মধুর ঘরে প্লাস্টিক, কৌশল পাল্টে বাঁচার লড়াই মৌমাছির

সময়ের আলো ডেস্ক

বিবিধ

মধু রাখার ঘর বানাতেও যে মৌমাছি পরিস্থিতি বুঝে কৌশল বদলাতে পারে, নতুন এক গবেষণায় মিলেছে তার চমকপ্রদ প্রমাণ। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরা

2026-10-03T03:48:48+00:00
2026-10-03T03:48:48+00:00
 
  শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬,
১৮ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
বিবিধ
মধুর ঘরে প্লাস্টিক, কৌশল পাল্টে বাঁচার লড়াই মৌমাছির
প্রাণ-প্রকৃতির পরিবর্তন
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৪৮ এএম 
সংগৃহীত ছবি
মধু রাখার ঘর বানাতেও যে মৌমাছি পরিস্থিতি বুঝে কৌশল বদলাতে পারে, নতুন এক গবেষণায় মিলেছে তার চমকপ্রদ প্রমাণ। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরা দেখেছেন, ভোমরাজাতীয় এক ধরনের মৌমাছি অচেনা কৃত্রিম উপাদান দিয়েও খাবার সংরক্ষণের পাত্র ব্যবহার, মেরামত ও পরিবর্তন করতে পারে। এমনকি অসম্পূর্ণ পাত্রও নিজেরাই শেষ করেছে তারা। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Current Biology-তে।

গবেষণায় Bombus impatiens প্রজাতির ভোমরা নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। ভোমরার বাসায় মধু বা তরল খাবার জমিয়ে রাখার জন্য যে পাত্র তৈরি করা হয়, সেটিকে বলা হয় ‘হানিপট’। মৌমাছির পরিচিত চাকের মতো ভোমরার বাসা সাধারণত খুব নিয়মমাফিক বা একই নকশায় তৈরি হয় না। কোথাও পাত্র বড়, কোথাও ছোট; কোথাও আবার একাধিক পাত্র পাশাপাশি থাকে। এই স্বাভাবিক বৈচিত্র্যই বিজ্ঞানীদের ভাবায়— নতুন কোনো পরিস্থিতিতে পড়লে ভোমরা কি নিজের নির্মাণপদ্ধতিও বদলাতে পারে?

উত্তর খুঁজতে গবেষকরা ৩-ডি প্রিন্টিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃত্রিম হানিপট তৈরি করেন। কিছু পাত্র ছিল পুরোপুরি তৈরি। আবার কিছু পাত্র ইচ্ছা করেই অসম্পূর্ণ রাখা হয়। অর্থাৎ সেগুলো ব্যবহারযোগ্য করতে হলে বাকি কাজ করতে হতো মৌমাছিদেরই।

পরীক্ষায় দেখা যায়, তারা সম্পূর্ণ কৃত্রিম পাত্র সহজেই ব্যবহার করেছে। কিন্তু অসম্পূর্ণ পাত্র নিয়ে তাদের আচরণ ছিল আরও আকর্ষণীয়। তারা নিজেরাই ওই কাঠামোর বাকি অংশ তৈরি করে কার্যকর খাবার রাখার পাত্রে পরিণত করেছে। সব পাত্র একইভাবে তৈরি হয়নি, বরং প্রয়োজন অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন আকৃতি ও কাঠামো তৈরি হয়েছে।

গবেষকরা আরও দেখেছেন, একটি পাত্র তৈরির কাজ শুধু একটি মৌমাছিই শেষ করেনি। একাধিক ভোমরা পালা করে একই হানিপটে কাজ করেছে। একটি মৌমাছি কোনো অংশে কাজ করার পর অন্যটি এসে সেটি আবার বদলেছে বা মেরামত করেছে। আবার একই সময়ে একাধিক হানিপট নিয়েও কাজ করেছে কিছু মৌমাছি। ফলে তাদের নির্মাণকাজ কোনো নির্দিষ্ট ছকে আটকে ছিল না।

সবচেয়ে মজার আচরণগুলোর একটি ছিল কাঠামো ভেঙে আবার ব্যবহার করা। কোনো অংশ প্রয়োজন অনুযায়ী বদলানো দরকার হলে ভোমরা সেটি খুলে ফেলেছে, উপাদান সরিয়েছে এবং অন্য জায়গায় ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ একবার কোনো অংশ তৈরি হয়ে গেলেই সেটিকে চূড়ান্ত হিসেবে ধরে নেয়নি তারা। প্রয়োজন হলে পুরোনো কাঠামো ভেঙে নতুনভাবে সাজিয়েছে।

বিজ্ঞানীদের কাছে আচরণের গুরুত্ব শুধু এই কারণে নয় যে, মৌমাছি প্লাস্টিক ব্যবহার করতে পেরেছে। আসল বিষয় হলো, নতুন পরিস্থিতিতে ভোমরা নিজের আচরণ বদলাতে পারে কি না। প্রাণীর আচরণবিজ্ঞানে এই ক্ষমতাকে বলা হয় ‘বিহেভিয়ারাল ফ্লেক্সিবিলিটি’ বা আচরণগত নমনীয়তা। সহজভাবে বললে, পরিবেশ বা পরিস্থিতি বদলালে প্রাণীও যদি তার কাজের পদ্ধতি বদলাতে পারে, সেটিই আচরণগত নমনীয়তা।

ভোমরার ক্ষেত্রে এই নমনীয়তা দেখা গেছে বাসা তৈরির সময়। একটি পাত্র পুরোপুরি তৈরি থাকলে সেটি ব্যবহার করা হয়েছে। অসম্পূর্ণ থাকলে তা শেষ করা হয়েছে। কাঠামোর কোনো অংশ প্রয়োজনের তুলনায় কম কার্যকর মনে হলে তা খুলে অন্য জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ কাজের প্রয়োজন অনুযায়ী একই কাঠামো বারবার বদলে নেওয়ার ক্ষমতা তাদের রয়েছে।


তবে ‘মধুর ঘরে প্লাস্টিক’ কথাটি শুনে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি। গবেষণায় ভোমরাকে প্রকৃতিতে পড়ে থাকা প্লাস্টিকের আবর্জনা কুড়িয়ে এনে মধুর পাত্র বানাতে দেখা যায়নি। গবেষকরা পরীক্ষার অংশ হিসেবে ৩-ডি প্রিন্ট করা কৃত্রিম কাঠামো ব্যবহার করেছেন। 

তাই রাস্তাঘাট বা জঙ্গলে পড়ে থাকা প্লাস্টিককে ভোমরার স্বাভাবিক বাসা তৈরির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করার প্রমাণ এই গবেষণায় নেই।

অর্থাৎ প্লাস্টিক এখানে মূল চরিত্র নয়; এটি ছিল একটি অচেনা উপাদান, যার মাধ্যমে দেখা হয়েছে মৌমাছি নতুন পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়। গবেষকরা মূলত পরীক্ষা করতে চেয়েছেন, ভোমরারা আগে থেকে পরিচিত ধরনের কাঠামো ছাড়া অন্য কিছুও কি খাবার রাখার পাত্র হিসেবে গ্রহণ করতে পারে? পরীক্ষার ফল বলছে, পারে।

এর সঙ্গে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও রয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্টে Communications Biology-তে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় Bombus terrestris ভোমরার ওপর মাইক্রোপ্লাস্টিক ও তাপমাত্রাজনিত চাপের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়। ৩০টি ভোমরার কলোনিকে বিভিন্ন মাত্রার মাইক্রোপ্লাস্টিক ও তাপমাত্রার পরিবেশে রেখে গবেষকরা দেখেছেন, এসব চাপ তাদের ব্যক্তিগত কার্যকলাপ, কাজের বিভাজন, কলোনির বিকাশ এবং সামাজিক যোগাযোগে পরিবর্তন আনতে পারে।

তাই কৃত্রিম উপাদান ব্যবহার করতে পারা আর প্লাস্টিক দূষণ তাদের জন্য ভালো বা নিরাপদ— এ দুটি একেবারেই আলাদা বিষয়। 

