জ্যোতিদের উন্নতিই হেম্পের মূল লক্ষ্য

মেহেদী হাসান

খেলা

বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটে নতুন একটা সময়ের শুরু। সামনে অপেক্ষা করছে অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। আর সেই চ্যালেঞ্জের ঠিক আগেই দলের

2026-10-03T00:04:47+00:00
2026-10-03T00:04:47+00:00
 
  শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬,
১৮ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
খেলা
জ্যোতিদের উন্নতিই হেম্পের মূল লক্ষ্য
মেহেদী হাসান
প্রকাশ: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০৪ এএম 
ডেভিড হেম্প। ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটে নতুন একটা সময়ের শুরু। সামনে অপেক্ষা করছে অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। আর সেই চ্যালেঞ্জের ঠিক আগেই দলের দায়িত্বে নতুন করে ফিরেছেন ডেভিড হেম্প। সারওয়ার ইমরানের বিদায়ের পর জাতীয় নারী দলের প্রধান কোচের দায়িত্ব পাওয়া হেম্পের সামনে তাই শুধু একটি সিরিজ নয়, বরং একটি দলকে নতুনভাবে গড়ে তোলার বড় দায়িত্ব।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের সঙ্গে হেম্পের পরিচয় অবশ্য নতুন নয়। কয়েক বছর ধরে দেশের বিভিন্ন দলের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। কখনো নির্দিষ্ট কোনো দলের সঙ্গে, কখনো ভিন্ন ভিন্ন সেটআপে। সেই অভিজ্ঞতাই তাকে বাংলাদেশ ক্রিকেটের আরও বড় পরিসরের মানুষের সঙ্গে পরিচিত করেছে। সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশ তার কাছে কেবল কর্মস্থল থাকেনি, হয়ে উঠেছে অনেকটা দ্বিতীয় বাড়ি। ‘হ্যাঁ, গত কয়েক বছর বাংলাদেশে থাকা এবং সেখানে কাজ করার কারণে অবশ্যই আমার কাছে দ্বিতীয় বাড়ির মতো মনে হয়। এ সময়ে শুধু একটি নির্দিষ্ট দলের সঙ্গে নয়, বিভিন্ন দলের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। ফলে আরও বড় একটি পরিসরের মানুষের সঙ্গে আমার যোগাযোগ তৈরি হয়েছে।’

এবার সেই পরিচিত ক্রিকেট সংস্কৃতির মধ্যেই নতুন দায়িত্ব। নারী দলের কোচ হিসেবে তার প্রথম বড় পরীক্ষা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক ওয়ানডে সিরিজ। ব্রিসবেনে দলের সঙ্গে যোগ দেবেন তিনি। তার আগেই সময়ের আলোর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় নিজের ভাবনা, দলের পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ নিয়ে কথা বলেছেন হেম্প।

সাম্প্রতিক এশিয়া কাপ ও এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের ব্যাটিং পারফরম্যান্স নিয়ে আলোচনা হয়েছে বিস্তর। কোথায় ঘাটতি ছিল, কী ভুল হয়েছে, কেন প্রত্যাশিত পারফরম্যান্স আসেনি, এমন প্রশ্নও উঠেছে। কিন্তু হেম্প সেই আলোচনায় অতীতের বিচারক হতে চান না। কারণ ওই সময় তিনি দলের সঙ্গে ছিলেন না।

তার চোখ বরং সামনে। নতুন দায়িত্বে তার প্রথম কাজ দলকে আরও ভালোভাবে বোঝা, কোথায় উন্নতির প্রয়োজন তা খুঁজে বের করা এবং সেখান থেকেই একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া তৈরি করা। ‘আমি সেখানে ছিলাম না, তাই ওই পারফরম্যান্সগুলো নিয়ে নির্দিষ্টভাবে মন্তব্য করা আমার জন্য কঠিন। তবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে দলের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে কাজ করা, কোথায় আমাদের উন্নতি প্রয়োজন তা মূল্যায়ন করা এবং কোন জায়গাতে আরও বিবর্তন দরকার তা চিহ্নিত করাই হবে মূল লক্ষ্য। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আরও ধারাবাহিকতা তৈরি করা এবং দল হিসেবে আমাদের উন্নতি অব্যাহত রাখা।’

