জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দেওয়া কড়া বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনার মুখে পড়লেও দেশে তার সমর্থকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। আগামী মাসে ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ পার্লামেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে দেওয়া এই ভাষণকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার আগে কয়েক ডজন দেশের প্রতিনিধি হল থেকে বেরিয়ে যান। ইসরায়েলের প্রতি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্রমবর্ধমান বিরোধিতার প্রতীক হিসেবেই এই ওয়াকআউটকে দেখা হয়।
ভাষণে নেতানিয়াহু গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে ‘গণহত্যার বিপরীত’ বলে দাবি করেন। আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংস হওয়ার পরও তিনি এমন মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনাও প্রত্যাখ্যান করেন তিনি।
নেতানিয়াহু আরও দাবি করেন, তার বক্তব্যের সময় প্রতিনিধি দলগুলো হল থেকে বেরিয়ে গেলেও ওই নেতাদের অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে ইসরায়েলকে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকে ‘স্বৈরশাসক’ বলে মন্তব্য করেন নেতানিয়াহু। গাজা যুদ্ধের মধ্যস্থতায় ভূমিকা রাখা কাতারের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তোলেন তিনি। এমনকি নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকেও ইহুদিবিদ্বেষী বলে অভিযুক্ত করেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী।
নেতানিয়াহুর এসব বক্তব্যের জবাবও আসে। ওয়াশিংটনে কাতারি দূতাবাসের উপপ্রধান হামাদ আল-মুফতাহ বলেন, আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে মধ্যস্থতার কাজে যুক্ত একটি দেশকে আক্রমণ করা কোনো সমস্যার সমাধান করে না।
তুরস্কের প্রেসিডেন্টের যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক বুরহানেত্তিন দুরানও নেতানিয়াহুর মন্তব্যকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেন। নিউইয়র্কের মেয়র মামদানিও নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সমালোচনা করেন।
ইসরায়েলি নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও কিংস কলেজ লন্ডনের শিক্ষক অহারন ব্রেগম্যানের মতে, নেতানিয়াহুর ভাষণটি মূলত দেশের ভেতরে তাঁর নির্বাচনী প্রচারণাকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে দেওয়া। তাঁর ভাষণে সমর্থকেরা সন্তুষ্ট হলেও বিরোধীরা নেতানিয়াহুর বক্তব্যে তাঁর পরিচিত রাজনৈতিক ধরনই দেখেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে ইসরায়েলের ডানপন্থী সংবাদপত্র জেরুজালেম পোস্টের সম্পাদক জভিকা ক্লেইনসহ দেশটির কয়েকজন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব নেতানিয়াহুর বক্তব্যের প্রশংসা করেন। সাবেক নেতানিয়াহু-সহযোগী ও ইসরায়েলি জনমত বিশ্লেষক মিচেল বারাকও ভাষণটিকে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শন হিসেবে দেখেছেন।
ভাষণে নেতানিয়াহু দাবি করেন, গত তিন বছর ধরে ইসরায়েল সাতটি ফ্রন্টে লড়াই করেছে। গাজা ছাড়াও হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী, ইরান, ইরাক ও সিরিয়ার বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংঘাতের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
তবে ভাষণে ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধগুলোর সমাপ্তি কীভাবে হবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেননি নেতানিয়াহু। চ্যাথাম হাউসের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক ইয়োসি মেকেলবার্গ বলেন, নেতানিয়াহুর বক্তব্যে অতীতের সামরিক সাফল্য ও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা থাকলেও এসব সংঘাতের শেষ কোথায়, তার কোনো উত্তর ছিল না।
সময়ের আলো/কেএইচ