দূর গ্রামের সখীনা বেগম (কল্পিত চরিত্র) দীর্ঘদিন থেকে রোগাক্রান্ত, নানান শারীরিক সমস্যা তাকে জর্জরিত করে তুলেছে। উপজেলা থেকে জেলাতে চিকিৎসা করিয়েছেন দীর্ঘদিন। নিজের পকেট থেকে বিপুল অর্থ খরচ হলেও এখনো সমাধান হয়নি তার শারীরিক সমস্যার। অবশেষে নিজের দুটি গরু বিক্রি করে, এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে স্বামীকে সাথে নিয়ে ঢাকায় এসেছেন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখানোর জন্য।
ডাক্তার রোগটিকে গভীরভাবে বুঝতে এবং এর ইতিহাস বিশ্লেষণে সখীনার বলা কথার সাথে সাথে দেখতে চান আগের করা বিভিন্ন টেস্টের রিপোর্ট, ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন। অনেক ডকুমেন্ট সখীনা সাথে আনলেও, আনেননি অনেক রিপোর্ট। ডাক্তার কিছুটা থামেন, ভাবেন, অবশেষে আবারো এমন কিছু টেস্ট করাতে বাধ্য হন যেগুলি সখীনা জেলা পর্যায়ে আগেই করিয়েছিলেন। পকেটের অর্থ সংকুচিত হয়, নষ্ট হয় সময়। আবার সঠিকভাবে রোগের ইতিহাস জানা ও বিশ্লেষণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
এটি একটি কল্পিত ঘটনার বর্ণনা হলেও আমাদের বাস্তব জীবনে এই ধরণের সমস্যায় বহুবার পড়তে হয়েছে আমাদের অনেককেই। আর জনগণের স্বাস্থ্য বিষয়ক ব্যয়ের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা। ২০২২ সালের বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক গবেষণায় দেখা গেছে বাংলাদেশের মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের ২৭.৫২ শতাংশই খরচ হয় রোগ নির্ণয়ের জন্য স্বাস্থ্যের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পেছনে।
অন্যদিকে, বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের জনগণ চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৭৯.৩১ শতাংশই কিন্তু নিজেদের পকেট থেকে মিটিয়ে থাকে। স্বাস্থ্য সেবায় এই ধরণের নানা সমস্যা সমাধানে এবং আরো উন্নত ও সমন্বিত স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের লক্ষ্যে সরকার ই-হেলথ কার্ড চালুর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। পত্রিকা মারফত জানা গেছে এই ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যেমে রোগের ইতিহাস, সকল মেডিক্যাল টেস্টের রিপোর্ট, ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অর্থাৎ ধারাবাহিক চিকিৎসার তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকবে। এর ফলে সহজ হতে পারে চিকিৎসা সেবা প্রাপ্তি, সাশ্রয় হতে পারে চিকিৎসার জন্য পকেটের অর্থ। আরো ব্যাপকভাবে বললে বলা যায় গড়ে উঠতে পারে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার ভিত্তি।
বর্তমান সরকার তার ”সবার জন্য স্বাস্থ্য” নীতির আওতায় প্রথম পর্যায়ে বগুড়া, নরসিংদী, সিরাজগঞ্জ, খুলনা, ঝালকাঠি ও নোয়াখালী এই ছয় জেলায় ই-হেলথ কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর জন্য বর্তমান অর্থ বছরে প্রায় ১৬২ কোটি টাকা বরাদ্দও রাখা হয়েছে। সম্প্রতি সংসদে স্বাস্থ্য মন্ত্রী মহোদয় জানিয়েছেন, ই-হেলথ কার্ড চালু এবং স্বাস্থ্য খাতে ডিজিটাল অটোমেশনের লক্ষ্যে সরকার গৃহীত, “প্রজেক্ট রেডিনেস অ্যাক্টিভিটিজ এন্ড পাইলটিং ফর হেলথ সেক্টর ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশণ প্রোগ্রাম ইন বাংলাদেশ” প্রকল্পটি স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের চূড়ান্ত পর্যালোচনাধীন রয়েছে। হয়তো খুব শিঘ্রই আমরা মাঠ পর্যায়ে এই প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন হতে দেখবো।
ভালো কথা, ই-হেলথ কার্ড হলো, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সখীনা কী একটি কার্ড পেলেই পাবে সঠিক চিকিৎসা তার উপজেলা, জেলা বা পছন্দমত সেবা প্রতিষ্ঠানে?