নতুন গবেষণার ফলকে পরিবেশে প্লাস্টিকের ক্ষতি কমে যাওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যাবে না। বরং এটি দেখায়, একটি প্রাণী নতুন বস্তু সামনে পেলেও কীভাবে সেটিকে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী কাজে লাগাতে পারে।

আর এখানেই গবেষণাটি প্রাণীর আচরণ নিয়ে বড় একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে। মানুষ সাধারণত ছোট পোকামাকড়ের আচরণ অনেকটাই সহজাত বা পূর্বনির্ধারিত বলে ধরে নেয়। 

কিন্তু ভোমরার বাসা তৈরির এই পরীক্ষায় দেখা গেছে, অন্তত কিছু ক্ষেত্রে তাদের কাজের মধ্যে পরিবর্তন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সমাধান খোঁজার ক্ষমতা রয়েছে।

একটি অসম্পূর্ণ পাত্র দেখে সেটিকে শেষ করা, আগে তৈরি কোনো অংশ খুলে ফেলা বা সেই অংশ আবার অন্য জায়গায় ব্যবহার করা— এসব আচরণ একেবারে সরল নয়। একই সঙ্গে একাধিক মৌমাছি একই কাঠামোয় কাজ করছে— এটিও দেখাচ্ছে যে বাসা তৈরির কাজ একটি স্থির প্রক্রিয়া নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী কাজের ধরন ও কাঠামো দুটিই বদলাতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে, ভোমরা মানুষের মতো করে বসে নকশা এঁকে পরিকল্পনা করে ঘর বানায়। গবেষকরা এমন দাবি করেননি। তারা পরীক্ষায় যে আচরণ দেখেছেন, তার ভিত্তিতে বলছেন— পরিস্থিতি বদলালে নির্মাণকাজের পদ্ধতিও বদলাতে পারে। 

ঠিক কোন সংকেত দেখে তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে একটি অংশ বদলানো দরকার, কীভাবে তারা নতুন কাঠামোকে ব্যবহারযোগ্য হিসেবে শনাক্ত করে এবং প্রকৃত পরিবেশে এই আচরণ কতটা সাধারণ— এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি।

এই গবেষণার ফল তাই ছোট একটি পতঙ্গ সম্পর্কে বড় একটি ধারণা দেয়। ফুল থেকে খাবার সংগ্রহ করা ভোমরার কাজ আমরা যতটা সরল মনে করি, তাদের বাসা তৈরির প্রক্রিয়া তার চেয়ে অনেক বেশি নমনীয় হতে পারে। নতুন উপাদান ব্যবহার, অসম্পূর্ণ কাঠামো শেষ করা, তৈরি অংশ খুলে আবার কাজে লাগানো এবং একাধিক পাত্র নিয়ে একসঙ্গে কাজ করা— সব মিলিয়ে তাদের নির্মাণ আচরণে দেখা গেছে বেশ বৈচিত্র্য। সবশেষে, ‘মৌমাছির ঘরে প্লাস্টিক’ আসলে শুধু প্লাস্টিকের গল্প নয়। 

এটি এমন এক প্রাণীর গল্প, যে নতুন কিছু সামনে পেলেই থেমে থাকে না। প্রয়োজন হলে যা পেয়েছে, সেটাকেই নিজের কাজে লাগিয়েছে। কাঠামো ঠিকমতো না হলে বদলেছে, অসম্পূর্ণ হলে শেষ করেছে, আর দরকার হলে পুরোনোটাই খুলে নতুনভাবে সাজিয়েছে।

মানুষের চোখে ছোট্ট এক পতঙ্গের এই আচরণ হয়তো সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের কাছে এর মধ্যেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্নের উত্তর— পরিবেশ বদলালে প্রাণীর আচরণও কি বদলায়? ভোমরার ক্ষেত্রে অন্তত নির্মাণের সময় উত্তরটি বেশ জোরালোভাবেই ‘হ্যাঁ’ বলছে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও
  বিষয়:   প্রাণ-প্রকৃতি  পরিবর্তন  মধু  প্লাস্টিক  কৌশল  বাঁচার লড়াই  মৌমাছি 


Advertisement
Loading...
Loading...
বিবিধ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: