বের করতে রুট-কজ অ্যানালাইসিস চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা পুনরায় শুরু হবে না।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম গত সপ্তাহে জানিয়েছেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সেফটি ভালভের ত্রুটির কারণে প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর সময়সীমা পিছিয়ে যাচ্ছে। কবে নাগাদ সেফটি ভালভের ত্রুটি মেরামত হবে এবং কবে প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি তিনি।

তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দ্রুত সমস্যা সমাধান করতে কাজ চলছে। শিগগিরই সেফটি ভালভ কেন কাজ করছে না, সেটি নির্ধারণের জন্য রাশিয়া থেকে বিশেষজ্ঞ দল আসবে। তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সমস্যার প্রকৃত কারণ জানা যাবে।


আইএইএর সহায়তা চায় সরকার : রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করতে এখন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সহায়তা চাইছে সরকার।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর ভিয়েনায় আইএইএর মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসির সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি তুলে ধরেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। একই সঙ্গে তিনি পারমাণবিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়ে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরেন।

৮২.৪ শতাংশ কাজ শেষ : আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সার্বিক ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৮২.৪ শতাংশ। তবে দুই ইউনিটের অগ্রগতিতে রয়েছে বড় পার্থক্য। ইউনিট-১ তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকলেও ইউনিট-২ এখনও পরীক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

ইউনিট-১-এ হট ও কোল্ড স্টেট টেস্ট, কন্ট্রোল রড অ্যাসেম্বলি পরীক্ষা এবং ক্রিটিক্যালিটি সংক্রান্ত বিভিন্ন পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। গত এপ্রিলে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বিএনআরএ) ইউনিটটির অপারেটিং লাইসেন্স দেয়। একই মাসে শুরু হয় জ্বালানি লোডিং। তবে এখনও জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়নি। চলতি বছরের শেষ নাগাদ ইউনিট-১ গ্রিডে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।

রুশ ঠিকাদারের কাজেও ধীরগতি : রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়নে নিয়োজিত রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের সহযোগী প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্টও নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী কাজ করতে পারছে না বলে জানিয়েছে আইএমইডি।

পরিদর্শন দল দেখতে পেয়েছে, প্রকল্পের লেভেল-২ সময়সূচির তুলনায় জনবল মোতায়েন ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহে পিছিয়ে রয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি। বিশেষ করে ইউনিট-২-এর কাজ যাতে আরও পিছিয়ে না পড়ে, সে জন্য দ্রুত জনবল বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রকল্প ব্যয় বেড়ে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা

রূপপুর প্রকল্পের ব্যয়ও কয়েক দফা বেড়েছে। ২০১৬ সালে অনুমোদনের সময় প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এর মধ্যে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় ঋণ ছিল ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা এবং সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ছিল ২২ হাজার ৫২ কোটি ৯১ লাখ টাকা।

২০২৫ সালের শেষ দিকে প্রকল্পের ব্যয় আরও ১৩ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা বাড়ানো হয়। এতে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। এরপর ২০২৬ সালের শুরুতে আবারও ব্যয় বাড়িয়ে মোট অনুমোদিত ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা।

সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, মূলত মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে।

জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন কাজও বাকি : প্রকল্পের মূল স্থাপনা নির্মাণের কাজ এগিয়ে গেলেও জমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের কিছু কাজ এখনও শেষ হয়নি। পুনর্বাসন কার্যক্রমের আওতায় প্রায় ১ হাজার ৬৯০ একর জমি রয়েছে। 

প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ক্ষতিপূরণ এবং বিভিন্ন ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজও পুরোপুরি শেষ হয়নি।

রূপপুরের নদী তীরবর্তী এলাকায় একটি বোট ক্লাব ও জেটি-সংক্রান্ত জমি নিয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) সঙ্গে বিরোধ এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। বিষয়টি দ্রুত সমাধানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপের সুপারিশ করেছে আইএমইডি।

নিরাপত্তা ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনাতেও নজর : প্রকল্পের পরিবেশগত পর্যবেক্ষণ ও নিরাপত্তা প্রস্তুতির কিছু কাজ এখনও চলমান। পরিবেশ পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন নিয়মিত হালনাগাদ করা এবং প্রকল্পের কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স প্রোগ্রাম কঠোরভাবে অনুসরণ করার সুপারিশ করেছে আইএমইডি।

এ ছাড়া রূপপুরের আশপাশের ইউনিয়ন পরিষদ, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে স্থানীয় সতর্কতা ও জরুরিভাবে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। ইউনিট-২ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার আগেই এই ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর করার সুপারিশ করা হয়েছে।

গ্রিড ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনাও অসম্পূর্ণ : বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু প্রশাসনিক ও কারিগরি ব্যবস্থা এখনও সম্পন্ন হয়নি। এর মধ্যে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের মধ্যে বিদ্যুৎ ক্রয় সংক্রান্ত ব্যবস্থা রয়েছে।

ইউনিট-২-এর জ্বালানি লোডিংয়ের আগে নতুন পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ ও লাইসেন্স সংক্রান্ত কিছু কাজও বাকি।

দুই ইউনিটে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট : রূপপুর বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। এখানে দুটি ১২০০ রিঅ্যাক্টর রয়েছে, যার প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুই ইউনিট মিলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।

রাশিয়ার রোসাটমের সঙ্গে প্রকল্পের ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি হয় ২০১১ সালে। এরপর ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারের প্রকৌশল, ক্রয় ও নির্মাণ (ইপিসি) চুক্তি হয়। ইউনিট-১ ও ইউনিট-২-এর নির্মাণকাজ শুরু হয় যথাক্রমে ২০১৭ ও ২০১৮ সালে।

প্রকল্পের সামগ্রিক কাজ ৮০ শতাংশের বেশি শেষ হলেও এখন তা নির্মাণ থেকে পরীক্ষা ও বাণিজ্যিক উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করছে। ইউনিট-১ গ্রিডে যুক্ত হওয়ার প্রস্তুতিতে এগিয়ে থাকলেও ইউনিট-২-এর ক্ষেত্রে ভালভের ত্রুটি নিরসন, জনবল ও সরঞ্জাম সরবরাহে গতি আনা এবং বিভিন্ন কারিগরি ও প্রশাসনিক কাজ শেষ করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।


সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে
  বিষয়:   রূপপুর  বিদ্যুৎকেন্দ্র  সরবরাহ  বাধা  কারিগরি ত্রুটি 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: