মাত্র দুদিনের ব্যবধানে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই উপকূলীয় এলাকা থেকে মিয়ানমারে পাচারের সময় মোট ৭৮ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার জব্দ করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। এর মধ্যে গত শুক্রবার মিরসরাইয়ের ইছাখালী ঘাট এলাকায় ট্রাক থেকে ফিশিং বোটে তোলার সময় ৪৮ মেট্রিক টন এবং এর আগের দিন বৃহস্পতিবার সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ঘাটে কার্গো বোটে তোলার সময় ৩০ মেট্রিক টন সার জব্দ করা হয়। এই দুই ধারাবাহিক অভিযানে মোট ৫টি ট্রাক, ২টি বোট এবং ৫ জন পাচারকারীকে আটক করা হয়েছে।
দেশব্যাপী চলমান সার সংকটের আড়ালে সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে দেদার পাচার হচ্ছে কৃষকের ভর্তুকির ইউরিয়া ও টিএসপি সার। মূলত বাংলাদেশে প্রতি বস্তা সার কম দামে পাওয়া গেলেও মিয়ানমারে তা কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রির সুযোগ থাকায় একটি চক্র এই অবৈধ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে বেশ কিছু চালান জব্দ ও পাচারকারী আটক হলেও সিন্ডিকেটের মূল হোতারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ ও রামুসহ বিভিন্ন উপকূলীয় ও সীমান্ত রুট ব্যবহার করে সার পাচারের একাধিক তথ্য সামনে এসেছে। সর্বশেষ গত দুই দিনে সীতাকুণ্ড ও মিরসরাইয়ে অভিযান চালিয়ে ৭৮ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড। এর আগে ভোলা, হালিশহর ও অন্যান্য অঞ্চলেও বড় বড় চালান আটক করা হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশে যে ইউরিয়া সার মাত্র ১২৫০ থেকে ১৩৫০ টাকায় পাওয়া যায়, তা মিয়ানমারে নিয়ে প্রায় ৬ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। এই বিশাল মূল্য ব্যবধানের লোভেই ডিলারদের একটি অসাধু চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এসব সার পাচার করছে।
সার পাচার ও ডিলারদের কারসাজির কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। রাজশাহী, সাতক্ষীরা, টাঙ্গাইল, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের দ্বিগুণ দামে সার কিনতে হচ্ছে কিংবা ডিলারের দোকানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও সার না পেয়ে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও সারের কৃত্রিম সংকটের প্রতিবাদে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভও করেছেন স্থানীয় কৃষকরা।
সার পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই এবং পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। কৃষি সচিব মো. সেলিম খান জানিয়েছেন, ষড়যন্ত্রকারীদের চক্রান্ত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে প্রতিহত করা হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সার সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে। এ ছাড়া নতুন ডিলার নিয়োগ এবং বিকল্প উৎস থেকে সার আমদানির প্রক্রিয়াও চলমান।
সার নিয়ে এই বিশৃঙ্খলা ও কারসাজির পেছনে অতীতে বড় ধরনের দুর্নীতির ইতিহাস রয়েছে। বিসিআইসির তদন্তে ঢাকার পোটন ট্রেডার্স ও চট্টগ্রামের নবাব অ্যান্ড কোম্পানির বিরুদ্ধে হাজার হাজার টন সরকারি সার বাফার গুদামে না পৌঁছে আত্মসাৎ করার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে যা নিয়ে মামলা ও তদন্ত চলমান রয়েছে। কৃষকদের মতে, শুধু গোডাউনে কাগজ-কলমে পর্যাপ্ত সার থাকার হিসাব দেখালেই চলবে না, বরং মাঠপর্যায়ে তার সুফল নিশ্চিত করতে হবে।
সময়ের আলো/আতা