মাত্র এক ফুঁ-তেই হাম, যক্ষ্মা, বন্ধ্যাত্বসহ যেকোনো জটিল ও কঠিন রোগের চিকিৎসা করেন কুড়িগ্রামের স্বঘোষিত আধ্যাত্মিক চিকিৎসক ও কবিরাজ শফিকুল ইসলাম (৩১)। চিকিৎসার জন্য কোনো ফি নেন না; তবে অভিযোগ রয়েছে, চিকিৎসা নিতে আসা সহজ সরল রোগীদের কাছ থেকে কৌশলে হাতিয়ে নেওয়া হয় হাজার হাজার টাকা। এমনকি লাখ টাকার চুক্তিতে বশীকরণ ও রোগীকে না দেখে নাম শুনেই গোপন রোগের চিকিৎসা করার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মুখ দেখেই রোগ নির্ণয় ও সর্বরোগের চিকিৎসা করা স্বঘোষিত আধ্যাত্মিক চিকিৎসক শফিকুল ইসলাম নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নের ডাকনীরপাঠ কোঁচপাড়া গ্রামের মৃত হুজুর আলীর ছেলে। পড়ালেখা করেছেন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। মাস ছয়েক আগে বনে যান আধ্যাত্মিক সাধক ও মহাকবিরাজ।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, নামাজ-কালাম না পড়লেও ধর্মীয় বুলি আওড়ে ভিন্ন এক পথ অবলম্বন করে বদলে যায় তার জীবন। নুন আনতে পান্তা ফুরানো শফিকুল ইসলাম কয়েক মাসের ব্যবধানে বনে যান লক্ষ লক্ষ টাকার মালিক। ঝাড়-ফুঁকের টাকায় গড়ছেন নতুন বাড়ি। চাচাতো ভাই সামিউলকে দিয়ে করছেন খামার, কৃষি জমি ক্রয়ের বন্দোবস্তও চলছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, শফিকুল ইসলামের বাড়িতে মানুষের ভিড়। বাইরে তার লোকজন রোগীদের সমস্যার কথা শুনে সমাধানের আশ্বাস দিয়ে দরকষাকষি করছেন। রোগীরা সবাই তার সামনে দাঁড়ানোর জন্য ব্যস্ত।
এদিকে, আধ্যাত্মিক সাধক ও কবিরাজ শফিকুল ইসলাম লুঙ্গি ও হাফ হাতা গেঞ্জি পরে একের পর এক সিগারেট টানছেন, সিগারেট টানা শেষে কোরআন ও হাদীসের ভুলভাল আয়াত পড়ে শোনাচ্ছেন। পাশে বসে আছে বেশ কয়েকজন অনুসারী।
এরপর দেখা যায়, রোগীরা সামনে এসে দাঁড়ালেই কবিরাজ দিচ্ছেন ‘ফুঁ’। এরপর রোগীরা তার সামনে টাকা রেখে সালাম করে চলে যাচ্ছেন। তার পাশে থাকা চাচাতো ভাই সামিউল অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে লোকজনকে তেল-পড়া ও পানিভর্তি শিশি দিচ্ছেন। কাউকে আবার দেওয়া হচ্ছে অ্যালোপ্যাথি ওষুধ। এভাবেই চলছে তার রমরমা চিকিৎসা বাণিজ্য।
ভূরুঙ্গামারীর বাড়াইটারীচর থেকে ‘চিকিৎসা’ নিতে আসা ফজিলা নামের এক নারী জানান, দাম্পত্য কলহের সমস্যার সমাধান পেতে তিনি এ পর্যন্ত পাঁচবার এখানে এসেছেন এবং অনেক টাকাও দিয়েছেন, অথচ কোনো ফল হয়নি। আজ আবার তার কাছে টাকা দাবি করা হচ্ছে, যা নিয়ে তিনি দারুণ দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক দম্পতি বলেন, সন্তান লাভের আশায় গত তিন মাস ধরে তারা এখানে আসছেন এবং চাহিদামতো টাকাও পরিশোধ করেছেন, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই প্রতারক চক্রের চার থেকে পাঁচজন সক্রিয় দালাল রয়েছে, যার মূল হোতা হাশেম আলীর ছেলে সামিউল। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানে মাসোহারা দিয়ে এই সিন্ডিকেট ম্যানেজ করা হচ্ছে বলেও তারা জানান।
কীভাবে তিনি আধ্যাত্মিক সাধক ও কবিরাজ হলেন— এমন প্রশ্নের জবাবে শফিকুল ইসলাম দাবি করেন, তিনি স্বপ্নে দীক্ষা পেয়েছেন। তার শরীরে আধ্যাত্মিক কোনো শক্তি ভর করেছে এবং তিনি সরাসরি রোগের সাথে কথা বলেই সে অনুযায়ী চিকিৎসা দেন।
এ বিষয়ে ভিতরবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শফিউল আলম শফি বলেন, সে শতভাগ বাটপার ও প্রতারক। আগে যার দুবেলা ভাত জুটত না, সে এখন জমি কিনে নতুন ঘরবাড়ি বানাচ্ছে। গ্রাম পুলিশ পাঠিয়ে তাকে সতর্ক করা হলেও সে থামছে না। লিখিত অভিযোগ পেলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে এ বিষয়ে নাগেশ্বরী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এনামুল হক প্রধানের সাথে বেশ কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে নাগেশ্বরী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুজন সাহা বলেন, নিবন্ধিত বা রেজিস্টার্ড চিকিৎসক ছাড়া এ ধরনের রোগের চিকিৎসা দেওয়ার কোনো আইনি এখতিয়ার কারও নেই। এটি প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। উপজেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে এই ধরনের প্রতারণার বিরুদ্ধে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/আতা