হেম্পের কথায় ‘উন্নতি’ শব্দটি বারবার ফিরে আসে। তবে সেটি শুধু ফলাফলের উন্নতি নয়, খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত উন্নতি, দলের সংস্কৃতি, আত্মবিশ্বাস এবং নিজেদের মানদণ্ডকে উঁচু করার মধ্য দিয়েই তিনি পরিবর্তন দেখতে চান। একটি দলকে বদলে দিতে হলে শুধু কৌশল বদলালেই হয় না। প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তনও। হেম্পের দর্শন অনেকটাই সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে। বাইরের পরিস্থিতি, প্রতিপক্ষ কিংবা ফলাফল সবসময় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু নিজেদের প্রস্তুতি, পরিশ্রম এবং মানসিকতা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

মনোযোগ দিতে হবে আমরা কীভাবে বিবর্তিত হতে পারি এবং আরও ভালো করতে পারি, ব্যক্তিগতভাবে এবং দল হিসেবে। আমাদের নিয়ন্ত্রণে যেটুকু আছে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যা করি, সবকিছু যদি এই মানসিকতা নিয়ে করি, উন্নতি ও বিকাশের দিকে পরিষ্কার মনোযোগ রাখি, তাহলে দল হিসেবে আরও ধারাবাহিকতা ও আত্মবিশ্বাস তৈরির সবচেয়ে ভালো সুযোগ পাব বলেন হেম্প। এখানেই হেম্পের পরিকল্পনার মূল সুর। রাতারাতি পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নয়, বরং নিয়মিত কাজের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে একটি উন্নত দল তৈরি করা।

নতুন কোচ হিসেবে নিজের প্রথম বড় পরীক্ষার জন্য এর চেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ হয়তো কল্পনা করাও কঠিন। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ। পরিসংখ্যানের বিচারে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের সেরা দল। তাদের দলে রয়েছে ব্যাটিং ও বোলিং, দুই বিভাগেই মানসম্পন্ন ক্রিকেটার।

কিন্তু হেম্পের কাছে এই সিরিজ শুধু কঠিন পরীক্ষার নাম নয়। এটি শেখারও বড় সুযোগ। ‘পরিসংখ্যানের দিক থেকে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের সেরা দল এবং তাদের দুই বিভাগেই মানসম্পন্ন খেলোয়াড় রয়েছে। তাই নিঃসন্দেহে এটি আমাদের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ। তবে একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী একটি দলের বিপক্ষে নিজেদের পরীক্ষা করার এটি দারুণ সুযোগও।’

এই সিরিজে জয়-পরাজয়ের হিসাবের বাইরেও অনেক কিছু খুঁজে নিতে চান হেম্প। বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা বড় মঞ্চে নিজেদের কোথায় দাঁড় করাতে পারছেন, কোন দক্ষতাগুলো ভালোভাবে প্রয়োগ করতে পারছেন এবং কোন জায়গায় আরও কাজ প্রয়োজন, অস্ট্রেলিয়া সফর সেসবের বাস্তব চিত্র তুলে ধরবে।

‘এমন মানের একটি দলের বিপক্ষে খেলা সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেবে, আমরা কোন কাজগুলো ভালো করছি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন জায়গাতে আমাদের উন্নতি করতে হবে। এই সিরিজ থেকে পাওয়া তথ্য ও অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হবে, কারণ আমরা দল হিসেবে আরও বিবর্তিত, উন্নত এবং আরও ধারাবাহিক হতে চাই।’ হেম্পের কোচিং দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া। কোচ সব সমস্যার সমাধান করে দেবেন, এমন ধারণায় বিশ্বাসী নন তিনি। বরং খেলোয়াড়কে নিজের খেলাটার দায়িত্ব নিতে হবে। কোচের কাজ হলো সেই যাত্রায় সহায়তা করা।

বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের সঙ্গে আগে কাজ করার কারণে অনেককেই তিনি চেনেন। ফলে নতুন করে সম্পর্ক তৈরির চ্যালেঞ্জটাও কিছুটা সহজ হবে তার জন্য। ‘আমার ভূমিকা হলো দল ও ব্যক্তিগত খেলোয়াড়দের সেরা অবস্থানে পৌঁছাতে সহায়তা করা। এর আগে তাদের সঙ্গে কাজ করেছি, তাই তারা জানে আমি কীভাবে কোচিং করি। তারা এটাও জানে যে, আমি আমার জায়গা থেকে যতটা সম্ভব করব। তবে বিষয়টি তাদের নিয়েও। তারা কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং নিজেদের খেলাকে এগিয়ে নিতে কতটা কাজ করে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।’

অর্থাৎ কোচিং স্টাফের নির্দেশনার পাশাপাশি খেলোয়াড়দের নিজের সিদ্ধান্ত এবং পরিশ্রমও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিজের দক্ষতার ওপর আস্থা তৈরি না হলে মাঠের পারফরম্যান্সেও সেই ঘাটতি থেকে যায়। হেম্পের কাছে ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় কোনো ঘোষণা দেওয়ার চেয়ে প্রক্রিয়াটা ঠিক রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দুই বছর পর বাংলাদেশ নারী দল ঠিক কোন অবস্থানে থাকবে, সেটি এখনই নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। কারণ শুধু বাংলাদেশ নয়, প্রতিটি দলই একই সময়ে নিজেদের উন্নত করার চেষ্টা করছে।

‘দুই বছর পর আমরা ঠিক কোথায় থাকব, সেটা বলা কঠিন। কারণ প্রতিটি দলই একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে এবং উন্নতির জন্য সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করছে। আমরা যেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, সেটা হলো আমাদের নিজেদের উন্নতি, আমাদের মানদণ্ড এবং আমরা কতটা ধারাবাহিকভাবে কাজ করছি। আমরা যদি এসব জায়গায় উন্নতি করতে থাকি, তাহলে আশা করি আরও উঁচু পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো শক্ত অবস্থানে যেতে পারব।’

তার এই বক্তব্যে ভবিষ্যতের একটা রূপরেখা অবশ্য স্পষ্ট। উন্নতি করতে হবে, নিজেদের মানদণ্ড বাড়াতে হবে এবং সেই উন্নতিকে ধারাবাহিক করতে হবে। ফলাফল তখন সেই প্রক্রিয়ারই প্রতিফলন হয়ে আসবে।

বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটের দায়িত্ব পুরোপুরি নিজের হাতে থাকলে কোথায় প্রথম পরিবর্তন আনতেন হেম্প? তার উত্তরটিও বেশ সরল, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। অনুশীলনের অভ্যাস এবং প্রত্যেক খেলোয়াড়ের নিজের খেলা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা। কারণ অনুশীলনে যে প্রস্তুতি তৈরি হয়, সেটিই শেষ পর্যন্ত ম্যাচে আত্মবিশ্বাসে রূপ নেয়।

‘অনুশীলনের অভ্যাস এবং ব্যক্তিগত খেলায় পরিষ্কার ধারণা থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি ভালোভাবে করা গেলে খেলোয়াড়দের নিজের ওপর আস্থা তৈরি হয়, যা বেশিরভাগ সময় তাদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে খেলতে সাহায্য করে। আর এটাই সহজ সত্য, সব কোচই চান খেলোয়াড়রা নিজের দক্ষতার ওপর আস্থা রেখে সেই দক্ষতাকে কাজে লাগাক।’ হেম্পের কথায় তাই বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের সামনে কোনো জাদুর ফর্মুলা নেই। আছে নিয়মিত অনুশীলন, নিজের খেলা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা, নিজেদের ওপর বিশ্বাস এবং প্রতিদিন একটু একটু করে ভালো হওয়ার চেষ্টা।

অস্ট্রেলিয়া সফর সেই নতুন যাত্রার প্রথম বড় পরীক্ষা। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তিন ম্যাচের সিরিজে ফল যা-ই হোক, হেম্পের চোখে গুরুত্বপূর্ণ হবে শেখার জায়গাগুলো চিহ্নিত করা এবং সেখান থেকে পরবর্তী ধাপের প্রস্তুতি নেওয়া।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা
  বিষয়:   বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট  অস্ট্রেলিয়া  শক্তিশালী  প্রতিপক্ষ  ডেভিড হেম্প  জাতীয় নারী দল  প্রধান কোচ  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: