আশির দশকের শেষভাগে ইতালির ফুটবলে যেন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। সেই সময় এসি মিলানের আকাশে একসঙ্গে জ্বলে উঠেছিল তিন ডাচ তারকা—মার্কো ভ্যান বাস্তেন, রুড গুলিত ও ফ্র্যাঙ্ক রাইকার্ড। তাদের পায়ের জাদুতে সান সিরো হয়ে উঠেছিল ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম আলোচিত মঞ্চ।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ইতালিয়ান সিরি আ ছিল তারকায় ঠাসা। রবার্তো বাজ্জিও, গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, জিয়ানফ্রাঙ্কো জোলা ও জুসেপ্পে সিনোরিদের মতো তারকাদের ভিড়েও আলাদা করে আলো ছড়িয়েছিলেন মিলানের এই তিন ডাচ ফুটবলার।
১৯৮৭ সালে আয়াক্স থেকে মিলানে পাড়ি জমান মার্কো ভ্যান বাস্তেন। অসাধারণ ফিনিশিং, গতি আর বক্সের ভেতর দুর্দান্ত উপস্থিতির কারণে দ্রুতই তিনি হয়ে ওঠেন দলের অন্যতম প্রধান অস্ত্র। একই বছর মিলানে যোগ দেন রুড গুলিত। শক্তি, গতি ও বহুমুখী দক্ষতায় তিনি মাঝমাঠ থেকে আক্রমণভাগ পর্যন্ত প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতেন।
মিলানে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই পিসার বিপক্ষে গোল করে অভিষেক রাঙান ভ্যান বাস্তেন ও গুলিত। এরপর ধীরে ধীরে মিলানের নতুন যুগের ভিত্তি শক্ত হতে থাকে। ডিফেন্সে পাওলো মালদিনি ও আলেসান্দ্রো কোস্তাকুর্তাদের দৃঢ়তার সঙ্গে গুলিত ও রাইকার্ডের মতো খেলোয়াড়দের উপস্থিতি দলটিকে ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দলে পরিণত করে। দিয়েগো ম্যারাডোনার নাপোলির মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ফেলে আসে একের পর এক সাফল্য।
১৯৮৮ সালে এই ডাচ ত্রয়ী পূর্ণতা পায়। দলে যোগ দেন ফ্র্যাঙ্ক রাইকার্ড। মূলত ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে খেললেও তার প্রভাব ছিল পুরো দলজুড়ে। রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি আক্রমণের সূচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন তিনি। মিলানের মাঝমাঠের অন্যতম ভরসায় পরিণত হন রাইকার্ড।
একই বছর নেদারল্যান্ডস ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জেতে। আর ১৯৮৮ সালের ব্যালন ডি'অরের সেরা তিনের তালিকাতেই জায়গা করে নেন ভ্যান বাস্তেন, গুলিত ও রাইকার্ড। ডাচ ফুটবলের এই স্বর্ণযুগের প্রতিচ্ছবি যেন ফুটে উঠেছিল তাদের ব্যক্তিগত সাফল্যেও।
মিলানের হয়ে এই ত্রয়ীর সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়গুলোর একটি ছিল ইউরোপীয় সাফল্য। ১৯৯০ সালে চ্যাম্পিয়ন্স কাপের ফাইনালে মিলানের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তারা। ইউরোপীয় ফুটবলে নিজেদের আধিপত্যের আরেকটি প্রমাণ দেয় ইতালিয়ান ক্লাবটি।
তবে কোনো রূপকথাই চিরস্থায়ী হয় না। ১৯৯৩ সালে দীর্ঘদিনের চোটের কারণে অকালেই ফুটবল থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হন ভ্যান বাস্তেন। গুলিত পরে পাড়ি জমান সাম্পদোরিয়ায়। আর রাইকার্ড ফিরে যান নিজের শৈশবের ক্লাব আয়াক্সে।
সময় পেরিয়ে গেছে, বদলে গেছে ফুটবলের অনেক কিছু। কিন্তু মিলানের সমর্থকদের স্মৃতিতে এখনো অমলিন সেই তিন ডাচ তারকার যুগ। ভ্যান বাস্তেনের গোল, গুলিতের শক্তি আর রাইকার্ডের ভারসাম্যে গড়া সেই দল আজও ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের এক স্বর্ণালি অধ্যায়ের নাম।
সময়ের আলো/টিকে