বলা হচ্ছে ই-হেলথ কার্ড তার মানে নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেটের সংযোগ দরকার এই কার্ডটিকে ব্যবহার করার জন্য। এখন, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেটের গতি কম, বিদ্যুৎ নাই, সার্ভার ডাউন এমন নানাবিধ কারণে কার্ড ব্যবহার করা যাচ্ছে না এই কারণে স্বাস্থ্য সেবা যেন বিঘ্নিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজননে অনলাইনের পাশাপাশি জরুরী ব্যবস্থা হিসেবে অফলাইনেও সেবা চালু রাখতে হবে। মানুষ যেন ইন্টারনেট বা বিদ্যুৎ সমস্যারমত প্রযুক্তিগত জটিলতার জন্য স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেটি নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরী। অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন করতে যেয়ে অনেক মানুষকে এই ধরণের নানা ভোগান্তির শিকার হতে হয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকেইে ই-হেলথ কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই ধরণের আশঙ্কা তৈরী হওয়া স্বাভাবিক।
আবার যেখানে সিঙ্গাপুরের মত উন্নত ডিজিটাল ব্যবস্থার দেশে জনগণের স্বাস্থ্য বিষয়ক ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার ঘটনা আছে, সেখানে আমাদের তথ্য সুরক্ষিত থকবেতো? এই দেশে কিন্তু, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের মত অত্যন্ত ব্যক্তিগত তথ্য পাচারের অভিযোগ রয়েছে বিগত সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। কাজেই কারা তথ্যে প্রবেশাধিকার পাবেন তা আগেরই নির্ধারণ করতে হবে এবং এর বিচ্যুতি হলে কে দায় নিবে তাও স্পষ্ট থাকতে হবে।
আবার কার্ড থাকার পরেও যদি কাঙ্খিত সেবা না পাওয়া যায়, সঠিক ওষুধ না পাওয়া যায় তাহলে অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি কী হবে? দেশে অনলাইন ভিত্তিক অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (https://www.grs.gov.bd/) চালু থাকলেও এই ব্যবস্থা একজন সাধারণ নাগরিকের জন্য কতটা সহজ ও দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করতে পারছে সেটিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। নাগরিকের অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং প্রামাণ সাপেক্ষে সেই অভিযোগের দ্রুত প্রতিকার এবং প্রয়োজনে ব্যবস্থার পরিবর্তনও করতে হবে।
যদি কার্ডটি হারিয়ে যায় তাহলে কী সহজেই এটি উদ্ধার করা যাবে? যদি উদ্ধার করার আগেই কেউ অসুস্থ হয় তাহলে তার চিকিৎসার কী হবে? একইভাবে, এই কার্ড কি সব সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতাল, চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বার সবক্ষেত্রে সহজেই ব্যবহার করা যাবে এবং সব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানেই কি এর সহজ প্রবেশাধিকার থাকবে?
প্রান্তিক জনগোষ্ঠিসহ অনেকের ডিজিটাল স্বাক্ষরতার ঘাটতি রয়েছে, অনেকের স্মার্ট ফোন নেই, ইন্টারনেট কানেক্টিভিটির ক্ষেত্রেও সমস্যা আছে, সেইসব ক্ষেত্রে ই-হেলথ কার্ড নতুন কোন বৈষম্য তৈরী না করে তাও ভাবতে হবে।
কার্ডে তথ্য সংরক্ষিত থাকবে ভালো কথা, কিন্তু, সেবা গ্রহীতা চাইলেই কি সহজেই নিজের বা পরিবারে সদস্যদের তথ্য দেখতে পারবে এবং এর অনুলিপি নিতে পারবে? নিজের স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্যে নাগরিকের অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ কতটা থকাবে তাও স্পষ্ট করতে হবে। শুধু উৎকণ্ঠা থেকেই প্রশ্নগুলি করা। আরেকটি উৎকণ্ঠা রয়েছে, তবে জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদে বক্তেব্যে প্রধানমন্ত্রী সেই উৎকণ্ঠা দূর করা পরিকল্পনা ব্যক্ত করেছেন। সেটি হচ্ছে ভবিষ্যতে সকল কার্ড এর সমন্বয়ে ইউনিভার্সাল কার্ড এর প্রচলন করা।
তবে বিভিন্ন সেবার তথ্য কীভাবে নিরাপদে সমন্বিত হবে, সেটিও এখন থেকে ভাবতে হবে। সঠিক সমন্বয়ের মাধ্যমে ইউনির্ভাসাল কার্ড করা গেলে হয়তো ভালোই হবে। এত এত কার্ড সংরক্ষণ করা অনেকের জন্যই কষ্টকর হতে পারে। ইউরোপের দেশ এস্তোনিয়া ইউনিভার্সাল কার্ড ব্যবহার করে থাকে। এস্তোনিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শেখার সুযোগ রয়েছে। উল্লেখ্য, বর্তমানে এস্তোনিয়ার ই-গভর্নেন্স একাডেমির সাথে সরকারের ই-গভর্নমেন্ট ও ডিজিটাল পাবলিক সার্ভিস শক্তিশালী করার বিষয়ে একটি প্রকল্প চলামান রয়েছে।
জনগণের উৎকণ্ঠা কমতে পারে যদি পাইলট প্রকল্পে নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপ স্বচ্ছতার সাথে বাস্তবায়িত হয়। অবাধ তথ্য প্রবাহের মাধ্যেমে যদি সহজেই যেকোন নাগরিক এর সকল ধাপ সম্পর্কে জানতে পারে, মতামত দিতে পারে, এবং অভিযোগ থাকলে জানাতে পারে। অভিযোগ শুধু জানাতে পারলেই হবে না, একইসাথে সেই অভিযোগের প্রতিকার ব্যবস্থা থাকাও জরুরী। ভালো হয় যদি, চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, ডিজিটাল সার্ভিস এবং কম্পিউটার সাইন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের বিশেষজ্ঞ, আইনজ্ঞ, নাগরিক প্রতিনিধি, সাংবাদিক প্রতিনিধির সমন্বয়ে একটি বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক পরামর্শ কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির কাজ হবে পাইলট প্রকল্পের বাস্তবায়ন পর্যালোচনা সাপেক্ষে সরকারকে পরামর্শ দেওয়া এবং জনগণকে হেলথ কার্ডের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অবহিত করা। সেই সাথে জনগণের মতামত ও পরামর্শও সরকারের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
সরকার চাইলে স্বাস্থ্য বিষয়ে কাজ করে এমন নাগরিক সংগঠনকগুলোকেও পাইলট প্রকল্পের কাজের সাথে সম্পৃক্ত করতে পারে যারা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, কার্ড রেজিস্ট্রেশন, জনগণের অভিযোগ ও পরামর্শ গ্রহণ এবং জনগণের মতামত কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়া অর্থাৎ জনগণ ও পাইলট প্রকল্পের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ ও মতামত বিনিময়ের সেতু হিসেবে কাজ করতে পারে।
ই-হেলথ কার্ডের আসল মাহাত্ম্য কে পেল বা কতজন পেল তার মধ্যে না। এর মাহাত্ম্য রয়েছে একজন সখীনা উপজেলা, জেলা হয়ে ঢাকায় চিকিৎসার জন্য আসলে তার চিকিৎসার তথ্য কতটা নিরাপদ ও ধারাবহিকভাবে তার সাথে গেলো, সে কতটা উন্নত, নিরাপদ, ও সাশ্রয় মূল্যে কার্যকর সেবা পেল তার মধ্যে রয়েছে। পাইলট প্রকল্প যদি সঠিকভাবে সখীনা ও তার মত হাজারো সেবা গ্রহীতা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত ও পরামর্শ গ্রহণ করে এর যাবতীয় সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে জাতীয় পর্যায়ে একটি নিরাপদ ও সমন্বিত ই-হেলথ কার্ড কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলেই এই উদ্যোগ সত্যিকার অর্থে সফল হবে। তখন ই-হেলথ কার্ড শুধু একটি ডিজিটাল কার্ড হয়ে থাকবে না, বরং হয়ে উঠতে পারে উন্নত ও সর্বজনীন স্বাস্থ্য সেবার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।
লেখক : প্রোগ্রাম ম্যানেজার, বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ, ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ড স্কুল অফ পাবলিক হেলথ
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/টিকে